টাকার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতি: ক্ষুদ্র আমদানিকারকদের টিকে থাকার লড়াই | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

টাকার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতি: ক্ষুদ্র আমদানিকারকদের টিকে থাকার লড়াই

ফারহানা ইয়াসমিন  avatar   
ফারহানা ইয়াসমিন
টাকার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতি: ক্ষুদ্র আমদানিকারকদের টিকে থাকার লড়াই
টাকার অবমূল্যায়ন ও মূল্যস্ফীতি: ক্ষুদ্র আমদানিকারকদের টিকে থাকার লড়াই
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মে মাসে দেশের বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৯.৮৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ক্ষুদ্র আমদানিকারকদের জন্য এক কঠিন...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মে মাসে দেশের বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৯.৮৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ক্ষুদ্র আমদানিকারকদের জন্য এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বিশেষ করে, ডলারের বিপরীতে টাকার ধারাবাহিক অবমূল্যায়ন এবং উচ্চ আমদানি শুল্কের সমন্বিত প্রভাব এই খাতের উদ্যোক্তাদের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে, যার ফলে তাদের টিকে থাকার লড়াই আরও তীব্র হয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে একদিকে যেমন খরচ বেড়েছে, তেমনি অন্যদিকে ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় বাজারে পণ্যের চাহিদা ও যোগানের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

টাকার অবমূল্যায়ন এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি ক্ষুদ্র আমদানিকারকদের ব্যবসায়িক মডেলকে সরাসরি আঘাত করছে। উদাহরণস্বরূপ, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যমতে, গত এক বছরে ডলারের বিপরীতে টাকার মান প্রায় ২০ শতাংশের বেশি কমেছে, যা আমদানি ব্যয়কে সরাসরি বৃদ্ধি করেছে। এর অর্থ হলো, একজন ক্ষুদ্র আমদানিকারককে একই পরিমাণ পণ্য আমদানি করতে পূর্বে যে টাকা খরচ করতে হতো, এখন তার চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। এই অতিরিক্ত ব্যয় ভোক্তাদের উপর চাপানো হলে পণ্যের দাম আরও বেড়ে যায়, যা মূল্যস্ফীতিকে উস্কে দেয়। আবার, যদি আমদানিকারকরা এই অতিরিক্ত ব্যয় শোষণ করে নেন, তবে তাদের লাভের মার্জিন কমে যায় বা লোকসান গুনতে হয়, যা তাদের মূলধনকে ক্ষয় করে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) তাদের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, উচ্চ আমদানি ব্যয় এবং সীমিত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের কারণে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আমদানিকারকদের জন্য ঋণপত্র খোলা (Letter of Credit - LC) কঠিন হয়ে পড়েছে, কারণ ব্যাংকগুলো ডলার সরবরাহ নিয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। এটি শুধু আমদানি প্রক্রিয়াকে জটিল করছে না, বরং অনেক ক্ষুদ্র আমদানিকারককে ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য করছে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কর্তৃক আরোপিত আমদানি শুল্ক এবং অন্যান্য করের হারও ক্ষুদ্র আমদানিকারকদের জন্য একটি বড় বোঝা। যখন টাকার অবমূল্যায়ন ঘটে, তখন পণ্যের ঘোষিত মূল্য বেড়ে যায় এবং সেই বর্ধিত মূল্যের উপর ভিত্তি করে শুল্ক ও কর ধার্য হয়, যার ফলে প্রকৃত শুল্কের পরিমাণও বৃদ্ধি পায়। যদিও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) রপ্তানিমুখী শিল্পকে কিছু সুবিধা প্রদান করে, ক্ষুদ্র আমদানিকারকদের জন্য, বিশেষ করে যারা অভ্যন্তরীণ বাজারকে লক্ষ্য করে পণ্য আমদানি করেন, তাদের জন্য এমন বিশেষ সুবিধা প্রায় নেই বললেই চলে। ফলস্বরূপ, আমদানিকৃত পণ্যের চূড়ান্ত দাম এতটাই বেড়ে যায় যে, স্থানীয় বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য বিক্রি করা তাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে, অনেক ক্ষুদ্র আমদানিকারক তাদের আমদানি কার্যক্রম কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন, যা দেশের সরবরাহ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং স্থানীয় বাজারে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের সংকট তৈরি করছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) যদিও সরাসরি আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ করে না, তবে পুঁজিবাজারের অস্থিরতা, যা উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ডলার সংকটের কারণে সৃষ্ট, বিনিয়োগকারীদের আস্থায় চিড় ধরাচ্ছে এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা পরোক্ষভাবে ক্ষুদ্র আমদানিকারকদের অর্থায়নের সুযোগকে সংকুচিত করছে।

সূচক ২০২২ সালের মে ২০২৩ সালের মে ২০২৪ সালের মে
মাসিক মূল্যস্ফীতি (CPI) ৬.৩৩% ৯.৯৪% ৯.৮৯%
ডলারের বিনিময় হার (BDT প্রতি USD) ৮৮.৫০ ১০৮.০০ ১১৭.০০
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ (বিলিয়ন USD) ৪৩.৬ ২৯.৭ ২৪.২
আমদানি প্রবৃদ্ধি (বার্ষিক %) +৩৮.৮% -১২.৩% -১৪.৫%

উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR), সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)

সুপারিশ

  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে একটি 'ক্ষুদ্র আমদানিকারক সহায়তা তহবিল' গঠন করতে হবে এবং এই তহবিল থেকে স্বল্প সুদে ঋণ বা ভর্তুকি প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে, বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও অপরিহার্য কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে। এর মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে সৃষ্ট অতিরিক্ত শুল্কের বোঝা কমাতে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আমদানি শুল্কের হার যৌক্তিকীকরণ করতে হবে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র আমদানিকারকদের জন্য প্রযোজ্য ক্ষেত্রে, যাতে তাদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় থাকে।
  • বাংলাদেশ ব্যাংককে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারকে স্থিতিশীল রাখতে আরও কার্যকর ও স্বচ্ছ নীতি গ্রহণ করতে হবে এবং ক্ষুদ্র আমদানিকারকদের জন্য ডলার প্রাপ্তি সহজ করতে ব্যাংকগুলোকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিতে হবে, যাতে ঋণপত্র (LC) খুলতে কোনো অহেতুক জটিলতার সৃষ্টি না হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ফারহানা ইয়াসমিন

ফারহানা ইয়াসমিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: সামষ্টিক অর্থনীতি ও ইনফ্লেশন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator