চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান: পোশাক শিল্পে রোবটের আগমন… | আই নিউজ বিডি

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান: পোশাক শিল্পে রোবটের আগমন, শ্রমিকের ভবিষ্যৎ কী?

আরিফুর রহমান  avatar   
আরিফুর রহমান
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান: পোশাক শিল্পে রোবটের আগমন, শ্রমিকের ভবিষ্যৎ কী?
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান: পোশাক শিল্পে রোবটের আগমন, শ্রমিকের ভবিষ্যৎ কী?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি পোশাক শিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং রোবোটিক্সের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার কর্মসংস্থান নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। গত বছর, বাংলাদেশ গার্মেন...

সম্প্রতি পোশাক শিল্পে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং রোবোটিক্সের ক্রমবর্ধমান ব্যবহার কর্মসংস্থান নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। গত বছর, বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (BGMEA) তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, কিছু অত্যাধুনিক পোশাক কারখানায় স্বয়ংক্রিয় কাটিং ও সেলাই মেশিন এবং রোবোটিক হ্যান্ডেলিং সিস্টেমের কারণে উৎপাদন দক্ষতা প্রায় ৩০% বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যয় কমাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, তেমনি অন্যদিকে লাখ লাখ শ্রমিকের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করছে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই ঢেউ যখন আমাদের দুয়ারে, তখন পোশাক শিল্পের মতো শ্রমঘন খাতগুলোতে এর প্রভাব এবং শ্রমবাজারের অভিযোজন নিয়ে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ অত্যাবশ্যক হয়ে উঠেছে।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের মূল ভিত্তি হলো সাইবার-ফিজিক্যাল সিস্টেম, ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT) এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যা উৎপাদন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণরূপে রূপান্তরিত করছে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প, যা দেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের উৎস এবং প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থানের যোগানদাতা, এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। স্বয়ংক্রিয় কাটিং মেশিন, ডিজিটাল প্রিন্টিং, রোবোটিক সুইং এবং প্যাকেজিং সিস্টেমের মতো প্রযুক্তিগুলো ইতিমধ্যে কিছু বড় কারখানায় প্রয়োগ করা শুরু হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি স্বয়ংক্রিয় কাটিং মেশিন একজন দক্ষ কাটার শ্রমিকের চেয়ে অনেক দ্রুত এবং নিখুঁতভাবে কাপড় কাটতে পারে, যা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সময় এবং কাঁচামাল উভয়ই সাশ্রয় করে। এই প্রযুক্তি গ্রহণ না করলে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হবে, বিশেষ করে যখন ভিয়েতনাম এবং চীনের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো দ্রুত এই প্রযুক্তি গ্রহণ করছে। তবে, এই স্বয়ংক্রিয়তার ফলে যে বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের কাজ হারানোর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তা মোকাবেলায় সরকারের পক্ষ থেকে একটি সুসংগঠিত এবং কার্যকর কৌশল গ্রহণ অপরিহার্য। এই কৌশল কেবল প্রশিক্ষণ বা দক্ষতা উন্নয়নেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং নতুন ধরনের কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনীতির বহুমুখীকরণকেও উৎসাহিত করবে।

শ্রমবাজারের উপর চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রভাব কেবল পোশাক শিল্পের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে একটি কাঠামোগত পরিবর্তন আনছে। ঐতিহ্যবাহী, পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাওয়ায় নতুন ধরণের দক্ষতার চাহিদা তৈরি হচ্ছে। ডেটা অ্যানালিটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স প্রোগ্রামিং, এবং সাইবার নিরাপত্তা – এই ক্ষেত্রগুলোতে দক্ষ জনবলের অভাব প্রকট। বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শ্রম মন্ত্রণালয়, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) বিভিন্ন শিল্প খাতের সাথে সমন্বয় করে দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচী প্রণয়নের চেষ্টা করছে। তবে, এই উদ্যোগগুলোর গতি এবং পরিধি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দ্রুত পরিবর্তনের সাথে তাল মেলাতে যথেষ্ট নয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী করে তোলার জন্য নতুন কারিকুলাম প্রণয়নের নির্দেশনা দিয়েছে, কিন্তু এর বাস্তবায়ন এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারগুলোতে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষক সরবরাহের চেষ্টা করছে, যা ভবিষ্যতের শ্রমবাজারের জন্য অপরিহার্য। এই পরিবর্তনগুলো সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে, বাংলাদেশ কেবল শ্রমঘন অর্থনীতি থেকে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হওয়ার পথেই এগোবে না, বরং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থানও সুদৃঢ় করতে পারবে।

বছর পোশাক শিল্পে রোবোটিক্স ও অটোমেশন খাতে বিনিয়োগ (মিলিয়ন মার্কিন ডলার) দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে সরকারি বরাদ্দ (মিলিয়ন মার্কিন ডলার) টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল ট্রেনিং (TVET) গ্র্যাজুয়েট সংখ্যা
২০১৮ ৫০ ১০ ১,৫০,০০০
২০১৯ ৭৫ ১৫ ১,৭৫,০০০
২০২০ ১০০ ২০ ২,০০,০০০
২০২১ ১৫০ ২৫ ২,২৫,০০০
২০২২ ২০০ ৩০ ২,৫০,০০০

উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক, NSDA, BANBEIS, এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে সমন্বিতভাবে পোশাক শিল্প সংশ্লিষ্ট সকল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও ভোকেশনাল ট্রেনিং সেন্টারের পাঠ্যক্রম চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিকায়ন করতে হবে। এতে রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থার উপর প্রায়োগিক কোর্স অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী প্রতি দুই বছর অন্তর পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা ও হালনাগাদ করার জন্য একটি স্থায়ী কমিটি গঠন করতে হবে।
  • সরকারকে, বিশেষ করে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং শিল্প মন্ত্রণালয়কে, পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে বিনিয়োগের জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে, যা কৌশলগতভাবে SEIP (Skills for Employment Investment Program) প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত হবে। এই তহবিল থেকে শ্রমিকদের রি-স্কিলিং ও আপ-স্কিলিং প্রশিক্ষণের জন্য ভর্তুকি প্রদান করা হবে এবং যেসব প্রতিষ্ঠান রোবোটিক্স ও অটোমেশন প্রযুক্তি গ্রহণ করছে, তাদের জন্য প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রণোদনা প্রদান করতে হবে।
  • বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) এবং বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS)-কে যৌথভাবে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব সংশ্লিষ্ট গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য একটি রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। এতে প্রতিটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিক্স ল্যাব স্থাপনে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং শিল্প-বিশ্ববিদ্যালয় অংশীদারিত্বের মাধ্যমে নতুন প্রযুক্তির প্রোটোটাইপ তৈরিতে উৎসাহিত করার জন্য একটি নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: আরিফুর রহমান

আরিফুর রহমান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

لم يتم العثور على تعليقات


News Card Generator