বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাত দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অপরিহার্য। প্রতি বছর এই খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ করা হয়, যা দেশের সামগ্রিক বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। সম্প্রতি, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রতিরক্ষা খাতে ৪২ হাজার ২৯১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ১ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা বেশি। এই ক্রমবর্ধমান বাজেট সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে, এই বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে প্রশ্ন রয়ে গেছে। প্রতিরক্ষা কেনাকাটা ও নিরাপত্তা বাজেটের ওপর পর্যাপ্ত নজরদারির অভাবে দুর্নীতির ঝুঁকি বাড়ছে, যা দেশের নিরাপত্তা কাঠামো এবং জনগণের আস্থার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই)-এর বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাত দুর্নীতির উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। ২০১৫ সালের এক আঞ্চলিক গবেষণায় টিআই এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় ১৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতকে 'ডি' বা উচ্চ ঝুঁকিসম্পন্ন শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত করে। পরবর্তীতে, ২০২১ সালেও ‘গভর্নমেন্ট ডিফেন্স ইন্টিগ্রিটি ইনডেক্স’ (জিডিআই) প্রকাশ করে সংস্থাটি জানায় যে, প্রতিরক্ষা খাতে দুর্নীতি প্রতিরোধে বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা 'অতি দুর্বল'। এই গবেষণায় ৭৭টি নির্দেশকের ভিত্তিতে রাজনৈতিক, আর্থিক, জনবল, পরিচালনা এবং ক্রয়—এই পাঁচটি ঝুঁকির ক্ষেত্র বিশ্লেষণ করা হয়, যেখানে সামরিক ক্রয় এবং আর্থিক ঝুঁকিকে বিশেষত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও বাজেটের অঙ্ক বাড়ছে, স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-২২ সময়কালে বাংলাদেশের অস্ত্র আমদানি আগের পাঁচ বছরের তুলনায় ৪৮ শতাংশ কমেছে। ২০১৯ সালে ৭১ কোটি ৪০ লাখ ডলারের অস্ত্র আমদানি ২০২২ সালে ১৮ কোটি ৪০ লাখ ডলারে নেমে আসে। এর অর্থ হলো, প্রতিরক্ষা বাজেটের একটি বড় অংশ নতুন সমরাস্ত্র ক্রয়ের পরিবর্তে পরিচালন ব্যয় (বেতন, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ) এবং অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিরক্ষা খাতে বেশ কিছু অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। ২০২৩ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ১০ জন সাবেক সামরিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত শুরু করে, যাদের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে এবং ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে সাবেক এনটিএমসি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের নামও উল্লেখযোগ্য, যার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সেনাপ্রধানের সাক্ষ্যগ্রহণে কেনাকাটায় দুর্নীতির বিষয়টি উঠে আসে। এছাড়াও, বিমান বাহিনীর কেনাকাটায় দুর্নীতি ও বিতর্কের খবর প্রকাশিত হয়েছে, যেখানে বড় ধরনের সমরাস্ত্র ক্রয়ে প্রায়শই আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ ওঠে। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে বিভিন্ন দেশের সাথে তড়িঘড়ি করে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের আলোচনাও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ড্রোন কারখানা, জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান, জে-১০সি, ইউরোফাইটার টাইফুন, কোরিয়ান সাবমেরিন, তুরস্কের অ্যাটাক হেলিকপ্টার এবং যুক্তরাষ্ট্রের ব্ল্যাক হক ক্রয়ের সম্ভাব্য চুক্তির বিষয়ে স্বচ্ছ ব্যাখ্যার অভাব রয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন নাকি দীর্ঘমেয়াদি বিতর্কিত বোঝা, তা নিয়ে জনমনে সংশয় তৈরি করেছে।
প্রতিরক্ষা খাতের এই অস্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতার অভাব একটি কাঠামোগত সমস্যা। সামরিক ক্রয়ে একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কাটিয়ে একাধিক দেশ থেকে সরঞ্জাম কেনার কৌশল গ্রহণ করা হলেও, সামগ্রিকভাবে এই প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ বা সংসদীয় তদারকি প্রায় অনুপস্থিত। প্রতিরক্ষা বাজেট নিয়ে জাতীয় সংসদে বা সংসদের বাইরে উল্লেখযোগ্য কোনো আলোচনা হয় না, যা এই খাতের স্বচ্ছতা ও যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। দেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পের দুর্বলতা বাংলাদেশকে বিদেশি অস্ত্রের ওপর অধিক নির্ভরশীল করে তুলেছে, যা কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করে। এই নির্ভরতা এবং অস্বচ্ছ ক্রয় প্রক্রিয়া দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করে এবং দেশের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। একটি শক্তিশালী ও আধুনিক সামরিক বাহিনী গড়ে তোলার জন্য কেবল বাজেট বৃদ্ধিই যথেষ্ট নয়, বরং সেই বাজেটের সঠিক ও স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সুপারিশ: বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য অবিলম্বে একটি কার্যকর ‘প্রতিরক্ষা শুদ্ধাচার কৌশল’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য। সামরিক ক্রয় প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করে তোলা এবং উন্মুক্ত দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করা উচিত। প্রতিরক্ষা বাজেট নিয়ে সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে নিয়মিত ও বিস্তারিত আলোচনা এবং গণমাধ্যমে তথ্য প্রকাশের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, যাতে জনগণ ও সুশীল সমাজ এই খাতের ব্যয় সম্পর্কে অবগত থাকতে পারে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-কে প্রতিরক্ষা খাতের দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে পূর্ণ স্বাধীনতা ও প্রয়োজনীয় সক্ষমতা প্রদান করতে হবে এবং দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়াও, দেশের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলার জন্য গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়িয়ে বিদেশি নির্ভরতা কমানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা উচিত। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের নৈতিকতা ও পেশাদারিত্ব বজায় রাখতে নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং একটি শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যাতে বাহিনীর ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ণ থাকে এবং তারা দেশের শেষ ভরসাস্থল হিসেবে জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারে।