আন্তর্জাতিক সাহায্য ও ঋণ সংস্থা-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

আন্তর্জাতিক সাহায্য ও ঋণ সংস্থা-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন

মাহফুজার রহমান  avatar   
মাহফুজার রহমান
আন্তর্জাতিক সাহায্য ও ঋণ সংস্থা-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন
আন্তর্জাতিক সাহায্য ও ঋণ সংস্থা-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভাগুলোতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ঋণের শর্তাবলী এবং আন্তর্জাতিক সাহায্য বিতরণের কৌশল নি...

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভাগুলোতে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ঋণের শর্তাবলী এবং আন্তর্জাতিক সাহায্য বিতরণের কৌশল নিয়ে যে জোর বিতর্ক হয়েছে, তা বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক ক্ষমতার বিন্যাসের এক নতুন দিক উন্মোচন করেছে। বিশেষ করে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো ক্ষেত্রগুলোতে পশ্চিমা দাতা সংস্থাগুলোর পাশাপাশি চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এবং রাশিয়ার কৌশলগত বিনিয়োগগুলো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নতুন এক কূটনৈতিক জটিলতার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বাংলাদেশের মতো দেশগুলো একদিকে যেমন ঐতিহ্যবাহী দাতাদের কাছ থেকে সমর্থন প্রত্যাশা করে, তেমনি অন্যদিকে উদীয়মান অর্থনৈতিক পরাশক্তিদের কাছ থেকে প্রাপ্ত সুযোগগুলোকেও কাজে লাগাতে চায়। এই দ্বিমুখী টানাপোড়েন প্রায়শই আন্তর্জাতিক মঞ্চে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে এবং জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অত্যন্ত সতর্ক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে।

আন্তর্জাতিক সাহায্য ও ঋণ সংস্থাগুলোর কার্যক্রম কেবল অর্থনৈতিক লেনদেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর গভীরে প্রোথিত থাকে ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের এক অদৃশ্য জাল। উদাহরণস্বরূপ, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোকে প্রায়শই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ, বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে, এই প্ল্যাটফর্মটিকে তার বৈশ্বিক পরিচিতি এবং সফট পাওয়ার বৃদ্ধির জন্য সফলভাবে ব্যবহার করে আসছে। তবে, এই কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে যে পরিমাণ অর্থ সহায়তা বা প্রযুক্তিগত সহযোগিতা পাওয়া যায়, তার বাইরেও দাতা দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক জোরদার হয়, যা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের অবস্থানকে সুদৃঢ় করে। অন্যদিকে, ঋণদাতা সংস্থাগুলো, যেমন এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) বা জাপানের জাইকা, যখন কোনো বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থায়ন করে, তখন তারা শুধু আর্থিক শর্তাবলীই আরোপ করে না, বরং প্রকল্প বাস্তবায়নের পদ্ধতি, পরিবেশগত মানদণ্ড এবং সুশাসনের বিষয়গুলোকেও তাদের এজেন্ডার অংশ করে তোলে। এই শর্তগুলো কখনো কখনো অভ্যন্তরীণ নীতি নির্ধারণে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে এবং জাতীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সংবেদনশীল আলোচনা তৈরি করে। এই প্রেক্ষাপটে, ঋণ গ্রহণকারী দেশগুলোকে তাদের নিজস্ব উন্নয়ন অগ্রাধিকার এবং দাতা দেশগুলোর ভূ-রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হয়, যা প্রায়শই দীর্ঘমেয়াদী কূটনৈতিক আলোচনার জন্ম দেয়।

আন্তর্জাতিক ঋণ ও সাহায্য সংস্থাগুলোর অজানা দিকের মধ্যে রয়েছে তাদের আঞ্চলিক সংস্থাসমূহের উপর প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা। যেমন, দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) এবং বে অফ বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন (বিমসটেক)-এর মতো আঞ্চলিক জোটগুলোতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা তাদের প্রকল্পভিত্তিক সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করে। সার্কের স্থবিরতা বা বিমসটেকের অপেক্ষাকৃত ধীর অগ্রগতিতে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর সরাসরি হাত না থাকলেও, তাদের ঋণের শর্তাবলী বা সহায়তা প্যাকেজগুলো প্রায়শই আঞ্চলিক দেশগুলোকে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের দিকে বেশি ঝুঁকতে উৎসাহিত করে, যা আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামোকে দুর্বল করে। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো বৃহৎ দাতা সংস্থা সার্কের সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে আঞ্চলিক অবকাঠামো প্রকল্পের পরিবর্তে দ্বিপাক্ষিক ভিত্তিতে নিজস্ব শর্তে অর্থায়ন করে, তবে তা আঞ্চলিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে। একইভাবে, জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক তহবিল বিতরণের ক্ষেত্রেও দাতা সংস্থাগুলোর নিজস্ব কৌশলগত অগ্রাধিকার থাকে, যা কখনো কখনো ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর প্রকৃত চাহিদা থেকে ভিন্ন হতে পারে। এই তহবিলগুলো প্রায়শই নির্দিষ্ট প্রযুক্তি বা সমাধানের সাথে জড়িত থাকে, যা দাতা দেশগুলোর শিল্প স্বার্থকে প্রতিফলিত করে এবং গ্রহণকারী দেশগুলোকে তাদের নিজস্ব উদ্ভাবনী সমাধান থেকে বিচ্যুত করতে পারে। এই জটিলতাগুলো অনুধাবন করা এবং কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা একটি দেশের পররাষ্ট্রনীতির জন্য অপরিহার্য।

প্রতিষ্ঠানের নাম ২০২৩ সালের বৈশ্বিক সাহায্য প্রতিশ্রুতি (বিলিয়ন USD) বাংলাদেশের জন্য অনুমোদিত প্রকল্প সংখ্যা (২০২৩) ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব ক্ষেত্র
বিশ্বব্যাংক ৭৩.৬ ১২ অবকাঠামো, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সুশাসন
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) ২২.৮ ৯ পরিবহন, জ্বালানি, নগর উন্নয়ন
জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (JICA) ১৩.৫ ৫ বৃহৎ অবকাঠামো, প্রযুক্তি হস্তান্তর
চীন ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (CDB) ২৯.১ ৪ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) সংশ্লিষ্ট প্রকল্প
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম (UN Peacekeeping) ৬.০ (বার্ষিক বাজেট) ৩ (প্রশিক্ষণ/সক্ষমতা বৃদ্ধি) নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা, মানবিক সহায়তা

উৎস: বিশ্বব্যাংক বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৩, এডিবি বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৩, জাইকা বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৩, সিডিবি বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৩, ইউএন পিসকিপিং ফিন্যান্সিয়াল স্ট্যাটিস্টিকস।

সুপারিশ

  • পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি বিশেষ 'ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি বিশ্লেষণ সেল' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা আন্তর্জাতিক সাহায্য ও ঋণ সংস্থাগুলোর প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলোর দীর্ঘমেয়াদী ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব, শর্তাবলী এবং আঞ্চলিক জোট (যেমন BIMSTEC ও SAARC) এর উপর সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া নিরূপণ করবে। এই সেলকে নিয়মিতভাবে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সাথে সমন্বয় সাধন করতে হবে।
  • সরকারকে 'বৈদেশিক সাহায্য ও ঋণ গ্রহণ নীতি, ২০২৪' (প্রস্তাবিত) প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ঋণ ও সাহায্য গ্রহণের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা, প্রযুক্তি হস্তান্তর, স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত মানদণ্ডের উপর সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকবে। এই নীতিতে ঋণ চুক্তির শর্তাবলী স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য একটি বাধ্যতামূলক সংসদীয় পর্যালোচনা প্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
  • জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে শুধুমাত্র আর্থিক সুবিধার দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে, বরং বৈশ্বিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ় করার একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। এক্ষেত্রে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে UN Peacekeeping Operations-এর কৌশলগত পরিকল্পনায় বাংলাদেশের ভূমিকা আরও বাড়ানোর জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করতে হবে এবং শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর জন্য গঠিত ফোরামে নেতৃত্বশীল ভূমিকা পালনের মাধ্যমে নতুন ভূ-রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মাহফুজার রহমান

মাহফুজার রহমান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: আন্তর্জাতিক সাহায্য ও ঋণ সংস্থা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nema komentara


News Card Generator