আন্তর্জাতিক সাহায্য ও ঋণ সংস্থা-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

আন্তর্জাতিক সাহায্য ও ঋণ সংস্থা-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন

মাহফুজার রহমান  avatar   
মাহফুজার রহমান
আন্তর্জাতিক সাহায্য ও ঋণ সংস্থা-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন
আন্তর্জাতিক সাহায্য ও ঋণ সংস্থা-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কার মধ্যেও বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্য ও ঋণ ...

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক কর্তৃক প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কার মধ্যেও বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্য ও ঋণ সংস্থার ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। প্রতিবেদনটিতে ২০২৫ সাল নাগাদ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর বৈদেশিক ঋণের বোঝা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, যা বহু উন্নয়নশীল দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নীতি-নির্ধারণী পুনর্বিবেচনার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বিশেষত, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষামূলক কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর অংশগ্রহণ ক্রমবর্ধমান হলেও, এর কার্যকারিতা এবং শর্তাবলী নিয়ে প্রশ্ন ওঠা শুরু করেছে। এই প্রেক্ষাপটে, আন্তর্জাতিক সাহায্য ও ঋণ সংস্থাগুলোর কার্যক্রম, তাদের অপ্রকাশিত শর্তাবলী এবং এর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি।

আন্তর্জাতিক সাহায্য ও ঋণ সংস্থাগুলো কেবল আর্থিক সংস্থান সরবরাহকারী সত্তা হিসেবে কাজ করে না, বরং তারা প্রায়শই দাতা দেশগুলোর ভূ-রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক স্বার্থের প্রতিচ্ছবি হিসেবেও আবির্ভূত হয়। উদাহরণস্বরূপ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এবং জাইকা (JICA)-এর মতো সংস্থাগুলো যখন কোনো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন করে, তখন সেই অর্থায়নের শর্ত হিসেবে দাতা দেশের পণ্য বা প্রযুক্তি ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা থাকে। এর ফলে ঋণগ্রহীতা দেশগুলো প্রায়শই তুলনামূলকভাবে কম প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে পণ্য বা সেবা ক্রয় করতে বাধ্য হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসনকে খর্ব করে। তদুপরি, এই সংস্থাগুলো প্রায়শই সুশাসনের অভাব, দুর্নীতি এবং পরিবেশগত প্রভাবের মতো বিষয়গুলো উত্থাপন করে ঋণ বা সাহায্যের শর্ত হিসেবে নির্দিষ্ট নীতি সংস্কারের দাবি জানায়, যা অনেক সময় উন্নয়নশীল দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোতে অনাকাঙ্ক্ষিত হস্তক্ষেপের জন্ম দেয়। এক্ষেত্রে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনৈতিক দক্ষতা একটি ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য, যাতে আর্থিক সাহায্য গ্রহণ করা গেলেও জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ণ থাকে। BIMSTEC এবং সার্ক-এর মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলো এই ক্ষেত্রে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি সম্মিলিত কৌশল প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, যাতে এককভাবে কোনো একটি দেশ আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলায় দুর্বল না হয়।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর কিছু বিশেষায়িত কার্যক্রম রয়েছে যা সরাসরি উন্নয়নশীল দেশের মানবসম্পদ ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। UN Peacekeeping মিশনগুলোতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ, যা দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎস, তা জাতিসংঘের বিভিন্ন উন্নয়ন তহবিল থেকে প্রাপ্ত সাহায্য এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আরও জোরদার হয়েছে। এই ধরনের সহযোগিতা কেবল আর্থিক নয়, বরং প্রযুক্তিগত জ্ঞান এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক। তবে, এই সহযোগিতাগুলোও প্রায়শই অদৃশ্য শর্তের দ্বারা আবদ্ধ থাকে। যেমন, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা যখন স্বাস্থ্য বা শিক্ষা খাতে সাহায্য প্রদান করে, তখন প্রায়শই তাদের নিজস্ব আদর্শ বা নীতিমালার প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টা করা হয়, যা স্থানীয় প্রেক্ষাপাপটে সবসময় কার্যকর নাও হতে পারে। এক্ষেত্রে, ঋণদাতা এবং সাহায্য সংস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নয়নশীল দেশগুলোর উচিত, কেবল আর্থিক প্রবাহের দিকে মনোযোগ না দিয়ে, এই সাহায্য ও ঋণের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব এবং এর সাথে জড়িত অঘোষিত শর্তগুলো গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা। এর জন্য জাতীয় পর্যায়ে গবেষণা ও বিশ্লেষণের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরালোভাবে নিজেদের স্বার্থ তুলে ধরা অপরিহার্য।

সংস্থা/সেক্টর ২০২০ (মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ২০২১ (মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ২০২২ (মিলিয়ন মার্কিন ডলার) মন্তব্য
বিশ্বব্যাংক (IDA ও IBRD) ২,৮৫০ ৩,১০০ ৩,৩৫০ বাংলাদেশকে প্রদত্ত মোট ঋণ ও অনুদান
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) ১,৭০০ ২,০৫০ ২,৩০০ অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে প্রধানত
UN Peacekeeping (প্রাপ্য পরিশোধ) ৩৩০ ৩৫০ ৩৭০ বাংলাদেশী শান্তিরক্ষীদের জন্য জাতিসংঘের পরিশোধ
BIMSTEC উন্নয়ন তহবিল ১৫ ২০ ২৫ আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রকল্পগুলোতে সীমিত অনুদান
সার্ক উন্নয়ন তহবিল ১০ ১২ ১৫ সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রকল্পগুলোতে অনুদান

উৎস: বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, জাতিসংঘ এবং সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আন্তর্জাতিক সাহায্য ও ঋণ সংস্থাগুলির সাথে চুক্তি সম্পাদনের পূর্বে একটি স্বাধীন 'জাতীয় ঋণ ও সাহায্য মূল্যায়ন কমিটি' (National Debt and Aid Evaluation Committee) গঠন করে প্রতিটি প্রস্তাবিত প্রকল্পের ভূ-রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত প্রভাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে। এই কমিটি 'বৈদেশিক ঋণ আইন, ২০২৩' (প্রস্তাবিত) এর অধীনে কাজ করবে এবং নিশ্চিত করবে যে কোনো চুক্তিতে জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী শর্ত অন্তর্ভুক্ত না হয়।
  • BIMSTEC এবং সার্ক-এর মতো আঞ্চলিক জোটগুলোকে সক্রিয় করে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে 'যৌথ ঋণ ও সাহায্য কৌশল ফ্রেমওয়ার্ক' (Joint Debt and Aid Strategy Framework) প্রণয়ন করতে হবে, যা দাতা সংস্থাগুলোর একপেশে শর্তারোপের বিরুদ্ধে সম্মিলিত দর কষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধি করবে। এর মাধ্যমে আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে এবং সদস্য দেশগুলো 'আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহায়তা চুক্তি, ২০২৪' (প্রস্তাবিত) এর অধীনে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে।
  • UN Peacekeeping সহ অন্যান্য বহুপাক্ষিক সাহায্য কর্মসূচিতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আরও ফলপ্রসূ করতে 'জাতিসংঘ বিষয়ক বিভাগ' (UN Affairs Division) কে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে জাতিসংঘের বিভিন্ন ফোরামে বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট নীতি ও প্রকল্পগুলো কার্যকরভাবে তুলে ধরা যায়। একই সাথে, জাতিসংঘের 'টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা তহবিল' (SDG Fund) থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা আদায়ের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'জাতীয় SDG বাস্তবায়ন পরিকল্পনা, ২০২৫' প্রণয়ন এবং এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মাহফুজার রহমান

মাহফুজার রহমান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: আন্তর্জাতিক সাহায্য ও ঋণ সংস্থা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Hiçbir yorum bulunamadı


News Card Generator