বিশ্ব ফুটবল ও স্পোর্টস ফ্র্যাঞ্চাইজি: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বিশ্ব ফুটবল ও স্পোর্টস ফ্র্যাঞ্চাইজি: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?

সাব্বির হোসেন  avatar   
সাব্বির হোসেন
বিশ্ব ফুটবল ও স্পোর্টস ফ্র্যাঞ্চাইজি: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
বিশ্ব ফুটবল ও স্পোর্টস ফ্র্যাঞ্চাইজি: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব চেলসির রেকর্ড ১ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি ব্যয় সত্ত্বেও লিগ টেবিলে তাদের হতাশাজনক অবস্থান এবং উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ...

সম্প্রতি, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব চেলসির রেকর্ড ১ বিলিয়ন পাউন্ডের বেশি ব্যয় সত্ত্বেও লিগ টেবিলে তাদের হতাশাজনক অবস্থান এবং উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের মতো মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যাওয়া বিশ্ব ফুটবল ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর আর্থিক মডেল ও ক্রীড়া সাফল্যের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ব্যবধানকে স্পষ্ট করে তুলেছে। গত এক দশকে, বিশ্বজুড়ে ফুটবল ক্লাবগুলোর মালিকানা কাঠামো, বিশেষ করে মার্কিন বিনিয়োগকারীদের দ্বারা পরিচালিত ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলে পরিবর্তন এসেছে। এই মডেলের মূল ভিত্তি হলো, বাজার অর্থনীতির চাপ এবং তাৎক্ষণিক ফলাফল অর্জনের আকাঙ্ক্ষা, যা দীর্ঘমেয়াদী টেকসইতা এবং তৃণমূলের ফুটবল উন্নয়নের পরিপন্থী হতে পারে। প্রশ্ন উঠেছে, এই ধরনের বাণিজ্যিকীকরণের পেছনে নীতি প্রণেতাদের দূরদর্শিতার অভাব রয়েছে, নাকি এটি বৈশ্বিক ক্রীড়া অর্থনীতির অন্তর্নিহিত দুর্বলতার ফল?

ফুটবলকে কেবল একটি খেলা হিসেবে না দেখে, একটি মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের শিল্প হিসেবে দেখলে, এর অর্থনৈতিক মডেলের জটিলতা অনুধাবন করা সহজ হয়। ইউরোপিয়ান ক্লাব অ্যাসোসিয়েশন (ECA) এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, শীর্ষ ৫টি ইউরোপীয় লিগের সম্মিলিত রাজস্ব ২০২০-২১ মৌসুমে ১৫ বিলিয়ন ইউরো অতিক্রম করেছে, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ১০% বৃদ্ধি। এই বিপুল অর্থপ্রবাহের একটি বড় অংশ আসে সম্প্রচার স্বত্ব, বাণিজ্যিক চুক্তি এবং ম্যাচ ডে আয় থেকে। কিন্তু এই আয়ের সিংহভাগ ব্যয় হয় খেলোয়াড়দের উচ্চ বেতন এবং ট্রান্সফার ফিতে, যা অনেক সময় ক্লাবের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, লা লিগার ক্লাব বার্সেলোনার মতো ঐতিহ্যবাহী ক্লাবগুলোও বিপুল ঋণের বোঝায় জর্জরিত, যার পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ১.২ বিলিয়ন ইউরো। এটি কেবল একটি ক্লাবের সমস্যা নয়, বরং এটি নির্দেশ করে যে, খেলাধুলায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে অর্থনৈতিক মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে, তা অনেক সময় অদূরদর্শী এবং এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। এই ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলগুলো প্রায়শই স্থানীয় ক্রীড়া সংস্কৃতি এবং কমিউনিটি ডেভেলপমেন্টের চেয়ে বিশ্বব্যাপী বাজার দখল এবং ব্র্যান্ড ভ্যালু বাড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগী হয়, যা তৃণমূলের খেলোয়াড় তৈরি এবং স্থানীয় লিগগুলোকে দুর্বল করে তোলে। নীতি প্রণেতারা যদি এই আর্থিক মডেলের উপর পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে না পারেন, তবে এটি খেলাধুলার মূল স্পিরিটকেই ক্ষুণ্ন করতে পারে।

ক্রীড়া ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর বৈশ্বিক বিস্তার কেবল ফুটবল লিগেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি বাস্কেটবল (NBA), ক্রিকেট (IPL), এবং অন্যান্য খেলাধুলায়ও পরিলক্ষিত হচ্ছে। এই ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো প্রায়শই স্থানীয় নিয়মকানুন এবং শ্রম আইনকে পাশ কাটিয়ে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করে। বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, ক্রীড়া ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর জন্য যে নীতি প্রণয়ন করেছে, সেখানে স্থানীয় খেলোয়াড়দের অংশগ্রহণ, তৃণমূলের উন্নয়ন এবং আর্থিক স্বচ্ছতার উপর জোর দেওয়া হলেও, অনেক ক্ষেত্রে এর বাস্তবায়ন দুর্বল। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল) ক্রিকেটে বিদেশী খেলোয়াড়দের আধিপত্য এবং স্থানীয় খেলোয়াড়দের ন্যায্য পারিশ্রমিক না পাওয়ার অভিযোগ প্রায়শই শোনা যায়। World Bank এবং ADB-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ক্রীড়া অবকাঠামো এবং যুব উন্নয়ন কর্মসূচিতে বিনিয়োগের আহ্বান জানালেও, ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর বাণিজ্যিক স্বার্থ প্রায়শই এই ধরনের দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনাকে ছাপিয়ে যায়। আন্তর্জাতিক ক্রীড়া সংস্থা, যেমন ফিফা (FIFA) এবং উয়েফা (UEFA), তাদের 'ফিনান্সিয়াল ফেয়ার প্লে' (FFP) নীতি থাকা সত্ত্বেও, ক্লাবগুলোর উচ্চ ব্যয় এবং ঋণের লাগাম টেনে ধরতে পুরোপুরি সফল হয়নি, যা সিস্টেমের অন্তর্নিহিত দুর্বলতাকে প্রকট করে তোলে। এই দুর্বলতাগুলি কেবল আর্থিক নয়, বরং এটি ক্রীড়ার নৈতিকতা, প্রতিযোগিতা এবং বৈশ্বিক ক্রীড়া ইকোসিস্টেমের ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করে।

লিগ/টুর্নামেন্ট মোট রাজস্ব (২০২১-২২) খেলোয়াড়দের বেতন বাবদ ব্যয় (% রাজস্বের) নিট মুনাফা/ক্ষতি (২০২১-২২) বিদেশী বিনিয়োগের হার (আনুমানিক)
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ ৬.২ বিলিয়ন ইউরো ৬২% +৩৫০ মিলিয়ন ইউরো ৮০%
লা লিগা (স্পেন) ৩.৬ বিলিয়ন ইউরো ৭২% -১২০ মিলিয়ন ইউরো ৪৫%
সিরি আ (ইতালি) ২.৪ বিলিয়ন ইউরো ৭৫% -৩০০ মিলিয়ন ইউরো ৪০%
বুন্দেসলিগা (জার্মানি) ৩.৩ বিলিয়ন ইউরো ৫৩% +১০০ মিলিয়ন ইউরো ১৫%
ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (ক্রিকেট) ১.৪ বিলিয়ন ইউএসডি ৪৫% +২০০ মিলিয়ন ইউএসডি ৭৫%

উৎস: Deloitte Football Money League, UEFA Club Licensing Benchmarking Report, BCCI Annual Financial Reports।

সুপারিশ

  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে 'জাতীয় ক্রীড়া নীতি ২০২২' (যদি থাকে, অন্যথায় সর্বশেষ নীতি) এর অধীনে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক ক্রীড়া ইভেন্টগুলোর জন্য একটি বাধ্যতামূলক 'স্থানীয় খেলোয়াড় উন্নয়ন তহবিল' গঠনের আইন প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর মোট আয়ের ন্যূনতম ৫% এই তহবিলে জমা দিতে হবে এবং এর ব্যবহার সরাসরি যুব ক্রীড়া উন্নয়ন অধিদপ্তর দ্বারা নিরীক্ষিত হবে।
  • বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে যৌথভাবে একটি 'ক্রীড়া বিনিয়োগ নিরীক্ষা বোর্ড' গঠন করতে হবে, যা World Bank এবং ADB-এর আর্থিক স্বচ্ছতা নির্দেশিকা অনুসরণ করে ক্রীড়া ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোতে বিদেশী বিনিয়োগের উৎস, পরিমাণ এবং ব্যয়ের পদ্ধতি নিয়মিত নিরীক্ষণ করবে এবং অর্থ পাচার রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ করবে।
  • ফিফা (FIFA) এবং উয়েফা (UEFA) এর 'ফিনান্সিয়াল ফেয়ার প্লে' (FFP) নীতিমালার আদলে, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বা সংশ্লিষ্ট ক্রীড়া ফেডারেশন) কে স্থানীয় লিগগুলোর জন্য একটি কঠোর 'আর্থিক স্থিতিশীলতা নীতিমালা' প্রণয়ন ও কার্যকর করতে হবে, যেখানে ক্লাবগুলোর ঋণ সীমা, খেলোয়াড়দের বেতনের সর্বোচ্চ অনুপাত এবং আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য নির্দিষ্ট বিধিমালা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সাব্বির হোসেন

সাব্বির হোসেন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বিশ্ব ফুটবল ও স্পোর্টস ফ্র্যাঞ্চাইজি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

没有找到评论


News Card Generator