অপ্রকাশিত সত্য: মেধা স্বত্ব, কপিরাইট ও পেটেন্ট আইন নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অপ্রকাশিত সত্য: মেধা স্বত্ব, কপিরাইট ও পেটেন্ট আইন নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

ব্যারিস্টার নাদিয়া  avatar   
ব্যারিস্টার নাদিয়া
অপ্রকাশিত সত্য: মেধা স্বত্ব, কপিরাইট ও পেটেন্ট আইন নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
অপ্রকাশিত সত্য: মেধা স্বত্ব, কপিরাইট ও পেটেন্ট আইন নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বিগত পাঁচ বছরে অনলাইন পাইরেসি ও মেধা স্বত্ব লঙ্ঘনের ঘটনায় দায়েরকৃত অভিযোগের সংখ্যা ২৫০% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বিগত পাঁচ বছরে অনলাইন পাইরেসি ও মেধা স্বত্ব লঙ্ঘনের ঘটনায় দায়েরকৃত অভিযোগের সংখ্যা ২৫০% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের উদ্ভাবনী অর্থনীতি এবং সৃজনশীল শিল্পকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, মেধা স্বত্ব, কপিরাইট এবং পেটেন্ট আইন সংক্রান্ত বিদ্যমান কাঠামো এবং তার প্রয়োগে গুরুতর সীমাবদ্ধতা রয়েছে, যা শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যেখানে মেধা সম্পদকে অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের এই চিত্র উদ্ভাবকদের জন্য এক হতাশাজনক পরিস্থিতি তৈরি করছে এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (WTO) এর TRIPS চুক্তি (Trade-Related Aspects of Intellectual Property Rights) বাস্তবায়নে দেশের অঙ্গীকার নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।

বাংলাদেশের মেধা স্বত্ব সুরক্ষা ব্যবস্থার দুর্বলতা শুধু অভ্যন্তরীণ উদ্ভাবকদেরই নিরুৎসাহিত করছে না, বরং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও বাধা সৃষ্টি করছে। World Bank এর একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুসারে, মেধা স্বত্ব সুরক্ষায় দুর্বলতা রয়েছে এমন দেশগুলিতে গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ গড়ে ৩০% কম থাকে। এর কারণ হলো, উদ্ভাবকরা তাদের মেধা সম্পদের অবৈধ ব্যবহার বা চুরি হওয়ার আশঙ্কায় নতুন প্রযুক্তি বা ধারণা বিনিময়ে দ্বিধা বোধ করেন। দেশের পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (DPDT) থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতি বছর নতুন পেটেন্টের জন্য আবেদনকারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও, কার্যকরভাবে পেটেন্ট লাভ এবং তার বাণিজ্যিকীকরণ প্রক্রিয়ায় জটিলতা বিদ্যমান। বিশেষ করে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সৃষ্ট কন্টেন্টের কপিরাইট সুরক্ষা এবং তার লঙ্ঘনের প্রতিকার প্রাপ্তিতে বিদ্যমান আইনগুলি প্রায়শই ধীরগতিসম্পন্ন এবং যথেষ্ট শক্তিশালী নয়, যা বিশেষত সঙ্গীত, চলচ্চিত্র এবং সফটওয়্যার শিল্পে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির কারণ হচ্ছে।

এই সমস্যাটি আরও প্রকট হয় যখন আমরা আন্তর্জাতিক পরিসরে দেখি যে, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) তাদের 'টেকসই শিল্পায়ন' সংক্রান্ত প্রতিবেদনে মেধা স্বত্ব সুরক্ষাকে অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, ২০০০ সালের কপিরাইট আইন এবং ২০২২ সালের পেটেন্ট আইন থাকা সত্ত্বেও, এর কার্যকর প্রয়োগের অভাবে বহু উদ্ভাবক এবং সৃজনশীল কর্মী তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। উদাহরণস্বরূপ, স্থানীয় সফটওয়্যার ডেভেলপাররা প্রায়শই বিদেশি কোম্পানিগুলির দ্বারা তাদের উদ্ভাবনের অননুমোদিত ব্যবহার বা কপি হওয়ার অভিযোগ করেন, কিন্তু আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রিতা এবং উচ্চ ব্যয়ের কারণে অনেকেই মামলা দায়ের থেকে বিরত থাকেন। এই পরিস্থিতি দেশের 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' এবং 'স্মার্ট বাংলাদেশ' গড়ার স্বপ্নকে বাধাগ্রস্ত করছে, কারণ উদ্ভাবন এবং সৃজনশীলতার পরিবেশ তৈরি না হলে দীর্ঘমেয়াদী প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সম্ভব নয়। বাংলাদেশ সরকার যদিও এই বিষয়ে সদিচ্ছা প্রকাশ করেছে, তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলির সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিচারিক প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মতো মৌলিক বিষয়গুলিতে এখনও অনেক কাজ বাকি।

বছর কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগ (সংখ্যা) পেটেন্ট আবেদন (সংখ্যা) পেটেন্ট অনুমোদন (সংখ্যা) মেধা স্বত্ব সুরক্ষায় বৈশ্বিক সূচকে অবস্থান (World Bank)
২০১৯ ১২০ ৮৫০ ১৫০ ১২০/১৪০
২০২০ ১৮০ ৯০০ ১৭০ ১১৮/১৪০
২০২১ ২৫০ ৯৫০ ১৯০ ১১৫/১৪০
২০২২ ৩২০ ১০০০ ২১০ ১১২/১৪০
২০২৩ ৪২০ ১১০৫ ২৩০ ১১০/১৪০

উৎস: বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস, পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (DPDT), World Bank Intellectual Property Index Report.

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ কপিরাইট আইন ২০০০ এবং পেটেন্ট আইন ২০২২ এর অধীনে গঠিত ট্রাইব্যুনালগুলির কার্যকারিতা বাড়াতে অবিলম্বে প্রয়োজনীয় বিচারক ও সহযোগী জনবল নিয়োগ দিতে হবে এবং তাদের জন্য মেধা স্বত্ব সংক্রান্ত বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যা আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক বাস্তবায়িত হবে।
  • শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে World Bank এবং ADB এর সহায়তায় মেধা স্বত্ব অধিকার প্রয়োগের জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে, যেখানে উদ্ভাবকরা সহজেই তাদের অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন এবং আইনি প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ ট্র্যাক করতে পারবেন, যা দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করবে।
  • বাংলাদেশ সরকার, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে দেশব্যাপী মেধা স্বত্ব, কপিরাইট ও পেটেন্ট আইন সংক্রান্ত সচেতনতামূলক কর্মসূচি চালু করতে হবে, বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (SMEs) মধ্যে, যাতে উদ্ভাবকরা তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হন এবং এই আইনগুলির সঠিক ব্যবহার করতে পারেন।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ব্যারিস্টার নাদিয়া

ব্যারিস্টার নাদিয়া 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মেধা স্বত্ব, কপিরাইট ও পেটেন্ট আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

לא נמצאו הערות


News Card Generator