চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান: অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমশক্তিকে… | আই নিউজ বিডি

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান: অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমশক্তিকে দক্ষ করার চ্যালেঞ্জ

আরিফুর রহমান  avatar   
আরিফুর রহমান
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান: অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমশক্তিকে দক্ষ করার চ্যালেঞ্জ
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান: অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমশক্তিকে দক্ষ করার চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস)-এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দেশের মোট শ্রমশক্তির ৮৫ শতাংশেরও বেশি অপ্রাতিষ্ঠানিক খা...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (বিআইডিএস)-এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দেশের মোট শ্রমশক্তির ৮৫ শতাংশেরও বেশি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত, যা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। যেখানে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির দিকে বিশ্ব দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে, সেখানে এই বিশাল সংখ্যক শ্রমিকের ডিজিটাল ও কারিগরি দক্ষতা অর্জনের অভাব ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। বিশেষত, কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, নির্মাণ এবং সেবা খাতের অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মীরা নতুন প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে না পারলে তাদের জীবিকা মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমশক্তিকে দক্ষ করে তোলা এবং তাদের জন্য একটি টেকসই কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এখন জাতীয় অগ্রাধিকার।

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই), রোবোটিক্স, ইন্টারনেট অফ থিংস (আইওটি), ব্লকচেইন এবং উন্নত ডেটা অ্যানালিটিক্স-এর মতো প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা ও কর্মক্ষেত্রের ধরনকে আমূল পরিবর্তন করছে। প্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেলেও, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবীরা প্রায়শই এই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) তাদের 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি-২০১১' এবং 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন আইন-২০১৮' এর মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়নের একটি কাঠামো প্রতিষ্ঠা করলেও, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের জন্য সুনির্দিষ্ট, সহজে প্রবেশযোগ্য এবং প্রাসঙ্গিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির পরিধি এখনো সীমিত। উদাহরণস্বরূপ, একজন রিকশাচালক বা ছোট কারখানার শ্রমিক যিনি হয়তো স্মার্টফোন ব্যবহার করেন, কিন্তু তার পেশাগত কাজে এআই-ভিত্তিক রুট অপটিমাইজেশন বা সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনার মতো ডিজিটাল দক্ষতা প্রয়োগের সুযোগ বা প্রশিক্ষণ পাননি। এ খাতে কর্মীরা মূলত প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন এবং তাদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রায়শই অনানুষ্ঠানিক পথে বা কাজের ফাঁকে অর্জিত হয়, যা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে, ডিজিটাল বিভাজন ক্রমেই প্রকট হচ্ছে এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা নতুন কর্মসংস্থান বা উন্নত আয়ের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং Skills for Employment Investment Program (SEIP) এর মতো সংস্থাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। SEIP প্রকল্পের অধীনে বিভিন্ন মেয়াদে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হলেও, এর বেশিরভাগ উপকারভোগী প্রাতিষ্ঠানিক বা আধা-প্রাতিষ্ঠানিক খাতের সঙ্গে যুক্ত। অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের জন্য প্রশিক্ষণের সময়সূচি, স্থান এবং বিষয়বস্তু প্রায়শই তাদের কাজের প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হয় না। যেমন, একজন দিনমজুর দিনের বেলায় প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে যেতে পারেন না, অথবা একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তার ব্যবসার ক্ষতি করে দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণে অংশ নিতে আগ্রহী হন না। উপরন্তু, এই খাতের কর্মীদের অনেকেরই আনুষ্ঠানিক শিক্ষার অভাব থাকায়, প্রচলিত প্রশিক্ষণ মডিউলগুলো তাদের জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যুরো অফ এডুকেশনাল ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্স (BANBEIS) এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকের চাহিদা অনুযায়ী কোর্স কারিকুলাম প্রণয়ন এবং প্রশিক্ষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এখনো অনেক কাজ বাকি। ফলে, ডিজিটাল সাক্ষরতা, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা এন্ট্রি, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার এবং রোবোটিক্স ও অটোমেশন দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে এমন মৌলিক কারিগরি দক্ষতার প্রশিক্ষণ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, যা তাদের বর্তমান পেশাকে আপগ্রেড করতে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে সাহায্য করবে।

শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রে, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের জন্য উপযোগী দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি প্রণয়নে আরও সক্রিয় হতে হবে। দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলো, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী কোর্স কারিকুলাম তৈরির ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে পারে। তবে, এই কোর্সগুলো যেন কেবল প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রিধারীদের জন্য না হয়ে, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের জন্য স্বল্পমেয়াদী, মডিউলার এবং স্বীকৃত সনদ প্রদানের মাধ্যমে তাদের পেশাগত মান উন্নত করে, সেদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

খাত মোট শ্রমশক্তিতে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের অংশ (%) (২০২১-২২) চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের সম্ভাব্য প্রভাব দক্ষতা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা
কৃষি ৯৩.৩% স্বয়ংক্রিয় কৃষি পদ্ধতি, ডেটা-ভিত্তিক ফসল ব্যবস্থাপনা, ড্রোন প্রযুক্তি ডিজিটাল কৃষি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ, ডেটা বিশ্লেষণ
নির্মাণ ৯১.৪% বিল্ডিং ইনফরমেশন মডেলিং (BIM), রোবোটিক্স, থ্রিডি প্রিন্টিং ডিজিটাল নির্মাণ নকশা পড়া, স্মার্ট নির্মাণ সরঞ্জাম পরিচালনা, নিরাপত্তা প্রোটোকল
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (MSME) ৮৯.৭% ই-কমার্স, ডিজিটাল মার্কেটিং, এআই-ভিত্তিক উৎপাদন অপটিমাইজেশন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার, ডিজিটাল আর্থিক লেনদেন, সাইবার নিরাপত্তা
পরিবহন ও যোগাযোগ ৮৪.২% স্বয়ংক্রিয় যানবাহন, লজিস্টিকস অপটিমাইজেশন, রাইড শেয়ারিং অ্যাপ স্মার্ট নেভিগেশন সিস্টেম, ডিজিটাল পেমেন্ট, অনলাইন গ্রাহক পরিষেবা
মোট শ্রমশক্তি ৮৫.১% ব্যাপক প্রযুক্তিগত পরিবর্তন সবার জন্য ডিজিটাল ও কারিগরি দক্ষতা

উৎস: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) - শ্রমশক্তি জরিপ ২০২১-২২, বিআইডিএস গবেষণা প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে যৌথভাবে 'অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের জন্য বিশেষায়িত দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি' (Specialized Skill Development Program for Informal Sector - SSDPIS) চালু করতে হবে, যা অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের কাজের সময় ও স্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মডিউলার প্রশিক্ষণ (যেমন: সান্ধ্যকালীন, সাপ্তাহিক ছুটি-ভিত্তিক বা মোবাইল ভ্যান-এর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ) এবং ডিজিটাল সাক্ষরতা, ই-কমার্স ও মৌলিক রোবোটিক্সের মতো চাহিদাভিত্তিক কোর্স প্রদান করবে। এই কর্মসূচির অধীনে প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য সহজ শর্তে ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা করে তাদের প্রশিক্ষণ পরবর্তী সরঞ্জাম ক্রয়ে সহায়তা করতে হবে।
  • Skills for Employment Investment Program (SEIP) এর চতুর্থ পর্বের কার্যক্রমে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের জন্য একটি নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ এবং 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি-২০১১' এর আলোকে তাদের জন্য প্রণীত প্রশিক্ষণ কোর্সগুলোর ব্যবহারিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষত, নির্মাণ, কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসা খাতের কর্মীদের জন্য এআই-ভিত্তিক টুলস (যেমন: স্মার্ট কৃষি অ্যাপ, নির্মাণ সাইট ব্যবস্থাপনার জন্য ডেটা অ্যানালিটিক্স) এবং ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের উপর হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে, যার সনদ জাতীয় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক যোগ্যতা কাঠামো (NTVQF) দ্বারা স্বীকৃত হবে।
  • বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) এবং BANBEIS এর তত্ত্বাবধানে দেশের পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং কারিগরি কলেজগুলোকে 'কমিউনিটি স্কিল হাব' হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এই হাবগুলো স্থানীয় অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের চাহিদা অনুযায়ী স্বল্পমেয়াদী, ব্যবহারিক এবং শিল্প-সংশ্লিষ্ট কোর্স (যেমন: সোলার প্যানেল স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণ, ডিজিটাল কারুশিল্প, স্মার্ট ডিভাইস মেরামত) প্রদান করবে। এই কোর্সগুলোর কারিকুলাম প্রণয়নে স্থানীয় শিল্প ও ব্যবসার প্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে এবং উত্তীর্ণদের জন্য সংশ্লিষ্ট খাতের শিল্পে ইন্টার্নশিপ বা কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য শিল্প-শিক্ষা সংযোগ জোরদার করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: আরিফুর রহমান

আরিফুর রহমান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator