বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ

নাবিলা তাবাসসুম  avatar   
নাবিলা তাবাসসুম
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ঢাকা শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চিত্র উদ্বেগজনক। দৈনিক প্রায় ১১,০০০ মেট্রিক টন কঠিন বর্জ্য...

সম্প্রতি, পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ঢাকা শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চিত্র উদ্বেগজনক। দৈনিক প্রায় ১১,০০০ মেট্রিক টন কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হলেও এর মাত্র ৩০-৩৫ শতাংশ সঠিকভাবে সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাত করা হয়, যা দেশের সামগ্রিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকে প্রকটভাবে তুলে ধরে। এই বিপুল পরিমাণ অব্যবস্থাপিত বর্জ্য একদিকে যেমন পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে, তেমনই অন্যদিকে সার্কুলার ইকোনমির (বৃত্তাকার অর্থনীতি) অপার সম্ভাবনাকে চাপা দিচ্ছে। যেখানে বর্জ্যকে সম্পদ হিসেবে গণ্য করে পুনরায় উৎপাদন চক্রে ফিরিয়ে আনা সম্ভব, সেখানে আমাদের দীর্ঘদিনের রৈখিক অর্থনৈতিক মডেল (গ্রহণ-উৎপাদন-ব্যবহার-ফেলে দাও) কার্যত দেশের কৃষি, শিল্প ও পরিবেশ খাতে অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি সুসংগঠিত ও দূরদর্শী কৌশল প্রণয়ন অত্যাবশ্যক, যা শুধুমাত্র বর্জ্য হ্রাস নয়, বরং সম্পদের টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করবে।

বাংলাদেশের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমির পথে প্রধান অন্তরায়গুলোর মধ্যে রয়েছে সমন্বয়হীনতা এবং নীতি বাস্তবায়নের দুর্বলতা। যদিও পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বিভিন্ন নীতিমালা প্রণীত হয়েছে, যেমন কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১, কিন্তু এর মাঠ পর্যায়ের প্রয়োগ অত্যন্ত ঢিলেঢালা। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতার অভাব, আধুনিক প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর অপ্রতুলতা এবং বর্জ্য পৃথকীকরণে নাগরিক সচেতনতার অভাব এই ব্যর্থতার মূল কারণ। উদাহরণস্বরূপ, কৃষি খাতে, যেখানে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কৃষি বর্জ্য (যেমন ধানের খড়, ফসলের অবশিষ্টাংশ) উৎপন্ন হয়, সেখানে DAE (কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর) এবং BARI (বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা সত্ত্বেও, এই বর্জ্যকে জৈব সার বা বায়োমাস জ্বালানিতে রূপান্তরের উদ্যোগ এখনও ব্যাপকতা লাভ করেনি। ফলে, একদিকে যেমন কৃষকরা রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরশীল থাকছেন, তেমনি অন্যদিকে পরিবেশ দূষণ বাড়ছে। এই অব্যবস্থাপনা কেবল আর্থিক ক্ষতিই করছে না, বরং মাটির উর্বরতা হ্রাস এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবকেও তীব্রতর করছে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি উৎপাদনশীলতার জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।

সার্কুলার ইকোনমির ধারণা শুধুমাত্র বর্জ্য হ্রাস বা পুনর্ব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি সামগ্রিক অর্থনৈতিক মডেল যেখানে সম্পদ ব্যবহারের দক্ষতা, পণ্যের দীর্ঘস্থায়িত্ব এবং পুনঃব্যবহারের সুযোগ সর্বোচ্চ গুরুত্ব পায়। BRRI (বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট) এবং BARC (বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল) এর গবেষণায় দেখা গেছে, ধানের খড় ও অন্যান্য কৃষি বর্জ্য ব্যবহার করে উন্নত মানের কম্পোস্ট সার উৎপাদন করা সম্ভব, যা মাটির স্বাস্থ্য উন্নয়নে অত্যন্ত কার্যকর। কিন্তু এই গবেষণা ও প্রযুক্তির বাণিজ্যিকীকরণ এবং কৃষকদের কাছে সহজলভ্য করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলোকে (SMEs) এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রণোদনা ও নীতিগত সহায়তা অনুপস্থিত। এছাড়া, খাদ্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়; শহর ও গ্রাম উভয় স্থানেই খাদ্য বর্জ্য পচে মিথেন গ্যাস উৎপন্ন করে, যা গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে বড় অবদান রাখে। অথচ, এই বর্জ্যকে বায়োগ্যাস প্ল্যান্টে ব্যবহার করে নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদন এবং জৈব সার তৈরি করা সম্ভব। টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সমন্বিত ইকোসিস্টেম তৈরি করতে না পারলে, সার্কুলার ইকোনমির পূর্ণাঙ্গ সুবিধা ভোগ করা সম্ভব হবে না।

খাত/বর্জ্যের ধরন বার্ষিক উৎপাদন (মেট্রিক টন) পুনর্ব্যবহার/প্রক্রিয়াজাতকরণ (%) ক্ষতি/অপচয় (বার্ষিক আনুমানিক) সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান
কৃষি বর্জ্য (ধানের খড়, ফসলের অবশিষ্টাংশ) প্রায় ১০-১২ মিলিয়ন (২০২০-২১) ১৫-২০% (জ্বালানি/পশুখাদ্য হিসেবে আংশিক) মাটির উর্বরতা হ্রাস, পরিবেশ দূষণ DAE, BARI, BRRI, BARC
শহর অঞ্চলের কঠিন বর্জ্য (ঢাকা) প্রায় ৪ মিলিয়ন (২০২২) ৩০-৩৫% (সংগ্রহ ও আংশিক প্রক্রিয়াজাতকরণ) ভূমি ও জল দূষণ, জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি, মিথেন নির্গমন পরিবেশ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার
খাদ্য বর্জ্য (ভোগের পর) প্রায় ৩-৪ মিলিয়ন (২০২১) ৫-১০% (খুব সীমিত বায়োগ্যাস/কম্পোস্ট) মিথেন গ্যাস নির্গমন, পুষ্টি উপাদানের অপচয় পরিবেশ মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়

উৎস: পরিবেশ অধিদপ্তর, DAE, BARI, BRRI, BARC এর বিভিন্ন প্রকাশনা ও গবেষণা প্রতিবেদন (২০২০-২০২২ সালের তথ্য অবলম্বনে)।

সুপারিশ

  • পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১ এর কঠোর ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এর অধীনে, পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনগুলোকে বর্জ্য পৃথকীকরণ (উৎস থেকে) বাধ্যতামূলক করার জন্য আইনগত ক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে এবং DAE ও BARI এর সহযোগিতায় কৃষি বর্জ্যকে জৈব সার ও বায়োমাস উৎপাদনে রূপান্তরের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে পাইলট প্রকল্প চালু করতে হবে।
  • BRRI এবং BARC এর গবেষণালব্ধ প্রযুক্তিগুলোকে বাণিজ্যিকীকরণে সহায়তা প্রদানের জন্য একটি 'সার্কুলার ইকোনমি ইনোভেশন ফান্ড' প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই ফান্ডের মাধ্যমে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের (বিশেষত SME) কৃষি ও খাদ্য বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ প্ল্যান্ট স্থাপন এবং জৈব সার ও বায়োগ্যাস উৎপাদনে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হবে। এক্ষেত্রে, সহজ শর্তে ঋণ এবং কর প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে।
  • জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তকের অন্তর্ভুক্তির মাধ্যমে প্রাথমিক স্তর থেকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমির গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। পাশাপাশি, পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (LGED) যৌথভাবে দেশব্যাপী একটি শক্তিশালী জনসচেতনতা কর্মসূচি (যেমন "আমার বর্জ্য, আমার সম্পদ" ক্যাম্পেইন) পরিচালনা করবে, যা নাগরিক পর্যায়ে বর্জ্য পৃথকীকরণ এবং পুনঃব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাবিলা তাবাসসুম

নাবিলা তাবাসসুম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

کوئی تبصرہ نہیں ملا


News Card Generator