বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২: কক্ষপথ নির্বাচন ও ভূ-পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের নতুন চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২: কক্ষপথ নির্বাচন ও ভূ-পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের নতুন চ্যালেঞ্জ

জাহিদ হাসান  avatar   
জাহিদ হাসান
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২: কক্ষপথ নির্বাচন ও ভূ-পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের নতুন চ্যালেঞ্জ
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২: কক্ষপথ নির্বাচন ও ভূ-পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের নতুন চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (BSCL) সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ (BS-2) এর ভবিষ্যৎ কক্ষপথ ও পেলোড নির্বাচন নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করেছে, যা বা...

বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (BSCL) সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ (BS-2) এর ভবিষ্যৎ কক্ষপথ ও পেলোড নির্বাচন নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করেছে, যা বাংলাদেশের মহাকাশ গবেষণা ও ভূ-পর্যবেক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধিতে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ (BS-1) এর সফল উৎক্ষেপণ ও বাণিজ্যিক কার্যকারিতা প্রমাণের পর, দ্বিতীয় স্যাটেলাইটটি দেশের ভূ-পর্যবেক্ষণ, কৃষি, বন, পরিবেশ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং নগর পরিকল্পনায় অত্যাধুনিক স্পেস-টেক অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহারের মাধ্যমে এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছে। প্রথম স্যাটেলাইটটি যেখানে মূলত জিওস্টেশনারি কক্ষপথে যোগাযোগ সেবা প্রদান করছে, সেখানে BS-2 এর জন্য একটি লো আর্থ অরবিট (LEO) বা মিডিয়াম আর্থ অরবিট (MEO) বেছে নেওয়ার সম্ভাব্যতা নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনা চলছে, যা সংগৃহীত ডেটা বিশ্লেষণ এবং তাৎক্ষণিক তথ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ এর কক্ষপথ নির্বাচন একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত যা এর উদ্দেশ্য এবং কার্যকারিতার উপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে। ভূ-পর্যবেক্ষণ বা আর্থ অবজার্ভেশন (EO) স্যাটেলাইটের জন্য LEO কক্ষপথ অত্যন্ত উপযোগী, কারণ এটি পৃথিবীর পৃষ্ঠের কাছাকাছি হওয়ায় উচ্চ রেজোলিউশনের চিত্র ও ডেটা সংগ্রহ করতে পারে। LEO স্যাটেলাইটগুলি সাধারণত ৬০০ থেকে ১০০০ কিলোমিটার উচ্চতায় প্রদক্ষিণ করে এবং প্রতি ৯০-১২০ মিনিটে একবার পৃথিবী প্রদক্ষিণ সম্পন্ন করে। এর ফলে একই অঞ্চলের একাধিকবার ডেটা সংগ্রহের সুযোগ তৈরি হয়, যা কৃষি উৎপাদন পর্যবেক্ষণ, খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা পরিমাপ, এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মূল্যায়নে অপরিহার্য। তবে, LEO স্যাটেলাইটগুলির একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো এর সীমিত কভারেজ; একটি একক স্যাটেলাইট নির্দিষ্ট অঞ্চলে স্বল্প সময়ের জন্য দৃশ্যমান থাকে, ফলে নিরবচ্ছিন্ন পর্যবেক্ষণের জন্য একটি কনস্টেলেশন বা একাধিক স্যাটেলাইটের সমন্বয় প্রয়োজন হতে পারে। অন্যদিকে, MEO কক্ষপথ (২,০০০ থেকে ৩৫,৭৮৬ কিলোমিটার) LEO এবং জিওস্টেশনারি (GEO) এর মাঝামাঝি বৈশিষ্ট্য ধারণ করে, যা LEO এর চেয়ে বিস্তৃত কভারেজ এবং GEO এর চেয়ে কম লেটেন্সি অফার করতে পারে, যদিও এর ডেটা রেজোলিউশন LEO এর মতো অতটা সূক্ষ্ম নাও হতে পারে। স্পেস রিসার্চ অ্যান্ড রিমোট সেন্সিং অর্গানাইজেশন (SPARRSO) এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগকে এই কক্ষপথ নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নয়, বরং ডেটা চাহিদা, বাজেট এবং আন্তর্জাতিক স্পেস রেগুলেশনগুলোকেও বিবেচনা করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, LEO কক্ষপথে স্যাটেলাইট স্থাপনের ক্ষেত্রে ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (ITU) এর ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ এবং অরবিটাল স্লট সংরক্ষণের নিয়মাবলী কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে, যা বিটিআরসি (BTRC) এর মাধ্যমে সম্পাদিত হবে।

ভূ-পর্যবেক্ষণ সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি, ডেটা প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ এবং বিতরণের ক্ষেত্রেও নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হবে। BS-2 থেকে প্রাপ্ত বিপুল পরিমাণ ডেটা প্রক্রিয়াকরণের জন্য অত্যাধুনিক গ্রাউন্ড স্টেশন, ডেটা সেন্টার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ভিত্তিক বিশ্লেষণ প্ল্যাটফর্ম স্থাপন অপরিহার্য। SPARRSO এর বর্তমান অবকাঠামো এবং মানবসম্পদকে এই নতুন ডেটা প্রবাহ পরিচালনার জন্য আপগ্রেড করা প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, স্যাটেলাইট চিত্র থেকে ফসলের স্বাস্থ্য, বনাঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতি, বা দুর্যোগের পূর্বাভাস বিশ্লেষণের জন্য মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম ব্যবহার করা যেতে পারে। এই ডেটা শুধুমাত্র সরকারি সংস্থাগুলোর জন্য নয়, বরং বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় এবং কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশ খাতের উদ্যোক্তাদের জন্যও অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদ হতে পারে। তবে, এই ডেটা ব্যবহারের জন্য একটি সুসংগঠিত নীতি ও ডেটা শেয়ারিং ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করাও জরুরি। বিটিআরসি এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগকে নিশ্চিত করতে হবে যেন ডেটা সুরক্ষা এবং গোপনীয়তার মানদণ্ড বজায় রেখে ডেটা অ্যাক্সেস সহজলভ্য হয়। এছাড়া, স্যাটেলাইট থেকে সংগৃহীত ডেটা ব্যবহারের জন্য দেশীয় বিশেষজ্ঞ তৈরি এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলাও BS-2 এর সাফল্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে, বাংলাদেশের সীমিত সংখ্যক বিশেষজ্ঞ এই ধরনের উচ্চ প্রযুক্তির ডেটা বিশ্লেষণে দক্ষ, তাই মানবসম্পদ উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ প্রয়োজন।

স্যাটেলাইটের নাম উৎক্ষেপণের সাল কক্ষপথের ধরন মূল উদ্দেশ্য প্রত্যাশিত সক্ষমতা (BS-2)
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ (BS-1) ২০১৮ জিওস্টেশনারি (GEO) যোগাযোগ ও সম্প্রচার যোগাযোগ সেবা (টিভি, ইন্টারনেট, টেলিযোগাযোগ)
বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ (BS-2) প্রস্তাবিত (২০২৬-২৭) লো আর্থ অরবিট (LEO) / মিডিয়াম আর্থ অরবিট (MEO) ভূ-পর্যবেক্ষণ, রিমোট সেন্সিং, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কৃষি পর্যবেক্ষণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, নগর পরিকল্পনা, নিরাপত্তা

উৎস: বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (BSCL) এবং ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ প্রকাশিত তথ্য (২০২৩-২০২৪)

সুপারিশ

  • ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং বিটিআরসি-কে ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন (ITU) এর গাইডলাইন মেনে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ এর জন্য LEO বা MEO কক্ষপথের ফ্রিকোয়েন্সি বরাদ্দ এবং অরবিটাল স্লট সংরক্ষণে অবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক মহাকাশ আইন অনুযায়ী বাংলাদেশের অধিকার সুরক্ষিত থাকে।
  • বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড (BSCL) এবং SPARRSO-কে যৌথভাবে একটি জাতীয় স্পেস ডেটা নীতিমালা (National Space Data Policy) প্রণয়ন করতে হবে, যা বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-২ থেকে প্রাপ্ত উচ্চ-রেজোলিউশন ডেটা সংগ্রহ, প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ, সুরক্ষা এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার মধ্যে ডেটা শেয়ারিং এর মানদণ্ড নির্ধারণ করবে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়কে স্পেস-টেক, রিমোট সেন্সিং, জিওইনফরমেটিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ভিত্তিক ডেটা বিশ্লেষণে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির জন্য বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে নতুন কোর্স ও গবেষণা প্রকল্প চালু করতে হবে এবং SPARRSO এর কর্মীদের জন্য আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাহিদ হাসান

জাহিদ হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ও স্পেস-টেক। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nenhum comentário encontrado


News Card Generator