ডেটা ও বাস্তবতা: মানসিক স্বাস্থ্য ও ওয়েলনেস খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ডেটা ও বাস্তবতা: মানসিক স্বাস্থ্য ও ওয়েলনেস খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন

নাসরিন আক্তার  avatar   
নাসরিন আক্তার
ডেটা ও বাস্তবতা: মানসিক স্বাস্থ্য ও ওয়েলনেস খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন
ডেটা ও বাস্তবতা: মানসিক স্বাস্থ্য ও ওয়েলনেস খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন
ছবি: সংগৃহীত
গত বছর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৭% কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছ...

গত বছর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৭% কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন, যা পূর্ববর্তী দশকের তুলনায় লক্ষণীয় বৃদ্ধি নির্দেশ করে। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং একটি দেশের সামগ্রিক সুস্থতা এবং উৎপাদনশীলতার ওপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবের প্রতিচ্ছবি। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারীর পর মানসিক স্বাস্থ্য খাতে চ্যালেঞ্জগুলো আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। মনোসামাজিক সহায়তা এবং চিকিৎসা সেবার চাহিদা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে এই সেবাসমূহের সহজলভ্যতা ও গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন। এই গুরুতর পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে, মানসিক স্বাস্থ্যকে আর শুধুমাত্র ব্যক্তিগত বা পারিবারিকভাবে মোকাবিলা করার বিষয় হিসেবে দেখা যাবে না, বরং এটিকে একটি জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করতে হবে এবং এই খাতের প্রতিটি স্তরে সংস্কার ও বিনিয়োগ অপরিহার্য।

বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্য সেবার অবকাঠামো এবং এর বাস্তবায়ন বেশ কিছু মৌলিক সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন। উদাহরণস্বরূপ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এবং হাসপাতালগুলো রোগীদের একটি ক্ষুদ্র অংশকে সেবা দিতে সক্ষম, যেখানে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবী, বিশেষ করে মনোবিজ্ঞানী ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞের তীব্র সংকট রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী প্রতি ১,০০,০০০ মানুষের জন্য অন্তত ১ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ থাকার কথা থাকলেও, বাংলাদেশে এই অনুপাত অত্যন্ত কম। এছাড়া, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কুসংস্কার ও সামাজিক ট্যাবু এখনো ব্যাপক, যা মানুষকে প্রয়োজনীয় সাহায্য চাইতে বাধা দেয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) বিভিন্ন নীতি প্রণয়ন করলেও, মাঠপর্যায়ে সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন প্রায়শই ধীরগতিতে হয়। সম্প্রসারিত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির অভাব, কমিউনিটি পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য কর্মীর অপ্রাপ্যতা এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয়ের অভাব এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। মানসিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য বরাদ্দকৃত বাজেট দেশের মোট স্বাস্থ্য বাজেটের একটি নগণ্য অংশ, যা এই খাতের উন্নয়নের পথে একটি বড় অন্তরায়।

মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বিতরণে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার এবং প্রশিক্ষিত জনবলের অভাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (IEDCR) বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ে কাজ করলেও, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ডেটা সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এখনো অনেক উন্নতির সুযোগ রয়েছে। মানসিক রোগের সঠিক প্রাদুর্ভাব, ধরন এবং চিকিৎসার কার্যকারিতা সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ডেটার অভাবে নীতি নির্ধারকদের জন্য কার্যকর পরিকল্পনা প্রণয়ন কঠিন হয়ে পড়ে। উপরন্তু, মানসিক স্বাস্থ্য ওষুধপত্রের সহজলভ্যতা এবং মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি ফার্মাসিউটিক্যালস খাতের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলেও, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) কর্তৃক মানসিক স্বাস্থ্য ওষুধের সরবরাহ চেইন এবং গুণগত মান পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক সময় প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যায় না অথবা নকল ওষুধের ঝুঁকি থাকে, যা রোগীদের চিকিৎসায় ব্যাঘাত ঘটায়। এই সামগ্রিক পরিস্থিতি মানসিক স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি সমন্বিত ও বহু-মাত্রিক পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে, যেখানে গবেষণা, নীতি প্রণয়ন, জনবল উন্নয়ন এবং সেবা বিতরণ—সবগুলো ক্ষেত্রেই যুগোপযোগী পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

সূচক ২০১৫ সালের ডেটা ২০১৮ সালের ডেটা ২০২৩ সালের ডেটা (আনুমানিক)
প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে মানসিক রোগের প্রাদুর্ভাব ১৬.১% ১৮.৭% ১৭.০% (DGHS, ২০২২)
মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা (প্রতি ১,০০,০০০ জনে) ০.৪ ০.৫ ০.৬ (NIMH, ২০২৩)
মোট স্বাস্থ্য বাজেটে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বরাদ্দ ০.৪৪% ০.৫০% ০.৬৩% (MOHFW, ২০২৩-২৪)
মানসিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণকারীদের অনুপাত (যারা চিকিৎসা পেয়েছেন) ৭.১% ৮.২% ১১.৫% (IEDCR, ২০২২)

উৎস: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS), জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH), স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW), আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (IEDCR)।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক প্রণীত 'জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলপত্র' (National Mental Health Strategy) এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য প্রতি বছর নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ এবং এর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি স্বাধীন মূল্যায়ন কমিটি গঠন করা।
  • জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর তত্ত্বাবধানে 'মানসিক স্বাস্থ্য আইন, ২০১৮' এর আওতায় দেশব্যাপী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের (যেমন: কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার, স্বাস্থ্য সহকারী) জন্য একটি বাধ্যতামূলক অনলাইন ও অফলাইন প্রশিক্ষণ মডিউল চালু করা, যাতে তারা মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং, প্রাথমিক কাউন্সেলিং এবং রেফারেল পরিষেবা দিতে সক্ষম হন।
  • ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) কে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধগুলোর (যেমন: অ্যান্টিডিপ্রেসেন্টস, অ্যান্টিসাইকোটিকস) উৎপাদন, আমদানি এবং বিতরণ চেইন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি ডিজিটাল ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করতে হবে, যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও গুণগত মানসম্পন্ন ওষুধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত হয় এবং নকল ওষুধের প্রচলন বন্ধ হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাসরিন আক্তার

নাসরিন আক্তার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মানসিক স্বাস্থ্য ও ওয়েলনেস। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Tidak ada komentar yang ditemukan


News Card Generator