কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ

মোশতাক আহমেদ  avatar   
মোশতাক আহমেদ
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) আয়োজিত এক কর্মশালায় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (TVET) খাতের মানোন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উপর জোর দেওয়...

সম্প্রতি জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) আয়োজিত এক কর্মশালায় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (TVET) খাতের মানোন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে এই গুরুত্বপূর্ণ খাতটি এখনও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হিসেবে TVET-এর ভূমিকা অনস্বীকার্য হলেও, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, অপ্রতুল বিনিয়োগ এবং শিল্প খাতের সঙ্গে সমন্বয়হীনতা এর অগ্রগতিকে বারবার ব্যাহত করছে। উদাহরণস্বরূপ, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির হার গত পাঁচ বছরে কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও, পাশ করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিল্প খাতে সরাসরি কর্মসংস্থানের হার এখনও উদ্বেগজনকভাবে কম। এই পরিস্থিতি কেবল দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নকেই নয়, বরং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যকেও চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।

কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা খাতের ব্যর্থতার মূলে রয়েছে বেশ কয়েকটি জটিল কারণ। প্রথমত, পাঠ্যক্রম আধুনিক শিল্প চাহিদা পূরণে ব্যর্থ। বাংলাদেশের শিল্প খাত, বিশেষ করে পোশাক, চামড়া, ইলেকট্রনিক্স এবং তথ্যপ্রযুক্তি শিল্প দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। কিন্তু কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনস্থ বেশিরভাগ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের পাঠ্যক্রম এখনও সেকেলে এবং শিল্প বিপ্লব ৪.০ এর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অপ্রস্তুত। অনেক প্রতিষ্ঠানে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদির অভাব প্রকট, যার ফলে শিক্ষার্থীরা তত্ত্বীয় জ্ঞান অর্জন করলেও ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে পড়ছে। এর ফলস্বরূপ, শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল খুঁজে না পেয়ে প্রায়শই বিদেশি শ্রমিক নিয়োগে বাধ্য হচ্ছে, যা দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ে ভূমিকা রাখছে। উপরন্তু, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়নে বিনিয়োগের অভাবও একটি বড় সমস্যা। UGC (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন) যেমন উচ্চশিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে, তেমনি কারিগরি শিক্ষার শিক্ষকদের জন্য নিয়মিত ও আধুনিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির অনুপস্থিতি মানসম্মত শিক্ষা প্রদানে বাধা সৃষ্টি করছে।

দ্বিতীয়ত, সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এবং কারিগরি শিক্ষার প্রতি অনাগ্রহ এই খাতের প্রসারে অন্যতম প্রধান অন্তরায়। অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে এখনও প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, কারিগরি শিক্ষা কেবল তারাই গ্রহণ করে যারা প্রথাগত উচ্চশিক্ষা অর্জনে ব্যর্থ। এই মনোভাবের কারণে মেধাবী শিক্ষার্থীরা কারিগরি শিক্ষায় আগ্রহী হচ্ছে না, যা এই খাতের সামগ্রিক মান ও মর্যাদাকে খর্ব করছে। BANBEIS (বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো) এর তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ শিক্ষায় যেখানে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, সেখানে কারিগরি শিক্ষায় উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীর সংখ্যা আনুপাতিক হারে অনেক কম। পাশাপাশি, কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোগত দুর্বলতা, মানহীন কর্মপরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং এর অভাবও এই নেতিবাচক ধারণাকে আরও সুদৃঢ় করছে। ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা শেষ করে কর্মসংস্থানের সঠিক দিকনির্দেশনা পাচ্ছে না, যা বেকারত্বের হার বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং TVET খাতের প্রতি আস্থা কমিয়ে দিচ্ছে।

শিক্ষাবর্ষ কারিগরি শিক্ষায় মোট শিক্ষার্থী (লক্ষ) মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে TVET-এর শতাংশ কর্মসংস্থান প্রাপ্তির হার (টিভিইটি গ্র্যাজুয়েট)
২০১৮-১৯ ১১.৮০ ৭.৮% ৪৫%
২০১৯-২০ ১২.৫০ ৮.১% ৪৭%
২০২০-২১ ১৩.২০ ৮.৫% ৪৬%
২০২১-২২ ১৪.১০ ৯.০% ৪৮%
২০২২-২৩ ১৫.০০ ৯.৫% ৫০%

উৎস: BANBEIS (বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ

সুপারিশ

  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও NSDA-কে যৌথভাবে একটি 'জাতীয় দক্ষতা মান উন্নয়ন কমিটি' গঠন করতে হবে। এই কমিটি প্রতি দুই বছর অন্তর শিল্প খাতের (যেমন – আইটি, পোশাক, ইলেকট্রনিক্স, পর্যটন) প্রতিনিধিদের সঙ্গে পরামর্শ করে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রম আধুনিকায়ন করবে এবং 'জাতীয় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা নীতি ২০২০' এর আলোকে প্রতিটি কোর্সের জন্য সুনির্দিষ্ট 'দক্ষতা মানদণ্ড' (Skill Standards) নির্ধারণ করবে।
  • কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে 'কারিগরি শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট' (TTTI) এর সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে এবং আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সকল পলিটেকনিক ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের শিক্ষকদের জন্য শিল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের একটি বাধ্যতামূলক বার্ষিক কর্মসূচি চালু করতে হবে। এই কর্মসূচিতে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষতা অর্জনের উপর জোর দিতে হবে এবং প্রশিক্ষণের মান মূল্যায়নে NSDA-এর মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে।
  • সরকারকে 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন তহবিল' (National Skill Development Fund) ব্যবহার করে একটি 'বৃত্তি ও প্রণোদনা প্যাকেজ' চালু করতে হবে, যা কারিগরি শিক্ষায় মেধাবী শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করবে এবং পাশকৃত শিক্ষার্থীদের জন্য শিল্প কারখানায় বাধ্যতামূলক 'শিক্ষানবিশ কর্মসূচি' (Apprenticeship Program) নিশ্চিত করবে। এই প্যাকেজে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব তুলে ধরে দেশব্যাপী সচেতনতামূলক প্রচারাভিযান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যেখানে সফল কারিগরি গ্র্যাজুয়েটদের উদাহরণ তুলে ধরা হবে এবং UGC-এর মতো কারিগরি শিক্ষা গ্র্যাজুয়েটদের জন্য উচ্চশিক্ষার পথ সহজ করতে একটি 'ক্রেডিট ট্রান্সফার নীতিমালা' প্রণয়ন করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মোশতাক আহমেদ

মোশতাক আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator