তৈরি পোশাক (RMG) ও টেক্সটাইল খাত: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

তৈরি পোশাক (RMG) ও টেক্সটাইল খাত: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ

নাসির উদ্দিন  avatar   
নাসির উদ্দিন
তৈরি পোশাক (RMG) ও টেক্সটাইল খাত: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
তৈরি পোশাক (RMG) ও টেক্সটাইল খাত: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি প্রকাশিত রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪.৩...

সম্প্রতি প্রকাশিত রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪.৩৯%, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের ২১.৭২% প্রবৃদ্ধির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। এই মন্থর গতি বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতা, ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং প্রধান রপ্তানি গন্তব্যগুলোতে মূল্যস্ফীতির চাপকে যেমন নির্দেশ করে, তেমনি দেশের অভ্যন্তরে এই খাতের দীর্ঘদিনের কিছু কাঠামোগত দুর্বলতাকেও প্রকটভাবে সামনে নিয়ে আসে। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত এই খাত বর্তমানে বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, যেখানে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, ক্রেতাদের দর কষাকষির ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রতিযোগী দেশগুলোর সাথে টিকে থাকার নতুন কৌশল অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের উত্থান যতটা দ্রুত ছিল, এর ভেতরের টেকসই বিকাশের ভিত্তি ততটা মজবুত হয়নি। বিশেষ করে মধ্যম সারির পণ্য (basic garments) উৎপাদনে বিশ্বজুড়ে নেতৃত্ব দিলেও, উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পণ্য (high-value fashion items) এবং ফাইবার-ভিত্তিক বৈচিত্র্যকরণের ক্ষেত্রে আমরা এখনও পিছিয়ে আছি। উদাহরণস্বরূপ, সিন্থেটিক ফাইবারভিত্তিক পোশাকের বৈশ্বিক চাহিদা বাড়লেও, বাংলাদেশের রপ্তানির সিংহভাগই (প্রায় ৭৫% এর বেশি) এখনও কটনভিত্তিক। এই ফাইবার বৈচিত্র্যহীনতা একদিকে যেমন উচ্চ প্রবৃদ্ধির সুযোগ নষ্ট করছে, অন্যদিকে কাঁচামাল আমদানির ওপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা তৈরি করছে। BGMEA এবং BKMEA উভয়ই দীর্ঘকাল ধরে স্থানীয় টেক্সটাইল খাতের দুর্বলতা এবং পশ্চাৎপদ শিল্পের অপ্রতুলতার কথা বলে আসছে, যা কাঁচামাল সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রায় ৬০-৭০% আমদানির উপর নির্ভরশীলতা তৈরি করেছে। ফাস্ট-ফ্যাশন ও টেকসই উৎপাদনের বৈশ্বিক প্রবণতা যেখানে গতিশীল সাপ্লাই চেইন এবং উদ্ভাবনী উপকরণের দাবি করে, সেখানে বাংলাদেশের কারখানাগুলো প্রায়শই লিড টাইম (lead time) এবং উদ্ভাবনী সক্ষমতার অভাবে পিছিয়ে পড়ে। এর ফলস্বরূপ, বৈশ্বিক বাজারে নতুন চাহিদা পূরণে আমরা দ্রুত সাড়া দিতে পারছি না, যা প্রতিবেশী ভিয়েতনাম বা ভারতের মতো দেশগুলো সফলভাবে কাজে লাগাচ্ছে।

এছাড়াও, কর্মপরিবেশের মানোন্নয়ন এবং শ্রম অধিকার নিশ্চিতকরণে অগ্রগতি সাধিত হলেও, শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে এখনও ঘাটতি বিদ্যমান। DIFE (Department of Inspection for Factories and Establishments) এর নিয়মিত পরিদর্শনে কারখানার নিরাপত্তা ও কমপ্লায়েন্স বিষয়ে উন্নতি দেখা গেলেও, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার যেমন – কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স এবং ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT) – এর প্রয়োগ এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য আধুনিক সরঞ্জামাদি এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা প্রবর্তনে বিনিয়োগের অভাব প্রায়শই কারখানার উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দেয় এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ক্ষমতাকে খর্ব করে। মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার সাথে সাথে GSP (Generalized System of Preferences) সুবিধা হারানোর সম্ভাব্য ঝুঁকিও এই খাতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যার জন্য পণ্যের মূল্য সংযোজন বৃদ্ধি এবং নতুন বাজার অনুসন্ধানের উপর জোর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। EPB-এর তথ্য অনুযায়ী, অপ্রচলিত বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধির চেষ্টা চললেও, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডার উপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা রয়ে গেছে, যা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কার মুখে খাতটিকে আরও বেশি ঝুঁকিতে ফেলছে।

সূচক ২০১৮-১৯ অর্থবছর ২০১৯-২০ অর্থবছর ২০২০-২১ অর্থবছর ২০২১-২২ অর্থবছর ২০২২-২৩ অর্থবছর ২০২৩-২৪ (জুলাই-এপ্রিল)
মোট RMG রপ্তানি (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ৩৩.০৭ ২৭.৯৫ ৩১.৪৫ ৪২.৬১ ৪৬.৯৯ ৩৭.১৮
বার্ষিক প্রবৃদ্ধি (%) ১১.৪৯ -১৫.৪৮ ১২.৫৪ ৩৫.৪৭ ১০.২৭ ৪.৩৯
কটনভিত্তিক RMG (%) ৭৮% ৭৭% ৭৬% ৭৫% ৭৪% ৭৩% (আনুমানিক)
নন-কটনভিত্তিক RMG (%) ২২% ২৩% ২৪% ২৫% ২৬% ২৭% (আনুমানিক)

উৎস: রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এবং BGMEA

সুপারিশ

  • শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে 'জাতীয় শিল্পনীতি' এবং 'রপ্তানি নীতি' এর আওতায় নন-কটনভিত্তিক টেক্সটাইল ও পোশাক উৎপাদনে বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে, যার মধ্যে ট্যাক্স হলিডে, সহজ শর্তে ঋণ এবং প্রযুক্তি আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের মতো সুবিধা অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যাতে ২০৩০ সালের মধ্যে নন-কটন পণ্যের রপ্তানি ৫০% এ উন্নীত হয়।
  • DIFE (Department of Inspection for Factories and Establishments) এর তত্ত্বাবধানে BGMEA এবং BKMEA-কে যৌথভাবে একটি 'শ্রমিক দক্ষতা উন্নয়ন তহবিল' গঠন করতে হবে, যা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ (যেমন- CAD/CAM, রোবোটিক্স অপারেশন, AI-ভিত্তিক সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট) প্রদান করবে এবং প্রতি বছর কমপক্ষে ১ লক্ষ শ্রমিককে পুনঃপ্রশিক্ষিত করে উৎপাদনশীলতা ও উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরির সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।
  • রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB)-কে আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) কার্যক্রমে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে এবং নতুন অপ্রচলিত বাজার (যেমন- জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, মধ্যপ্রাচ্য) এবং উচ্চমূল্যের ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর সাথে সংযোগ স্থাপনে BGMEA ও BKMEA-কে সরাসরি সহায়তা দিতে হবে, বিশেষত GSP সুবিধা হারানোর পর EU বাজারে 'এভরিথিং বাট আর্মস' (EBA) স্কিমের কার্যকর বিকল্প বাজার অনুসন্ধানে জোর দিতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাসির উদ্দিন

নাসির উদ্দিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: তৈরি পোশাক (RMG) ও টেক্সটাইল খাত। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

कोई टिप्पणी नहीं मिली


News Card Generator