সামষ্টিক অর্থনীতি ও ইনফ্লেশন: ডলার সংকটে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

সামষ্টিক অর্থনীতি ও ইনফ্লেশন: ডলার সংকটে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ

ফারহানা ইয়াসমিন  avatar   
ফারহানা ইয়াসমিন
সামষ্টিক অর্থনীতি ও ইনফ্লেশন: ডলার সংকটে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ
সামষ্টিক অর্থনীতি ও ইনফ্লেশন: ডলার সংকটে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতির নতুন চাপ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কর্তৃক জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের পর ভোক্তা পর্যায়ে ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্য লিটারে ৫ টাকা বৃদ্ধি পাওয়া...

সম্প্রতি বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) কর্তৃক জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের পর ভোক্তা পর্যায়ে ডিজেল ও কেরোসিনের মূল্য লিটারে ৫ টাকা বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়েছে। এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি এমন এক সময়ে ঘটল যখন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ব্যাপক চাপ বিদ্যমান এবং ডলারের বিপরীতে টাকার মান ক্রমাগত অবমূল্যায়িত হচ্ছে, যা আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির জন্য আরও জটিলতা সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম কিছুটা স্থিতিশীল থাকলেও দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে ডলার সংকটের কারণে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিইআরসি এই মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে, যা পণ্য পরিবহন ও উৎপাদন খরচে সরাসরি প্রভাব ফেলছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।

ডলার সংকটের মূল কারণ নিহিত রয়েছে রপ্তানি আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয়ের ক্রমাগত ঊর্ধ্বগতিতে, যা বাণিজ্য ঘাটতিকে স্ফীত করেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) রপ্তানি আয় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম ছিল, যেখানে একই সময়ে আমদানি ব্যয় অপ্রত্যাশিতভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, বিশেষ করে মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্প কাঁচামাল এবং জ্বালানি তেল আমদানিতে। এই বাণিজ্য ঘাটতি মেটাতে রিজার্ভ থেকে ডলার সরবরাহ করতে হচ্ছে, যা রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ডলারের এই সরবরাহ ঘাটতি ব্যাংকগুলোতে বৈদেশিক মুদ্রার তারল্য সংকট তৈরি করেছে, যার ফলে ব্যাংকগুলো উচ্চ বিনিময় হারে ডলার কেনাবেচা করতে বাধ্য হচ্ছে। এই উচ্চ বিনিময় হার কেবল জ্বালানি আমদানি ব্যয়ই বাড়ায়নি, বরং শিল্প উৎপাদন ও কৃষি খাতে ব্যবহৃত অন্যান্য আমদানিকৃত কাঁচামালের দামও বাড়িয়ে দিয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি করে এবং শেষ পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের মূল্যস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করে। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ইতোমধ্যে ডলারের বিনিময় হারকে বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে, কারণ এতে আমদানিকারকদের জন্য ডলার প্রাপ্তি আরও ব্যয়বহুল হয়ে পড়েছে।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি এবং ডলারের বিনিময় হারজনিত চাপের সম্মিলিত প্রভাবে দেশের মূল্যস্ফীতি নতুন মাত্রা লাভ করেছে, যা সেন্ট্রাল ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা মারাত্মকভাবে হ্রাস করছে। মূলত, কৃষি উৎপাদন থেকে শুরু করে শিল্প কারখানার পণ্য পরিবহন, বিদ্যুত উৎপাদন এবং এমনকি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রীর বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়াতেও জ্বালানি তেলের ব্যবহার অপরিহার্য। ফলে, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি প্রতিটি খাতে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। এই বর্ধিত ব্যয় উৎপাদকরা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়, যার ফলে সাধারণ মানুষের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ক্রয় করা কঠিন হয়ে পড়ে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কর্তৃক আরোপিত কিছু আমদানি শুল্ক ও করও পণ্যের দাম বাড়াতে ভূমিকা রাখছে, যদিও ডলার সংকটের কারণে রাজস্ব আদায়েও কিছুটা চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এই চক্রাকার প্রভাব অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলছে এবং মুদ্রাস্ফীতির হারকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার বাইরে ঠেলে দিচ্ছে। শেয়ারবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এই অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধরে রাখতে বিভিন্ন নীতিগত পদক্ষেপ নিলেও, সামষ্টিক অর্থনীতির এই চ্যালেঞ্জ শেয়ারবাজারের স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করছে।

খাত ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথমার্ধ (জুলাই-ডিসেম্বর) পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় পরিবর্তন (%)
মোট রপ্তানি আয় (বিলিয়ন ডলার) ২৭.৩১ +৯.৭৭
মোট আমদানি ব্যয় (বিলিয়ন ডলার) ৪৫.২৬ +১২.৫০
বাণিজ্য ঘাটতি (বিলিয়ন ডলার) ১৭.৯৫ +২০.৬২
জ্বালানি তেল আমদানি ব্যয় (বিলিয়ন ডলার) ৫.৪০ +৩২.৫০
মাসিক গড় মূল্যস্ফীতি হার (%) ৮.৭৯ +১.১০ (পয়েন্ট)

উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি), বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

সুপারিশ

  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে সমন্বিতভাবে একটি 'আমদানি যৌক্তিকীকরণ নীতি' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে বিলাসবহুল ও অপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করতে সুনির্দিষ্ট শুল্ক ও নন-ট্যারিফ বাধা আরোপ করা হবে এবং অত্যাবশ্যকীয় পণ্য আমদানিতে অগ্রাধিকারমূলক ডলার সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। এই নীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক ডলারের বিনিময় হারকে একটি সুনির্দিষ্ট সীমার মধ্যে স্থিতিশীল রাখার জন্য কার্যকরী হস্তক্ষেপমূলক কৌশল (যেমন, প্রয়োজনে রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি) প্রয়োগের বিধান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)-কে যৌথভাবে একটি 'জ্বালানি মূল্য স্থিতিশীলকরণ তহবিল' গঠন করতে হবে, যেখানে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমার সময় থেকে উদ্বৃত্ত অর্থ জমা রাখা হবে এবং দাম বাড়ার সময় ভর্তুকি হিসেবে ব্যবহার করা হবে, যাতে অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের দামের অস্থিরতা সহনীয় পর্যায়ে রাখা যায় এবং উৎপাদক ও ভোক্তাদের ওপর আকস্মিক চাপ কমানো যায়। এই তহবিলের অর্থায়নে অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় হ্রাস এবং কর ফাঁকি রোধে এনবিআর-কে আরও কঠোর হতে হবে।
  • রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)-কে সমন্বিতভাবে রপ্তানি বহুমুখীকরণে এবং সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে সুনির্দিষ্ট ও সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ইপিবি-কে নতুন রপ্তানি বাজার অন্বেষণ এবং অপ্রচলিত পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধিতে বিশেষ প্রণোদনা ও নীতি সহায়তা প্রদান করতে হবে। একই সাথে, বিএসইসি-কে শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আরও আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি করতে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালার সরলীকরণ এবং বিনিয়োগ সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে বিশেষ পদক্ষেপ নিতে হবে, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদী টেকসই সমাধান দেবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ফারহানা ইয়াসমিন

ফারহানা ইয়াসমিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: সামষ্টিক অর্থনীতি ও ইনফ্লেশন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nessun commento trovato


News Card Generator