কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ

মোশতাক আহমেদ  avatar   
মোশতাক আহমেদ
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) কর্তৃক প্রকাশিত 'বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান-২০২৩' প্রতিবেদনে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় (TVET)...

সম্প্রতি বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) কর্তৃক প্রকাশিত 'বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান-২০২৩' প্রতিবেদনে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় (TVET) তালিকাভুক্তি এবং কৃতকার্যতার একটি চিত্র উঠে এসেছে, যা একদিকে আশাব্যঞ্জক মনে হলেও, অন্যদিকে এই খাতের গুণগত মান এবং কর্মসংস্থানমুখীতার গভীর সংকটকে প্রকট করে তোলে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে, বিশেষ করে ডিপ্লোমা ও সার্টিফিকেট পর্যায়ে। তবে, এই পরিসংখ্যানের আড়ালে রয়ে গেছে এক বিশাল কর্মসংস্থানহীনতার চিত্র এবং শিল্প খাতের চাহিদার সাথে দক্ষতার ফারাক। শিল্প মালিকরা প্রায়শই অভিযোগ করেন যে, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীরা তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহারিক জ্ঞান ও দক্ষতা নিয়ে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারছে না। এই বাস্তবতা কেবল একটি পরিসংখ্যানগত সমস্যা নয়, বরং এটি দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির পথে একটি বড় অন্তরায়। এই কলামে আমরা কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ব্যর্থতার মূল কারণগুলো অনুসন্ধান করব এবং একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ উপস্থাপনের চেষ্টা করব।

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার বর্তমান ব্যর্থতার অন্যতম প্রধান কারণ হলো এর পাঠ্যক্রমের অপ্রাসঙ্গিকতা এবং যুগের সাথে তাল মেলাতে না পারা। বাংলাদেশের কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এর অধীনে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে পাঠ্যক্রম অনুসরণ করা হয়, তার একটি বড় অংশই আধুনিক শিল্প-কারখানা এবং প্রযুক্তির বিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। উদাহরণস্বরূপ, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা অ্যানালাইসিস, সাইবার সিকিউরিটি এবং অ্যাডভান্সড ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের মতো ক্ষেত্রগুলোতে বিশ্বজুড়ে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা বাড়ছে। অথচ আমাদের কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখনও সনাতন পদ্ধতির শিক্ষাদান এবং পুরোনো প্রযুক্তিভিত্তিক কোর্সগুলোকেই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) দক্ষতা উন্নয়নের জাতীয় মান (National Skill Standards) প্রণয়নে কাজ করলেও, এর বাস্তবায়ন এবং নিয়মিত হালনাগাদ প্রক্রিয়ায় ধীরগতি পরিলক্ষিত হয়। ফলে, শিক্ষার্থীরা তত্ত্বীয় জ্ঞানে কিছুটা পারদর্শী হলেও, ব্যবহারিক কর্মক্ষেত্রে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির সাথে পরিচিত হতে পারছে না। অনেক প্রতিষ্ঠানে আধুনিক ল্যাব সরঞ্জামাদির অভাব রয়েছে এবং যা আছে, তারও পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ হয় না। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণও একটি বড় সমস্যা; অনেক শিক্ষকই শিল্প খাতের সর্বশেষ প্রবণতা সম্পর্কে অবগত নন, যার ফলে তারা শিক্ষার্থীদের কার্যকরভাবে প্রস্তুত করতে ব্যর্থ হচ্ছেন।

এই খাতের আরেকটি বড় দুর্বলতা হলো শিল্প-প্রতিষ্ঠানের সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর দুর্বল সমন্বয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর বিভিন্ন সময়ে শিল্প-প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে অংশীদারিত্বের কথা বললেও, বাস্তবে তা খুব কমই ফলপ্রসূ হয়েছে। শিল্প-প্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপের সুযোগ দিতে বা তাদের চাহিদা অনুযায়ী কোর্স ডিজাইন প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে আগ্রহী হয় না, কারণ তারা মনে করে যে, এই বিনিয়োগ থেকে তারা আশানুরূপ ফল পাবে না। অন্যদিকে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোও শিল্প-প্রতিষ্ঠানের সাথে কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন করে তাদের চাহিদা সম্পর্কে জানতে বা তাদের পরামর্শ অনুযায়ী পাঠ্যক্রম পরিবর্তন করতে ব্যর্থ হয়। এর ফলে, একটি বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করা শিক্ষার্থী যখন কর্মজীবনে প্রবেশ করে, তখন সে দেখে যে তার অর্জিত দক্ষতার সাথে নিয়োগকর্তার চাহিদার কোনো মিল নেই। ফলস্বরূপ, পাশ করা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ বেকার থেকে যায় অথবা এমন কাজে নিযুক্ত হয় যা তার কারিগরি শিক্ষার সাথে সম্পর্কিত নয়। এছাড়া, কারিগরি শিক্ষাকে সমাজে এখনও 'দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষা' হিসেবে দেখা হয়, যা শিক্ষার্থীদের এই খাতে আসতে নিরুৎসাহিত করে। এই নেতিবাচক সামাজিক ধারণার কারণে মেধাবী শিক্ষার্থীরা সাধারণত কারিগরি শিক্ষার পরিবর্তে সাধারণ শিক্ষাকেই বেছে নেয়, যা এই খাতের সামগ্রিক মানকে আরও নিচে নামিয়ে দেয়।

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় শিক্ষার্থী তালিকাভুক্তি ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতি (২০১৮-২০২২)
সাল মোট শিক্ষার্থী (লক্ষ) উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরিতে শতাংশ পাশের হার (%) পাশকৃতদের মধ্যে কর্মসংস্থান (%)*
২০১৮ ১২.৫০ ৮.৯ ৭২.৫ ৩৫.২
২০১৯ ১৩.৮০ ৯.৩ ৭৪.৮ ৩৭.৫
২০২০ ১৫.১০ ৯.৮ ৭৬.১ ৩৮.১
২০২১ ১৬.২০ ১০.২ ৭৯.৫ ৪০.২
২০২২ ১৭.৫০ ১১.১ ৮২.৩ ৪০.৫

উৎস: BANBEIS (বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো), কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং NSDA (ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি) এর বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত। *কর্মসংস্থানের হার পাশ করার এক বছরের মধ্যে সংশ্লিষ্ট খাতে চাকরিপ্রাপ্তি নির্দেশ করে।

সুপারিশ

  • ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) কে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর করে তুলতে হবে, যাতে তারা শিল্প-প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সাথে নিয়মিত বৈঠক করে বাজারের চাহিদা নিরূপণ করতে পারে এবং সেই অনুযায়ী ন্যাশনাল স্কিল স্ট্যান্ডার্ডস (NSS) ও কারিকুলাম দ্রুত হালনাগাদ করতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে আইনগত বাধ্যবাধকতার আওতায় আনতে হবে এবং প্রতি দুই বছর অন্তর কারিকুলাম পর্যালোচনার জন্য একটি স্বাধীন কারিগরি কমিটি গঠন করতে হবে, যেখানে শিল্প-বিশেষজ্ঞদের বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে 'কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্প্রসারণ আইন, ২০২২' (যদি থাকে, অন্যথায় একটি নতুন আইন প্রণয়ন করতে হবে) এর অধীনে একটি 'শিল্প-শিক্ষা অংশীদারিত্ব তহবিল' (Industry-Academia Partnership Fund) গঠন করতে হবে। এই তহবিলের মাধ্যমে শিল্প-প্রতিষ্ঠানগুলোকে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আধুনিক যন্ত্রপাতি প্রদানে, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণে এবং শিক্ষার্থীদের ইন্টার্নশিপের সুযোগ দিতে আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) এর মতো কারিগরি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি সমান্তরাল অর্থায়ন ও মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা শুধুমাত্র কারিগরি শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করবে।
  • কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে 'জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০' এর কারিগরি শিক্ষা সংক্রান্ত অনুচ্ছেদগুলো বাস্তবায়নে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে শিক্ষক নিয়োগ, প্রশিক্ষণ এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে শিল্প অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পাশাপাশি, কারিগরি শিক্ষার প্রতি সামাজিক নেতিবাচক ধারণা দূর করতে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যাপক প্রচার অভিযান চালাতে হবে এবং সফল কারিগরি গ্র্যাজুয়েটদের উদাহরণ তুলে ধরে একটি 'ন্যাশনাল স্কিল হিরোস' কর্মসূচি চালু করতে হবে, যা শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করবে এবং এই খাতের প্রতি তাদের আকর্ষণ বাড়াবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মোশতাক আহমেদ

মোশতাক আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator