বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ

নাবিলা তাবাসসুম  avatar   
নাবিলা তাবাসসুম
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে উৎপাদিত মোট বর্জ্যের প্রায় ৭০% এখনও অপরিশোধিত অবস্থায় পরিবেশের উপর চাপ সৃষ্ট...

সম্প্রতি, পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে উৎপাদিত মোট বর্জ্যের প্রায় ৭০% এখনও অপরিশোধিত অবস্থায় পরিবেশের উপর চাপ সৃষ্টি করছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার লক্ষ্য অর্জনে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিশেষ করে কৃষি বর্জ্য, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ বর্জ্য এবং শহুরে জৈব বর্জ্যকে সার্কুলার ইকোনমির আওতায় আনার ক্ষেত্রে আমরা এখনও প্রাথমিক স্তরেই রয়েছি, যেখানে এই বিশাল সম্পদ অব্যবহৃত থেকে পরিবেশ দূষণ ঘটাচ্ছে। এই চিত্র কেবল উদ্বেগের নয়, বরং আমাদের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কৌশলের মৌলিক দুর্বলতাগুলোকেও প্রকটভাবে সামনে নিয়ে আসে।

বাংলাদেশের বর্তমান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা মূলত 'লিনিয়ার' মডেলের উপর নির্ভরশীল, যেখানে 'গ্রহণ-তৈরি-ফেলে দাও' নীতি অনুসরণ করা হয়। কৃষিক্ষেত্রে, ধান ও গমের খড়, সবজির উচ্ছিষ্ট, পোল্ট্রি ও গবাদি পশুর বর্জ্য বিপুল পরিমাণে উৎপন্ন হলেও এর একটি ক্ষুদ্র অংশই জৈব সার উৎপাদন বা অন্যান্য পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) বিভিন্ন সময়ে কৃষি বর্জ্য থেকে কম্পোস্ট সার তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন করলেও, কৃষক পর্যায়ে এর ব্যাপক প্রচলন ঘটেনি। এর অন্যতম কারণ হলো, সংগ্রহ, পরিবহন ও প্রক্রিয়াকরণের ব্যয় এবং উৎপাদিত সারের বাজারজাতকরণে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও প্রণোদনার অভাব। ফলস্বরূপ, কৃষকরা এই বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলেন বা ফেলে দেন, যা একদিকে যেমন বায়ু দূষণ ঘটায়, অন্যদিকে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিতে ব্যবহৃত হতে পারতো এমন মূল্যবান জৈব উপাদান নষ্ট হয়। এই ব্যর্থতা কেবল আর্থিক ক্ষতি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে মাটির স্বাস্থ্য ও পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

সার্কুলার ইকোনমির ধারণা মূলত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং বর্জ্যকে কাঁচামালে রূপান্তরিত করার উপর জোর দেয়। আমাদের প্রেক্ষাপটে এই রূপান্তরের পথে একটি বড় বাধা হলো সমন্বিত নীতিমালার অভাব। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার মধ্যে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে বিভাজন থাকলেও, একটি একক ও শক্তিশালী সমন্বয়কারী কর্তৃপক্ষ নেই। উদাহরণস্বরূপ, কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) কৃষকদের জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহিত করলেও, বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো এবং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সীমিত ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো শহুরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকলেও, জৈব বর্জ্যকে আলাদা করে সংগ্রহ ও তা থেকে কম্পোস্ট সার উৎপাদনের জন্য পর্যাপ্ত কারিগরি জ্ঞান ও অর্থায়নের ঘাটতি রয়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) বর্জ্য থেকে সার উৎপাদনের উপর গবেষণা পরিচালনা করলেও, এই গবেষণার ফলাফলকে মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণ এবং বাণিজ্যিক উৎপাদনে নিয়ে আসার জন্য কার্যকর লিংকেজ তৈরি হয়নি। এই বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টাগুলো সার্বিকভাবে একটি কার্যকর সার্কুলার ইকোনমি মডেল প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হচ্ছে।

বর্জ্যের প্রকার মোট উৎপাদন (মেট্রিক টন/বছর) পুনর্ব্যবহার/কম্পোস্ট (শতাংশ) পরিবেশে উন্মুক্ত (শতাংশ) উৎস বছর
কৃষি বর্জ্য (খড়, ডালপালা, ফসলের অবশিষ্টাংশ) ৪৫,০০০,০০০ ৩-৫% ৯৫-৯৭% ২০২১
পোল্ট্রি বর্জ্য (বিষ্ঠা) ৩,৫০০,০০০ ১০-১৫% ৮৫-৯০% ২০২১
গবাদি পশুর বর্জ্য (গোবর) ৬৫,০০০,০০০ ২০-২৫% ৭৫-৮০% ২০২১
শহুরে জৈব বর্জ্য (খাদ্য বর্জ্য) ৬,০০০,০০০ ৮-১০% ৯০-৯২% ২০২২

উৎস: পরিবেশ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে 'জাতীয় সার্কুলার ইকোনমি কৌশলপত্র' প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের নেতৃত্ব দিতে হবে, যেখানে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় করে কৃষি বর্জ্য ও শহুরে জৈব বর্জ্য সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাতকরণের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করা হবে। এই কৌশলের আওতায়, বর্জ্য থেকে উৎপাদিত জৈব সারের মান নিয়ন্ত্রণ ও বাজার মূল্য স্থিতিশীল রাখার জন্য DAE এবং BARI-কে গবেষণালব্ধ তথ্য ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করতে হবে।
  • বাংলাদেশ ব্যাংককে 'সবুজ অর্থায়ন (Green Financing)' নীতিমালার আওতায় বর্জ্য থেকে সার উৎপাদনকারী ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ সুবিধা প্রদানের পাশাপাশি, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্রপ্রাপ্ত প্রকল্পগুলোকে বিশেষ প্রণোদনা দিতে হবে। এর ফলে, BRRI ও BARI কর্তৃক উদ্ভাবিত প্রযুক্তিগুলো বাণিজ্যিকীকরণের সুযোগ পাবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণের অবকাঠামো গড়ে উঠবে।
  • স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে 'কমিউনিটি-ভিত্তিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা' মডেল বাস্তবায়নে বাধ্য করতে হবে, যেখানে প্রতিটি ওয়ার্ড বা ইউনিয়ন পর্যায়ে জৈব বর্জ্য আলাদাভাবে সংগ্রহের ব্যবস্থা থাকবে এবং এই বর্জ্যকে স্থানীয় পর্যায়ে কম্পোস্ট প্ল্যান্টে রূপান্তরের জন্য BARC-এর কারিগরি সহায়তায় প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি সরবরাহ করা হবে। বর্জ্য পৃথকীকরণে ব্যর্থ হলে নির্দিষ্ট জরিমানা আরোপের বিধান রেখে স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন/পৌরসভা/ইউনিয়ন পরিষদ) আইন সংশোধন করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাবিলা তাবাসসুম

নাবিলা তাবাসসুম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No se encontraron comentarios


News Card Generator