ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি… | আই নিউজ বিডি

ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?

ইমরান খান  avatar   
ইমরান খান
ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
ছবি: সংগৃহীত
২০২১ সালের ই-অরেঞ্জ কেলেঙ্কারির পর গ্রাহকদের প্রায় ১১০০ কোটি টাকা আটকা পড়েছিল, যা আজও পুরোপুরি উদ্ধার হয়নি। এই ঘটনা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা ছিল না...

২০২১ সালের ই-অরেঞ্জ কেলেঙ্কারির পর গ্রাহকদের প্রায় ১১০০ কোটি টাকা আটকা পড়েছিল, যা আজও পুরোপুরি উদ্ধার হয়নি। এই ঘটনা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতারণা ছিল না, বরং বাংলাদেশের উদীয়মান ই-কমার্স এবং এফ-কমার্স খাতের নিয়ন্ত্রক কাঠামোতে গভীর দুর্বলতার এক অশনি সংকেত ছিল। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং এনবিআর-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল ডিজিটাল বাজারের চাহিদা পূরণে ব্যর্থতা এই খাতের প্রতি গ্রাহকের আস্থা ক্ষুণ্ন করেছে। ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা, ২০২০ (সংশোধিত ২০২১) প্রণয়ন সত্ত্বেও, এর বাস্তবায়ন ও তদারকিতে যে শিথিলতা দেখা গেছে, তা অসংখ্য ছোট ও মাঝারি ডিজিটাল উদ্যোক্তার ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অফ বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশের ডিজিটাল কমার্স বাজারের আকার ছিল প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার, যা ২০২৫ সাল নাগাদ ৫০০ কোটি ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে, এই বিশাল সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারেনি দুর্বল নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা। বিশেষ করে, এফ-কমার্স (ফেসবুক কমার্স) খাতের বিকাশ হয়েছে প্রায় সম্পূর্ণ অরক্ষিত অবস্থায়। লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে পণ্য বিক্রি করছেন, কিন্তু তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো নিবন্ধন প্রক্রিয়া বা অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা নেই। এর ফলে, গ্রাহক সুরক্ষা যেমন বিঘ্নিত হচ্ছে, তেমনি সরকারও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। এনবিআর দীর্ঘদিন ধরে এফ-কমার্স থেকে কর আদায়ের কার্যকর পদ্ধতি নিয়ে কাজ করলেও, সেটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনো সম্ভব হয়নি, যার কারণে এই বিশাল বাজার অর্থনীতির মূলধারায় পুরোপুরি যুক্ত হতে পারছে না। অন্যদিকে, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহ বা বিনিয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি রাখলেও, সাধারণ পণ্য ও সেবা লেনদেনের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা সীমিত।

এই দুর্বলতাগুলো কেবল নীতিগত শূন্যতার কারণে নয়, বরং বিদ্যমান কাঠামোগত দুর্বলতার কারণেও। উদাহরণস্বরূপ, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর গ্রাহকদের অভিযোগ নিষ্পত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, ডিজিটাল লেনদেনের জটিলতা ও আন্তঃসীমান্ত লেনদেনের ক্ষেত্রে তাদের ক্ষমতা সীমিত। অনেক সময় একটি ছোট এফ-কমার্স পেজের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করা বা অর্থ ফেরত আনা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ তাদের কোনো আইনি সত্তা বা নিবন্ধিত ঠিকানা থাকে না। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) ডিজিটাল কমার্সের মাধ্যমে রপ্তানি বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখলেও, স্থানীয় পর্যায়ে ডিজিটাল লেনদেনের নিরাপত্তা ও মান নিশ্চিত না হলে আন্তর্জাতিক বাজারে এর বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করা কঠিন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে যে, ডিজিটাল কমার্স খাতের পূর্ণাঙ্গ বিকাশের জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল কমার্স অথরিটি বা রেগুলেটরি বডি অত্যাবশ্যক, যা নীতি প্রণয়ন থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন ও তদারকি পর্যন্ত সব কাজ এককভাবে পরিচালনা করবে। বর্তমান fragmented regulatory landscape এই খাতের জন্য একটি বড় প্রতিবন্ধকতা।

খাত/বিষয় ২০১৯ ২০২০ ২০২১ ২০২২
ই-কমার্স বাজারের আকার (বিলিয়ন USD) ১.৬ ২.০ ২.৫ ৩.০
অনলাইন লেনদেনের মাধ্যমে প্রতারণার অভিযোগ (সংখ্যা) ৮৫০ ১৮৫০ ৩২০০ ৪৫০০
এফ-কমার্স উদ্যোক্তার সংখ্যা (লক্ষ) ১.৫ ২.৫ ৪.০ ৫.৫
ডিজিটাল কমার্স থেকে আদায়কৃত রাজস্ব (কোটি টাকা) ১১০ ১৪৫ ১৯০ ২৩০

উৎস: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ই-ক্যাব, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং এনবিআর-এর বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে সংকলিত।

সুপারিশ

  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে ডিজিটাল কমার্স (সংশোধিত) নীতিমালা, ২০২১-এর আওতায় একটি সমন্বিত 'ডিজিটাল কমার্স রেগুলেটরি অথরিটি' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা ই-কমার্স ও এফ-কমার্স উভয় খাতের নিবন্ধন, তদারকি, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং আইন প্রয়োগের একক দায়িত্ব পালন করবে।
  • এনবিআর-কে দ্রুত 'এফ-কমার্স ট্যাক্সেশন ফ্রেমওয়ার্ক' চূড়ান্ত করে কার্যকর করতে হবে, যেখানে প্রতিটি এফ-কমার্স উদ্যোক্তাকে একটি নির্দিষ্ট থ্রেশহোল্ড অতিক্রম করার পর বাধ্যতামূলকভাবে ট্রেড লাইসেন্স এবং টিআইএন নম্বর গ্রহণ করে নিয়মিত কর পরিশোধের আওতায় আনা হবে।
  • বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসি-কে যৌথভাবে ডিজিটাল পেমেন্ট গেটওয়ে এবং বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য একটি অভিন্ন ও কঠোর 'ফ্রড মনিটরিং অ্যান্ড রিকভারি প্রোটোকল' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যা গ্রাহকের অর্থ সুরক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নিশ্চিত করবে এবং প্রতারণার ক্ষেত্রে দ্রুত আইনি প্রতিকারের পথ সুগম করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ইমরান খান

ইমরান খান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No comments found


News Card Generator