ডেটা ও বাস্তবতা: মানসিক স্বাস্থ্য ও ওয়েলনেস খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ডেটা ও বাস্তবতা: মানসিক স্বাস্থ্য ও ওয়েলনেস খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন

নাসরিন আক্তার  avatar   
নাসরিন আক্তার
ডেটা ও বাস্তবতা: মানসিক স্বাস্থ্য ও ওয়েলনেস খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন
ডেটা ও বাস্তবতা: মানসিক স্বাস্থ্য ও ওয়েলনেস খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) থেকে প্রকাশিত এক প্রাথমিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায...

সম্প্রতি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) থেকে প্রকাশিত এক প্রাথমিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে মানসিক স্বাস্থ্য সেবা গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৩০% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে ভাবনার জন্ম দিয়েছে। এই বৃদ্ধি শুধু সচেতনতার ফল নয়, বরং বিদ্যমান মানসিক স্বাস্থ্য সংকট এবং এর সমাধানে কাঠামোগত দুর্বলতারও ইঙ্গিত বহন করে। বিশেষ করে, কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের মতো সমস্যাগুলো প্রকট আকার ধারণ করেছে, যা আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে, 'ডেটা ও বাস্তবতা: মানসিক স্বাস্থ্য ও ওয়েলনেস খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন' শীর্ষক এই কলামে আমরা বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান চিত্র, চ্যালেঞ্জ এবং সমাধানের পথ নিয়ে আলোকপাত করব।

বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান কাঠামো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যদিও মানসিক স্বাস্থ্য আইন, ২০১৮ প্রণীত হয়েছে, এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনও অনেক দূর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর অধীনে পরিচালিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলছে, কিন্তু বাস্তবে এর প্রয়োগ সীমিত। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, প্রতি ১ লাখ মানুষের জন্য কমপক্ষে ১ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ থাকা উচিত, সেখানে বাংলাদেশে এই অনুপাত অনেক কম। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য সমীক্ষা, ২০১৯-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রায় ১৭.৮% কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন, যাদের মধ্যে মাত্র ১০-১২% চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করেন। এই বিশাল ব্যবধান মানসিক স্বাস্থ্য সেবার সহজলভ্যতা এবং গ্রহণীয়তার অভাবকেই নির্দেশ করে। বিশেষ করে, গ্রামীণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে মানসিক স্বাস্থ্য সেবার পৌঁছানো এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যেখানে সচেতনতার অভাব এবং সামাজিক কুসংস্কার প্রবল।

মানসিক স্বাস্থ্য খাতে আর্থিক বরাদ্দ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নেও সুস্পষ্ট ঘাটতি পরিলক্ষিত হয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এর মোট বাজেটের মাত্র ০.৫% এরও কম মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ করা হয়, যা বৈশ্বিক গড় ২%-এর চেয়ে অনেক নিচে। এই অপ্রতুল বরাদ্দ মানসিক স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি এবং গবেষণা কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করছে। রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR) যদিও বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ে কাজ করে, মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে তাদের গবেষণার পরিধি এখনও সম্প্রসারিত হয়নি। উপরন্তু, ফার্মাসিউটিক্যালস খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) মানসিক রোগের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধের সহজলভ্যতা ও মান নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, অনেক সময় প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রয়োজনীয় ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ, আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির সাথে পরিচিতি এবং তাদের কর্মপরিবেশ উন্নয়নেও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের অভাব রয়েছে, যা এই খাতের সামগ্রিক গুণগত মানকে প্রভাবিত করছে।

সূচক ২০১৮ ২০২১ ২০২৩
মানসিক স্বাস্থ্য বাজেটের শতাংশ (মোট স্বাস্থ্য বাজেট থেকে) ০.৩৫% ০.৪০% ০.৪৫%
প্রতি ১ লাখ জনসংখ্যায় মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা ০.১৩ ০.১৫ ০.১৭
NIMH-এ ভর্তি রোগীর সংখ্যা (বার্ষিক) ১০,৪০০ ১৩,২০০ ১৪,৮৫০
মোট মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে সেবাপ্রাপ্তির হার ১০% ১১.৫% ১২.৩%

উৎস: স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন ও অভ্যন্তরীণ সমীক্ষা।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কে অবিলম্বে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য আইন, ২০১৮ এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে মানসিক স্বাস্থ্য সেবাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পর্যায় পর্যন্ত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং প্রশিক্ষিত কাউন্সিলর নিয়োগের বাধ্যবাধকতা থাকবে।
  • স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) কে মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে, যা মোট স্বাস্থ্য বাজেটের কমপক্ষে ১.৫% এ উন্নীত করা উচিত। এই বর্ধিত বরাদ্দ NIMH-এর সক্ষমতা বৃদ্ধি, IEDCR-এর মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য গবেষণার পরিধি সম্প্রসারণ এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানসিক স্বাস্থ্য ক্যাম্প আয়োজনের জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে।
  • ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) কে মানসিক রোগের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় জীবন রক্ষাকারী ওষুধের (যেমন – অ্যান্টিসাইকোটিক, অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট) পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং এর মূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখতে একটি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে, বিশেষ করে গ্রামীণ এবং দুর্গম অঞ্চলের স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ চেইন শক্তিশালী করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাসরিন আক্তার

নাসরিন আক্তার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মানসিক স্বাস্থ্য ও ওয়েলনেস। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No comments found


News Card Generator