ডিজিটাল আসক্তি ও যুবমানসিক স্বাস্থ্য: স্ক্রিনের আড়ালে লুকানো উদ্বেগ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ডিজিটাল আসক্তি ও যুবমানসিক স্বাস্থ্য: স্ক্রিনের আড়ালে লুকানো উদ্বেগ

নাসরিন আক্তার  avatar   
নাসরিন আক্তার
ডিজিটাল আসক্তি ও যুবমানসিক স্বাস্থ্য: স্ক্রিনের আড়ালে লুকানো উদ্বেগ
ডিজিটাল আসক্তি ও যুবমানসিক স্বাস্থ্য: স্ক্রিনের আড়ালে লুকানো উদ্বেগ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) ও হাসপাতাল কর্তৃক প্রকাশিত এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র: দেশের ১৫-২৫ বছর বয়সী তরুণদ...

সম্প্রতি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) ও হাসপাতাল কর্তৃক প্রকাশিত এক সমীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক উদ্বেগজনক চিত্র: দেশের ১৫-২৫ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে প্রায় ৩০% কোনো না কোনো মাত্রার ডিজিটাল আসক্তিতে ভুগছে, যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই সমীক্ষা, যা ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের প্রায় ৫০০০ তরুণ-তরুণীর ওপর পরিচালিত হয়েছে, স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে যে স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অত্যধিক ব্যবহার কীভাবে ঘুমের ব্যাঘাত, উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং এমনকি সামাজিক বিচ্ছিন্নতার মতো গুরুতর সমস্যাগুলিকে ত্বরান্বিত করছে। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থ মানসিক বিকাশের পথে এক নীরব প্রতিবন্ধকতা, যা জরুরি ভিত্তিতে জাতীয় নীতি-নির্ধারকদের মনোযোগ আকর্ষণ করছে।

এই ডিজিটাল আসক্তির গভীরতা এবং এর বহুমুখী প্রভাব কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এটি পরিবার ও সমাজের কাঠামোতেও ফাটল ধরাচ্ছে। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম মস্তিষ্কের নিউরাল সার্কিটরিতে পরিবর্তন আনতে পারে, যা মনোযোগের ব্যাঘাত (ADHD-সদৃশ লক্ষণ), সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা হ্রাস এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা সৃষ্টি করে। জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর সাম্প্রতিক এক পিয়ার-রিভিউড জার্নালে প্রকাশিত উপাত্ত অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে উদ্বেগজনিত ব্যাধি (Anxiety Disorders) এবং বিষণ্নতার (Depression) হার প্রায় ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে, যার একটি বড় কারণ হিসেবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কাটানো অতিরিক্ত সময়কে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে মহামারীর সময় অনলাইন ক্লাস এবং বিনোদনমূলক কার্যক্রমের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ায় এই প্রবণতা আরও তীব্র হয়েছে। অভিভাবকরা প্রায়শই বুঝতে পারছেন না যে কখন সাধারণ বিনোদন আসক্তির পর্যায়ে রূপান্তরিত হচ্ছে, এবং এর ফলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে দেরি হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। IEDCR (রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট) এর এক অভ্যন্তরীণ নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইন্টারনেট গেমিং ডিসঅর্ডার (IGD) এখন একটি স্বীকৃত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, এবং এর জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে।

ডিজিটাল আসক্তির এই ক্রমবর্ধমান সংকট মোকাবিলায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় (MOHFW) এবং এর অধীনস্থ সংস্থাগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপ জরুরি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামোতে ডিজিটাল আসক্তিজনিত সমস্যা মোকাবেলায় পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবল ও সুযোগ-সুবিধার অভাব প্রকট। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (DGDA) মতো সংস্থাগুলো যেমন মাদকাসক্তি নিয়ন্ত্রণে কাজ করে, তেমনি ডিজিটাল আসক্তির জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতি ও বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন। অনেক সময় দেখা যায়, তরুণরা তাদের ডিজিটাল আসক্তিকে স্বীকার করতে চায় না বা এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতন নয়। এর ফলে তারা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের কাছে যেতে দ্বিধা বোধ করে। বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয় পর্যায়ে সচেতনতামূলক কর্মসূচির অভাব এবং শিক্ষকদের এই বিষয়ে প্রশিক্ষিত না হওয়াও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উপরন্তু, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো নিজেরাই এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যা ব্যবহারকারীদের দীর্ঘক্ষণ ধরে আটকে রাখতে উৎসাহিত করে, যা আসক্তির প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। এই সমস্যা মোকাবেলায় কেবল চিকিৎসার ওপর জোর দিলেই হবে না, বরং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং একটি সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য পদ্ধতির মাধ্যমে এর মোকাবেলা করতে হবে, যেখানে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোরও একটি নৈতিক দায়বদ্ধতা থাকবে।

বছর তরুণদের মধ্যে ডিজিটাল আসক্তির হার (আনুমানিক) উদ্বেগজনিত ব্যাধিতে আক্রান্তের হার বৃদ্ধি (%) বিষণ্নতায় আক্রান্তের হার বৃদ্ধি (%)
২০১৮ ১৫% ৫% ৬%
২০২০ ২২% ১০% ১২%
২০২২ ২৮% ১৫% ১৮%
২০২৪ (প্রক্ষেপিত) ৩২% ১৮% ২১%

উৎস: NIMH সমীক্ষা প্রতিবেদন (২০২৪), DGHS জনস্বাস্থ্য বুলেটিন (২০২৩) এবং IEDCR অভ্যন্তরীণ ডেটা।

সুপারিশ

  • জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) ও হাসপাতালকে প্রধান কেন্দ্র করে, দেশের প্রতিটি জেলা হাসপাতালে ডিজিটাল আসক্তি নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত 'ডিজিটাল ডিটক্স ইউনিট' প্রতিষ্ঠা করা হোক। এই ইউনিটগুলো DGHS এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে এবং NIMH কর্তৃক নির্ধারিত গাইডলাইন অনুযায়ী সাইকোথেরাপি, কাউন্সেলিং ও প্রয়োজনে ফার্মাকোলজিক্যাল চিকিৎসা প্রদান করবে।
  • স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক একটি 'জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্য ও সুস্থতা নীতি' প্রণয়ন করা হোক, যেখানে স্কুলের পাঠ্যক্রমে ডিজিটাল স্বাক্ষরতা ও সুস্থ ইন্টারনেট ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতামূলক অধ্যায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে। পাশাপাশি, IEDCR এর সহযোগিতায় শিক্ষক ও অভিভাবকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা হবে, যাতে তারা তরুণদের মধ্যে ডিজিটাল আসক্তির লক্ষণ শনাক্ত করতে এবং প্রাথমিক সহায়তা প্রদান করতে সক্ষম হন।
  • DGDA (ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর) এর অনুকরণে একটি 'ডিজিটাল ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ' প্রতিষ্ঠা করা হোক, যা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও অনলাইন গেম নির্মাতাদের জন্য নির্দিষ্ট নৈতিক নির্দেশিকা তৈরি করবে। এই নির্দেশিকায় ব্যবহারকারীদের আসক্তিমুক্ত রাখতে ডিজাইন সংক্রান্ত বাধ্যবাধকতা এবং বয়স-উপযোগী কন্টেন্ট ফিল্টারিংয়ের মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যা MOHFW এর মাধ্যমে আইনগতভাবে কার্যকর করা হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাসরিন আক্তার

নাসরিন আক্তার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মানসিক স্বাস্থ্য ও ওয়েলনেস। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Walang nakitang komento


News Card Generator