সম্প্রতি, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) দেশের টেলিকম অপারেটরদের জন্য ৫জি স্পেকট্রাম বরাদ্দ ও এর বাণিজ্যিক প্রসারের রোডম্যাপ প্রকাশ করেছে, যেখানে ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের প্রায় ৭০% অঞ্চলে ৫জি কাভারেজ নিশ্চিত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য অর্জন করতে অপারেটরদের জন্য বিপুল বিনিয়োগ অপরিহার্য, যা ইতোমধ্যে গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংকের মতো অপারেটরদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। কারণ, একদিকে রয়েছে অবকাঠামো নির্মাণ ও স্পেকট্রাম অধিগ্রহণের জন্য বিশাল অঙ্কের আর্থিক ব্যয়, অন্যদিকে গ্রাহক পর্যায়ে ৫জি প্রযুক্তির প্রতি তুলনামূলক অনাগ্রহ এবং এর ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় ডিভাইসের উচ্চমূল্য একটি প্রকট বাস্তবতা।
এই পরিস্থিতিতে, ৫জি প্রযুক্তি কেবল উচ্চগতির ইন্টারনেটের চেয়েও বেশি কিছু, এটি শিল্প ৪.০ এবং ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণের মূল চালিকাশক্তি। তবে, প্রাথমিক পর্যায়ে গ্রাহকদের মধ্যে ৫জি-এর প্রয়োজনীয়তা বা 'কিলার অ্যাপস'-এর অভাব এর বাণিজ্যিক সাফল্যকে বাধাগ্রস্ত করছে। দেখা যাচ্ছে, বর্তমান ৪জি নেটওয়ার্ক দিয়েই অধিকাংশ গ্রাহকের দৈনন্দিন চাহিদা পূরণ হচ্ছে, যার ফলে ৫জি-এর জন্য অতিরিক্ত ব্যয় বা নতুন ডিভাইস কেনার আগ্রহ কম। বিশেষত, শিল্প অ্যাপ্লিকেশন, স্মার্ট ফ্যাক্টরি, স্বায়ত্তশাসিত যানবাহন বা রিমোট সার্জারির মতো ৫জি-নির্ভর ক্ষেত্রগুলো বাংলাদেশে এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। উপরন্তু, ৫জি-এর জন্য প্রয়োজনীয় ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি এবং এজ কম্পিউটিং অবকাঠামো নির্মাণে আরও বৃহৎ বিনিয়োগের প্রয়োজন, যা কেবল অপারেটরদের পক্ষে এককভাবে বহন করা কঠিন।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারি সংস্থাগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) এবং অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (a2i) প্রোগ্রাম ৫জি-এর সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে স্মার্ট বাংলাদেশ গঠনে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করলেও, সেগুলোর বাস্তবায়ন এবং টেলিকম অপারেটরদের সাথে সমন্বয়ের অভাব সুস্পষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, বিটিআরসি কর্তৃক ৫জি স্পেকট্রাম নিলামের মাধ্যমে সরকার রাজস্ব আয় করলেও, অপারেটরদের জন্য ৫জি অবকাঠামো নির্মাণে ট্যাক্স ইনসেনটিভ বা দীর্ঘমেয়াদী কম সুদের ঋণ সুবিধার মতো প্রণোদনার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) হাই-টেক পার্কগুলোতে ৫জি-ভিত্তিক উদ্ভাবনী ইকোসিস্টেম তৈরির চেষ্টা করলেও, এই পার্কগুলোর বাইরে শিল্প খাতে ৫জি-এর ব্যবহার এখনও সীমিত। অন্যদিকে, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) ৫জি-এর জন্য স্থানীয় অ্যাপ্লিকেশন ও পরিষেবা উন্নয়নে কাজ করলেও, এর বাণিজ্যিকীকরণ এবং গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
| সূচক | ২০২২ | ২০২৩ | পর্যবেক্ষণ |
|---|---|---|---|
| ৫জি স্পেকট্রাম নিলাম থেকে রাজস্ব (কোটি টাকা) | ১,০৬৪ | ৮৫০ (প্রাক্কলিত) | প্রাথমিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি |
| ৫জি নেটওয়ার্ক কাভারেজ (শহরাঞ্চল, %) | ১০% | ১৫% | ধীর গতিতে কাভারেজ বৃদ্ধি |
| ৫জি গ্রাহক সংখ্যা (মিলিয়ন) | ০.২ | ০.৫ | ৪জি গ্রাহকের তুলনায় নগণ্য |
| ৫জি সক্ষম ডিভাইস বিক্রি বৃদ্ধি (%) | ১৫% | ২০% | ডিভাইসের উচ্চমূল্য একটি বাধা |
উৎস: বিটিআরসি বার্ষিক প্রতিবেদন, টেলিকম অপারেটরদের তথ্যের ভিত্তিতে প্রাক্কলন।
সুপারিশ
- বিটিআরসি-কে ৫জি অবকাঠামো নির্মাণে টেলিকম অপারেটরদের জন্য সুনির্দিষ্ট কর রেয়াত এবং দীর্ঘমেয়াদী, স্বল্প সুদের ঋণ সুবিধা প্রদানের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় করে একটি প্রণোদনা প্যাকেজ তৈরি করতে হবে, যাতে বিনিয়োগের বোঝা কমানো যায় এবং দ্রুত অবকাঠামো সম্প্রসারণ সম্ভব হয়।
- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) এবং a2i-কে যৌথভাবে শিল্প ৪.০-এর জন্য ৫জি-নির্ভর 'কিলার অ্যাপ্লিকেশন' ও পরিষেবা শনাক্ত এবং উন্নয়নে একটি জাতীয় কর্মশালা আয়োজন করতে হবে, যেখানে BASIS-এর সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে গবেষণা ও উন্নয়নে আর্থিক অনুদান ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করা হবে, যাতে গ্রাহক পর্যায়ে ৫জি-এর বাস্তবিক উপযোগিতা তৈরি হয়।
- বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA)-কে হাই-টেক পার্কগুলোতে ৫জি ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার পাশাপাশি, এই প্রযুক্তিকে কৃষি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাক্ষেত্রে পাইলট প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়নের জন্য সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এর বাণিজ্যিক মডেল তৈরি করতে হবে।