রেল ও নৌ খাতে দুর্নীতির কালো থাবা: রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ও জনভোগান্তি | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

🔎 অনুসন্ধানী বিশেষ প্রতিবেদন

রেল ও নৌ খাতে দুর্নীতির কালো থাবা: রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ও জনভোগান্তি

নুসরাত জাহান  avatar   
নুসরাত জাহান
রেল ও নৌ খাতে দুর্নীতির কালো থাবা: রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ও জনভোগান্তি
রেল ও নৌ খাতে দুর্নীতির কালো থাবা: রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ও জনভোগান্তি
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রেলওয়ে ও নৌ-পরিবহন খাত, যা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের জালে আটকা পড়েছে। রাষ্ট্...

বাংলাদেশের রেলওয়ে ও নৌ-পরিবহন খাত, যা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার দুটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ, সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের জালে আটকা পড়েছে। রাষ্ট্রীয় অর্থ লোপাট, প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি, নিয়োগ বাণিজ্য, টিকিট কালোবাজারি এবং সেবার মান হ্রাসের মতো ঘটনা এই দুটি খাতকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, এই খাতগুলোতে সুদূরপ্রসারী অনিয়ম জেঁকে বসেছে, যার ফলস্বরূপ সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত দুর্ভোগের শিকার হচ্ছে।

বাংলাদেশ রেলওয়েতে দুর্নীতির চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। সম্প্রতি, দুর্নীতি দমন কমিশন রেলওয়ের ১০টি খাতে দুর্নীতির সন্ধান পেয়েছে এবং এ বিষয়ে রেল মন্ত্রণালয়ে ১৫টি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ সম্বলিত একটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে দুর্নীতি দমনে 'জিরো টলারেন্স' নীতি গ্রহণের কথা বলা হয়েছে। তবে, দুর্নীতির গভীরতা এতটাই যে, এর মূল উৎপাটন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উদাহরণস্বরূপ, রাষ্ট্রের ৩৫৮ কোটি টাকা ক্ষতির অভিযোগে বাংলাদেশ রেলওয়ের সাবেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামানসহ ছয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। 'অবাস্তব ও বিকৃত' তথ্য ব্যবহার করে ১২৫টি লাগেজ ভ্যান কেনার সিদ্ধান্তে এই বিপুল অঙ্কের ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ। এছাড়াও, গত দেড় দশকে রেলের অবকাঠামো খাতে প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ উঠেছে, যা রেলের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই প্রকট করে তোলে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান নিজেই স্বীকার করেছেন যে, বাংলাদেশ রেলওয়ে একটি লোকসানি প্রতিষ্ঠান, যার প্রধান কারণ দুর্নীতি ও অপচয়। তার মতে, রেলে ১ টাকা আয় করতে আড়াই টাকা খরচ হয়। ইঞ্জিন ও ট্রেন কেনা, এমনকি করোনাকালে সুরক্ষাসামগ্রী কেনাতেও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। মেগাপ্রজেক্টগুলোতে ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ লোপাটের ঘটনা অহরহ ঘটছে।

নিয়োগ বাণিজ্য রেলওয়ের দুর্নীতির আরেকটি বড় ক্ষেত্র। খালাসি পদে নিয়োগের নামে ৬৫ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে, যেখানে একজন সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তাসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে আটজন প্রার্থীর কাছ থেকে এই অর্থ নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দুদক খতিয়ে দেখছে। এছাড়া, টিকিট কালোবাজারি একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা। জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে অনলাইনে টিকিট কেনার নিয়ম চালু হলেও, অবৈধ উপায়ে, বিশেষ করে কাউন্টার থেকে টিকিট বিক্রি অব্যাহত রয়েছে। রেলমন্ত্রী মো. জিল্লুল হাকিম টিকিট কালোবাজারি চিরতরে বন্ধ করার অঙ্গীকার করলেও, এই চক্রের দৌরাত্ম্য এখনো বিদ্যমান। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ 'টিকিট যার ভ্রমণ তার' নীতি বাস্তবায়নে ২৩টি টাস্কফোর্স গঠন করে অভিযান চালালেও, ৭ দিনের অভিযানে ৬,২৭৮ জন বিনা টিকিটের যাত্রী এবং ১,৮৫৩ জন অন্যের আইডি ব্যবহারকারী যাত্রী শনাক্ত হয়েছে, যাদের কাছ থেকে ১৭ লাখ ২৬ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে। ইজারা ও ঠিকাদারি কার্যক্রমেও ব্যাপক অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়। একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে রেল মন্ত্রণালয় দোকান, পার্কিং ও শৌচাগার ইজারায় 'আনিসুরপ্রীতি'র অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন করেছে। সাবেক রেলমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ ঠিকাদার শাহ আলমের বিরুদ্ধে চুক্তি অনিয়ম, ভুয়া অভিজ্ঞতার সনদ ব্যবহার এবং স্ক্র্যাপ টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও তদন্তাধীন।

নৌ-পরিবহন খাতেও দুর্নীতির চিত্র উদ্বেগজনক। উপকূলীয় এলাকায় সাতটি রেডিও স্টেশন ও বাতিঘর স্থাপন প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর নিজামুল হককে প্রত্যাহার করা হয়েছিল। এই প্রকল্পটি শুরু থেকেই নানা জটিলতা, অনিয়ম ও ব্যয় বৃদ্ধির শিকার হয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর জ্বালানি তেল সরবরাহের ঠিকাদারি কাজে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে দুই কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে, যার একটি ভিডিও প্রকাশ পায়। নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের দুই নৌ প্রকৌশলী ও সার্ভেয়ারের বিরুদ্ধে নৌযান সার্ভে খাত থেকে প্রতিমাসে কমপক্ষে ৬০ লাখ টাকা অবৈধ আয়ের অভিযোগও রয়েছে। শিপিং অ্যান্ড কমিউনিকেশন রিপোর্টার্স ফোরামের (এসসিআরএফ) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নদী খনন ও ড্রেজিংয়ে অনিয়মের কারণে ঢাকা থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলগামী ১০টি নৌপথ বন্ধ হয়ে গেছে। নদী খনন ও পলি অপসারণ খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ থাকলেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবে এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। নৌ-দুর্ঘটনা বৃদ্ধি পাচ্ছে কারণ তদন্ত কমিটির সুপারিশগুলো বাস্তবায়িত হচ্ছে না। গত ছয় মাসে ১০৬টি ছোট-বড় নৌ দুর্ঘটনায় ১৫৩ জন নিহত ও ৮৪ জন আহত হয়েছেন। অদক্ষ ও সনদবিহীন চালক, ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য পরিবহন, তদারকির অভাব এবং চাঁদাবাজিকে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। নৌ পরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন মন্তব্য করেছেন যে, বন্দরে দুর্নীতি গেট থেকেই শুরু হয়। এছাড়া, নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরে সিডিসি (Continuous Discharge Certificate) প্রদানে ১৪ কোটি টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ তদন্তে হাইকোর্ট দুদককে নির্দেশ দিয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ-এর ১১ তলা ভবন নির্মাণেও অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ৬টি জাহাজের বরাদ্দমূল্যে ৪টি জাহাজ কেনার মাধ্যমে প্রায় ৪৮৬ কোটি টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। দুদক প্রাথমিক সত্যতা পেলেও 'অদৃশ্য চাপে' তদন্ত থেমে গেছে বলে জানা যায়।

এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে দুর্নীতির ব্যাপকতা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জনগণের আস্থা নষ্ট করছে। সরকারি অর্থ অপচয় ও লুটপাটের কারণে প্রকল্পগুলো সময়মতো শেষ হচ্ছে না, ব্যয় বাড়ছে এবং সেবার মান নিম্নগামী হচ্ছে। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ কঠিন হবে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করা এখন সময়ের দাবি।

সুপারিশ: রেলওয়ে ও নৌ-পরিবহন খাতে দুর্নীতি দমনের জন্য অবিলম্বে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী মনিটরিং সেল গঠন করা উচিত, যেখানে কারিগরি ও আর্থিক বিশেষজ্ঞ এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। সকল বড় প্রকল্পের ব্যয় ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়মিত জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে এবং অনিয়মের অভিযোগ উঠলে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে ডিজিটাল পদ্ধতি ও কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে এবং টিকিট কালোবাজারি রোধে প্রযুক্তির পূর্ণ ব্যবহার ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিয়মিত অভিযান আরও জোরদার করতে হবে। এছাড়া, নৌ-দুর্ঘটনা রোধে গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন এবং দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তি, সে যেই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় আনতে হবে এবং তার অর্জিত অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।


🔎 অনুসন্ধানে: নুসরাত জাহান

নুসরাত জাহান, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: রেলওয়ে ও নৌ-পরিবহন ওয়াচ

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator