হেলথ-টেকে ডেটা সুরক্ষা: ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবায় আস্থা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

হেলথ-টেকে ডেটা সুরক্ষা: ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবায় আস্থা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ

ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা  avatar   
ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা
হেলথ-টেকে ডেটা সুরক্ষা: ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবায় আস্থা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ
হেলথ-টেকে ডেটা সুরক্ষা: ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবায় আস্থা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, ২০২৩ সালের মে মাসে প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশের ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা খাতে ডেটা সুরক্ষার দুর্বলতা জনসাধারণের...

সম্প্রতি, ২০২৩ সালের মে মাসে প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশের ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা খাতে ডেটা সুরক্ষার দুর্বলতা জনসাধারণের আস্থা অর্জনে একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। এই প্রতিবেদনে বিশেষ করে টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্মগুলোতে রোগীর ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের কয়েকটি ঘটনার দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে, যেখানে তৃতীয় পক্ষের কাছে ডেটা ফাঁস হওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। স্বাস্থ্যসেবার মতো সংবেদনশীল খাতে এমন ডেটা সুরক্ষার অভাবে ব্যবহারকারীরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে দ্বিধাগ্রস্ত হচ্ছেন, যা ২০৩০ সালের মধ্যে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা অর্জনের জাতীয় লক্ষ্যকে ব্যাহত করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে, কীভাবে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবায় আস্থা ফিরিয়ে আনা যায় এবং ডেটা সুরক্ষাকে একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায়, তা নিয়ে গভীর আলোচনা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের হেলথ-টেক খাত দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। কোভিড-১৯ মহামারী চলাকালীন টেলিমেডিসিন এবং অনলাইন স্বাস্থ্য পরামর্শের চাহিদা অপ্রত্যাশিতভাবে বৃদ্ধি পায়। সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (CRI) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশে প্রায় ১.৫ কোটি মানুষ বিভিন্ন ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করেছেন, যা ২০১৯ সালের তুলনায় প্রায় ৫০০% বেশি। এই দ্রুত সম্প্রসারণের সাথে সাথে ডেটা সুরক্ষার চ্যালেঞ্জগুলো আরও প্রকট হয়ে উঠেছে। রোগীদের রোগ সংক্রান্ত তথ্য, চিকিৎসার ইতিহাস, এমনকি ব্যক্তিগত বায়োমেট্রিক ডেটা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংরক্ষণ করা হয়। এই ডেটার অপব্যবহার বা অননুমোদিত অ্যাক্সেস কেবল ব্যক্তির গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে না, বরং আর্থিক প্রতারণা, সামাজিক কলঙ্ক এবং এমনকি ব্ল্যাকমেলের মতো গুরুতর পরিণতিও ডেকে আনতে পারে। ডেটা সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত আইনি কাঠামো এবং প্রযুক্তিগত সুরক্ষার অভাব, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি আকারের হেলথ-টেক স্টার্টআপগুলির ক্ষেত্রে, এই ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। অনেক ক্ষেত্রেই এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ডেটা এনক্রিপশন, অ্যাক্সেস কন্ট্রোল এবং নিয়মিত নিরাপত্তা নিরীক্ষার মতো অত্যাবশ্যকীয় প্রটোকল বাস্তবায়নের সক্ষমতা বা বাজেট থাকে না।

ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবায় আস্থা অর্জনের জন্য শুধু প্রযুক্তিগত সমাধানই যথেষ্ট নয়, বরং একটি শক্তিশালী আইনি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো থাকা অপরিহার্য। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) এর একটি সমীক্ষা অনুসারে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের ডেটা সুরক্ষা আইন এখনও ডিজিটাল স্বাস্থ্য খাতের সুনির্দিষ্ট চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। ব্যক্তিগত ডেটা সুরক্ষা আইন, ২০২৩ (প্রস্তাবিত) যদিও একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, তবে এতে স্বাস্থ্য ডেটার সংবেদনশীলতা এবং এর জন্য বিশেষ সুরক্ষা ব্যবস্থার বিষয়ে আরও স্পষ্ট নির্দেশনার প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, হেলথ ডেটা অ্যানোনিমাইজেশন (anonymization) এবং সিউডোঅ্যানোনিমাইজেশন (pseudonymization) এর মতো পদ্ধতির প্রয়োগ বাধ্যতামূলক করা এবং ডেটা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উপরন্তু, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীদের ডেটা সুরক্ষা নীতি সম্পর্কে নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন, কারণ অনেক সময় অভ্যন্তরীণ অসচেতনতা বা অবহেলার কারণেও ডেটা ফাঁস হওয়ার ঘটনা ঘটে। ডেটা সুরক্ষা অডিটের অভাব এবং লঙ্ঘন পরবর্তী জবাবদিহিতার প্রক্রিয়া দুর্বল হওয়ায় দায়ীদের চিহ্নিত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, যা অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করে।

বছর ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা ব্যবহারকারীর সংখ্যা (আনুমানিক) ডেটা লঙ্ঘনের অভিযোগের সংখ্যা (হেলথ-টেক খাতে) ডেটা সুরক্ষা আইন বাস্তবায়নের স্কোর (০-৫, ৫=সর্বোত্তম)
২০১৯ ৩০ লক্ষ ১০ ১.৫
২০২০ ৭০ লক্ষ ২৫ ১.৮
২০২১ ১২০ লক্ষ ৪৫ ২.০
২০২২ ১৫০ লক্ষ ৭০ ২.২
২০২৩ (প্রাক্কলিত) ১৮০ লক্ষ ১০০+ ২.৫

উৎস: ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, এডিবি, সিআরআই এবং বিভিন্ন দেশীয় হেলথ-টেক প্ল্যাটফর্মের প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে সংকলিত।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগকে ব্যক্তিগত ডেটা সুরক্ষা আইন, ২০২৩ (প্রস্তাবিত) এর অধীনে একটি সুনির্দিষ্ট 'হেলথ ডেটা সুরক্ষা প্রবিধান' তৈরি ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে রোগীর সম্মতি, ডেটা এনক্রিপশন, অ্যাক্সেস কন্ট্রোল এবং ডেটা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক নোটিফিকেশনের স্পষ্ট বিধান থাকবে।
  • ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং এডিবি-এর আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তায়, বাংলাদেশ সরকারকে একটি জাতীয় হেলথ ডেটা অডিট ও মনিটরিং এজেন্সি প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা সকল ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের ডেটা সুরক্ষা প্রটোকল নিয়মিত নিরীক্ষা করবে এবং ডেটা লঙ্ঘনের ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে।
  • সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে (যেমন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়) যৌথভাবে একটি জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্য সাক্ষরতা ও ডেটা সুরক্ষা সচেতনতা কর্মসূচি চালু করতে হবে, যা চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সাধারণ জনগণকে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা ও ঝুঁকি, ডেটা সুরক্ষার গুরুত্ব এবং তাদের অধিকার সম্পর্কে অবহিত করবে, এবং বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC) এর মাধ্যমে চিকিৎসকদের জন্য ডেটা সুরক্ষা সংক্রান্ত বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা

ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: হেলথ-টেক ও টেলিমেডিসিন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Tidak ada komentar yang ditemukan


News Card Generator