রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দুর্নীতি: অদক্ষতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সিন্ডিকেট | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দুর্নীতি: অদক্ষতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সিন্ডিকেট

অ্যাডভোকেট কায়সার  avatar   
অ্যাডভোকেট কায়সার
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দুর্নীতি: অদক্ষতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সিন্ডিকেট
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দুর্নীতি: অদক্ষতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সিন্ডিকেট
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)-এর একাধিক নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ, বিশেষ করে উচ্চপদস্থ কারিগরি পদে অদক্ষ বা কম যোগ্যতাসম্পন্ন প্...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)-এর একাধিক নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ, বিশেষ করে উচ্চপদস্থ কারিগরি পদে অদক্ষ বা কম যোগ্যতাসম্পন্ন প্রার্থীদের নিয়োগের ঘটনা জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। এর ফলে বোর্ডের সামগ্রিক কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, যা বিদ্যুতের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ সেবার মানকেও প্রভাবিত করছে। এই ঘটনা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মারাত্মক ঘাটতির এক জ্বলন্ত উদাহরণ। এই ধরনের অনিয়ম কেবল মেধা ও যোগ্যতার অবমূল্যায়ন করে না, বরং এটি একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেটের অস্তিত্বের ইঙ্গিত দেয়, যা অদক্ষতাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে গভীর শিকড় গেড়ে বসেছে। এর ফলস্বরূপ, এসব প্রতিষ্ঠান ক্রমাগত লোকসানের বোঝায় নিমজ্জিত হচ্ছে এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করছে, যা World Bank এবং ADB-এর মতো উন্নয়ন সহযোগীদের পক্ষ থেকে বারবার উদ্বেগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ প্রক্রিয়ার গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, এখানে প্রায়শই মেধা ও যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং আর্থিক লেনদেনকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত 'সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯' এবং 'সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮' থাকা সত্ত্বেও, এসব আইনকে পাশ কাটিয়ে নিয়োগ-বাণিজ্য একটি অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি)-এর মতো সংস্থায় চালক ও কারিগর নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এমনকি, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)-এর অধীনস্থ বিভিন্ন সংস্থায়ও উচ্চপদস্থ পদে নিয়োগে অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেটের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়, যেখানে প্রার্থীর দক্ষতা বা অভিজ্ঞতা নয়, বরং 'উপহার' বা 'অংশীদারিত্ব' মুখ্য ভূমিকা পালন করে। এই সিন্ডিকেটগুলো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের শুরু থেকে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে তাদের প্রভাব বিস্তার করে। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, মৌখিক পরীক্ষায় পূর্বনির্ধারিত প্রার্থীকে উচ্চ নম্বর প্রদান, এমনকি চূড়ান্ত মেধা তালিকায় অপেক্ষাকৃত কম যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তিকে অন্তর্ভুক্ত করার মতো ঘটনা নিয়মিত বিরতিতে ঘটে চলেছে। এই ধরনের চর্চা কেবল যোগ্য প্রার্থীদের বঞ্চিত করে না, বরং প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মপরিবেশে হতাশা ও অনাস্থা সৃষ্টি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের উৎপাদনশীলতা এবং সেবার মানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এই অদক্ষতার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সিন্ডিকেটগুলো রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করছে। World Bank-এর ২০১৯ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বার্ষিক লোকসান জিডিপির প্রায় ১.৫%। এই লোকসানের একটি বড় কারণ হলো অদক্ষ জনবল ও অতিরিক্ত কর্মচারী নিয়োগ, যা প্রায়শই নিয়োগ দুর্নীতির মাধ্যমে সংঘটিত হয়। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশন (বিএসএফআইসি)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের পর বছর ধরে লোকসান গুনছে, যার পেছনে অদক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব অন্যতম কারণ। Asian Development Bank (ADB)-এর 'State-Owned Enterprises Reform Program' শীর্ষক কার্যপত্রেও বারবার রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের লোকসান এবং এর পেছনে সুশাসনের অভাবকে দায়ী করা হয়েছে। তারা উল্লেখ করেছে যে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং মেধাভিত্তিক নির্বাচন নিশ্চিত করতে না পারলে এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বনির্ভরতা অর্জন সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, যেমন অর্থ মন্ত্রণালয় এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, এই সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন সময়ে পদক্ষেপ নিলেও, সিন্ডিকেটের শক্তিশালী প্রভাব এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব প্রায়শই এই উদ্যোগগুলোকে ব্যর্থ করে দিচ্ছে। ফলে, এসব প্রতিষ্ঠান জনগণের করের টাকায় পরিচালিত হয়েও জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে, এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

প্রতিষ্ঠানের নাম ২০২২-২৩ অর্থবছরে লোকসান (কোটি টাকা) নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগের সংখ্যা (২০২০-২০২৩) World Bank/ADB প্রতিবেদনে সুশাসনের ঘাটতি উল্লেখ
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ৪৫,৬৯২ ৬ (উচ্চপদস্থ ও কারিগরি) বারংবার (বিদ্যুৎ খাতের দক্ষতা প্রসঙ্গে)
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) ৬,৩৫৩ ৪ (মধ্যম ও উচ্চপদস্থ) ২০২২ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি) ৩২১ ৯ (চালক ও কারিগর) ২০২১ সালের প্রতিবেদনে উল্লেখ
বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প কর্পোরেশন (বিএসএফআইসি) ১,০২৮ ৩ (ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন) ২০২৩ সালের প্রতিবেদনে (পুনর্গঠন প্রসঙ্গে)

উৎস: অর্থ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৩, World Bank ও ADB প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে 'সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮'-এর অধীনে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী মনিটরিং সেল গঠন করা হোক, যা সরাসরি বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কাছে রিপোর্ট করবে এবং নিয়োগ সংক্রান্ত সকল অভিযোগ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করবে।
  • নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় তৃতীয় পক্ষের নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানকে (যেমন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বা পাবলিক সার্ভিস কমিশন) বাধ্যতামূলকভাবে যুক্ত করা এবং 'দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪' অনুযায়ী নিয়োগ দুর্নীতির প্রতিটি ঘটনাকে সুনির্দিষ্টভাবে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।
  • World Bank এবং ADB-এর সুপারিশমালা অনুসরণ করে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (যেমন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়) কর্তৃক প্রণীত 'কর্পোরেট গভর্ন্যান্স কোড' সকল রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলকভাবে প্রয়োগ করা এবং নিয়মিতভাবে এর বাস্তবায়ন নিরীক্ষা করা, যাতে নিয়োগ বোর্ড ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সিন্ডিকেটের প্রভাব সম্পূর্ণরূপে নির্মূল হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: অ্যাডভোকেট কায়সার

অ্যাডভোকেট কায়সার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: করপোরেট গভর্ন্যান্স ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

لم يتم العثور على تعليقات


News Card Generator