আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও স্পেস-টেক: তুলনামূলক বিশ্লেষণ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও স্পেস-টেক: তুলনামূলক বিশ্লেষণ

জাহিদ হাসান  avatar   
জাহিদ হাসান
আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও স্পেস-টেক: তুলনামূলক বিশ্লেষণ
আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও স্পেস-টেক: তুলনামূলক বিশ্লেষণ
ছবি: সংগৃহীত
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (BSCL) দ্বিতীয় বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ (BS-2) উৎক্ষেপণের জন্য আন্তর্জাতিক পরা...

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (BSCL) দ্বিতীয় বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ (BS-2) উৎক্ষেপণের জন্য আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করে, যা দেশের মহাকাশ প্রযুক্তির ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এই পদক্ষেপ কেবল বাণিজ্যিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয় না, বরং মহাকাশ অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করার আকাঙ্ক্ষাকেও প্রতিফলিত করে। বর্তমানে, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ (BS-1) তার নির্ধারিত কক্ষপথে সফলভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, যা দেশের টেলিযোগাযোগ, টেলিভিশন সম্প্রচার এবং দূর্যোগ ব্যবস্থাপনায় এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে, বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সাথে তুলনা করলে, বাংলাদেশের এই স্যাটেলাইট কর্মসূচি তুলনামূলকভাবে নতুন হলেও এর কৌশলগত গুরুত্ব এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা অনস্বীকার্য। শ্রীলঙ্কা, নেপাল এবং আফগানিস্তানের মতো দেশগুলো এখনও নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করতে পারেনি, যেখানে ভারত ও পাকিস্তান মহাকাশ প্রযুক্তিতে বহু দশক ধরে বিনিয়োগ করে আসছে। এই পটভূমিতে, বাংলাদেশের দ্বিতীয় স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের উদ্যোগটি জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক স্পেস-টেক প্রতিযোগিতায় নিজস্ব স্থান করে নেওয়ার একটি সুস্পষ্ট অভিপ্রায়।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণের পর থেকে, দেশের স্যাটেলাইট ব্যান্ডউইথের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বিএসএল (BSCL) নেপাল, ফিলিপাইন ও মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশে ট্রানসপন্ডার লিজ দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে, যা দেশের মহাকাশ প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তবে, বৈশ্বিক স্পেস-টেক বাজারের দ্রুত পরিবর্তনশীল গতিপ্রকৃতি এবং ক্ষুদ্র স্যাটেলাইট (স্মলস্যাট) ও কিউবস্যাট প্রযুক্তির উত্থান বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ উভয়ই তৈরি করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারতের ইসরো (ISRO) বহু বছর ধরে স্বল্প খরচে বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে আসছে, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি আদর্শ মডেল। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, স্পারসো (SPARRSO) ১৯৭৮ সাল থেকে মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন সংক্রান্ত প্রাথমিক গবেষণা চালিয়ে এলেও, এর সক্ষমতা মূলত উপাত্ত সংগ্রহ ও বিশ্লেষণেই সীমাবদ্ধ ছিল। এখন প্রয়োজন হচ্ছে গবেষণা থেকে বাস্তব প্রযুক্তির প্রয়োগে স্থানান্তরিত হওয়া এবং বাণিজ্যিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে দেশীয় প্রযুক্তিবিদদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা। এক্ষেত্রে, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগকে বিএসএল এবং স্পারসোর মধ্যে একটি কার্যকর সমন্বয় সাধন করতে হবে, যাতে মহাকাশ গবেষণা এবং বাণিজ্যিক অ্যাপ্লিকেশন একে অপরের পরিপূরক হতে পারে। শুধু বড় স্যাটেলাইট নির্ভর না হয়ে, ন্যানো-স্যাটেলাইট বা কিউবস্যাট প্রকল্পে বিনিয়োগের মাধ্যমে দেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধি করা যেতে পারে, যা ভবিষ্যতের জন্য দক্ষ জনবল তৈরি করবে এবং কম খরচে নির্দিষ্ট প্রয়োজনের জন্য স্যাটেলাইট ডেটা সংগ্রহে সহায়তা করবে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে, মহাকাশ প্রযুক্তি এখন শুধু বৃহৎ দেশগুলোর একচেটিয়া অধিকার নয়। লো আর্থ অরবিট (LEO) স্যাটেলাইট কনস্টেলেশন, যেমন স্টারলিংক বা ওয়ানওয়েব, বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট সেবার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। বাংলাদেশকেও এই প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে হলে শুধুমাত্র টেলিভিশন সম্প্রচার বা টেলিযোগাযোগের গণ্ডি পেরিয়ে মহাকাশ ডেটা অ্যানালিটিক্স, রিমোট সেন্সিং অ্যাপ্লিকেশন এবং মহাকাশ-ভিত্তিক ইন্টারনেট সেবার মতো উচ্চমূল্যের পরিষেবাগুলোতে মনোযোগ দিতে হবে। বিটিআরসি (BTRC) এর উচিত হবে এই নতুন প্রযুক্তির বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি ও লাইসেন্সিং কাঠামো দ্রুত তৈরি করা, যা দেশীয় উদ্যোক্তাদের এই খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে। উদাহরণস্বরূপ, সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাত ক্ষুদ্র হলেও মহাকাশ প্রযুক্তিতে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়েছে। বাংলাদেশের জন্য, এই দেশগুলোর মডেল অনুসরণ করা যেতে পারে, যেখানে গবেষণা ও উন্নয়নকে বাণিজ্যিকীকরণের সাথে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত করা হয়েছে। দ্বিতীয় স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের ক্ষেত্রে, শুধুমাত্র ট্রানসপন্ডার লিজ দেওয়ার বাইরেও এর মাল্টি-মিশন সক্ষমতা, যেমন – আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ, কৃষি উৎপাদন পূর্বাভাস, বা দুর্যোগ পূর্ব সতর্কীকরণ ব্যবস্থায় এর ব্যবহার নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এটি কেবল দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে না, বরং দুর্যোগ প্রবণ বাংলাদেশে জননিরাপত্তায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

স্যাটেলাইট কার্যক্রমের ধাপ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ (BS-1) বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ (BS-2) (পরিকল্পিত) তুলনামূলক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (উদাহরণ)
উৎক্ষেপণের সাল ২০১৮ ২০২৫ (লক্ষ্য) ভারত: আর্যভট্ট (১৯৭৫), শ্রীলঙ্কা: প্রথম নিজস্ব স্যাটেলাইট (২০২২)
মোট ট্রানসপন্ডার সংখ্যা ৪০টি (২৬টি কেইউ-ব্যান্ড, ১৪টি সি-ব্যান্ড) অনির্দিষ্ট (ভূ-পর্যবেক্ষণ/যোগাযোগ/রিমোট সেন্সিং) ইউরোপীয় ইউনিয়নের গ্যালিলিও: ৩০টি স্যাটেলাইট কনস্টেলেশন
ব্যান্ডউইথের ব্যবহার (দেশীয়) প্রায় ৫০% (২০২৩) ভূ-পর্যবেক্ষণ/যোগাযোগের জন্য সম্পূর্ণ দেশীয় ব্যবহার ভারত: ইনস্যাট সিরিজের প্রায় ৮০% দেশীয় ব্যবহার
ব্যান্ডউইথ রপ্তানি (বৈদেশিক) নেপাল, ফিলিপাইন, মধ্যপ্রাচ্য (২০২৩) পরিকল্পিত, উচ্চমূল্যের ডেটা পরিষেবা লুক্সেমবার্গ (SES): বিশ্বের বৃহত্তম স্যাটেলাইট অপারেটরদের একজন
পরিচালনাকারী সংস্থা বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (BSCL) বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (BSCL) ভারতের ISRO, জাপানের JAXA
প্রাথমিক উদ্দেশ্য যোগাযোগ, সম্প্রচার, ইন্টারনেট ভূ-পর্যবেক্ষণ, রিমোট সেন্সিং, নিরাপত্তা, যোগাযোগ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের USGS (ল্যান্ডস্যাট): পরিবেশ পর্যবেক্ষণ

উৎস: বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (BSCL), ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ, SPARRSO, আন্তর্জাতিক মহাকাশ সংস্থাগুলোর প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ কর্তৃক অবিলম্বে একটি 'জাতীয় মহাকাশ নীতি' প্রণয়ন করা হোক, যা বিএসএল, স্পারসো এবং বিটিআরসি-এর মধ্যে সমন্বয় সাধন করে মহাকাশ গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং বাণিজ্যিকীকরণের একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা দেবে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও ন্যানো-স্যাটেলাইট উন্নয়ন এবং স্থানীয় স্টার্টআপদের জন্য ইনকিউবেশন প্রোগ্রাম চালুর মাধ্যমে।
  • বিটিআরসিকে (BTRC) দ্রুত একটি আধুনিক 'স্পেস-টেক লাইসেন্সিং ও রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক' তৈরি করতে হবে, যা লো আর্থ অরবিট (LEO) স্যাটেলাইট ডেটা পরিষেবা, মহাকাশ-ভিত্তিক ইন্টারনেট এবং রিমোট সেন্সিং অ্যাপ্লিকেশনগুলোর বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা দেবে এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে।
  • বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডকে (BSCL) তার দ্বিতীয় স্যাটেলাইট (BS-2) উৎক্ষেপণের জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব চুক্তিতে (যেমন - সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব বা PPP মডেল) দেশীয় প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং স্থানীয় প্রকৌশলীদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচির শর্ত অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ নিজস্ব স্যাটেলাইট ডিজাইন ও নির্মাণে সক্ষম হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাহিদ হাসান

জাহিদ হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও স্পেস-টেক। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

לא נמצאו הערות


News Card Generator