আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থার 'সবুজ' অর্থায়ন: জলবায়ু সুবিচারের আড়ালে নতুন ফাঁদ? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থার 'সবুজ' অর্থায়ন: জলবায়ু সুবিচারের আড়ালে নতুন ফাঁদ?

মাহফুজার রহমান  avatar   
মাহফুজার রহমান
আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থার 'সবুজ' অর্থায়ন: জলবায়ু সুবিচারের আড়ালে নতুন ফাঁদ?
আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থার 'সবুজ' অর্থায়ন: জলবায়ু সুবিচারের আড়ালে নতুন ফাঁদ?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে, বিশেষ করে জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোকে, প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলারের 'সবুজ অর্থায়ন' বা গ্...

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক ২০২৩-২৪ অর্থবছরের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে, বিশেষ করে জলবায়ু ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোকে, প্রায় ১৭ বিলিয়ন ডলারের 'সবুজ অর্থায়ন' বা গ্রিন ফাইন্যান্সিং প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো এবং অভিযোজন কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ। এই অর্থায়ন প্যাকেজকে আপাতদৃষ্টিতে জলবায়ু সুবিচারের প্রতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অঙ্গীকার হিসেবে দেখা হলেও, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক হিসেবে আমাদের গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন যে, এই 'সবুজ' মোড়কে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন কোনো ঋণের ফাঁদ তৈরি হচ্ছে কিনা। বিশেষ করে যখন দেখা যাচ্ছে যে, অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশ তাদের বর্ধিত ঋণ পরিশোধের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন এই নতুন ঋণ প্রবাহের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থাগুলোর 'সবুজ' প্রকল্পগুলোর স্বচ্ছতা এবং কার্যকারিতা নিয়ে প্রায়শই প্রশ্ন ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, এই অর্থায়ন এমনসব প্রকল্পে ব্যয় হয় যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রকৃত চাহিদা পূরণ করে না, বরং আন্তর্জাতিক পরামর্শক সংস্থাগুলোর সুপারিশকৃত ব্যয়বহুল এবং প্রযুক্তি-নির্ভর সমাধানের দিকে ঠেলে দেয়, যা শেষ পর্যন্ত দেশীয় সক্ষমতা বাড়ানোর পরিবর্তে বিদেশি নির্ভরতা বৃদ্ধি করে। উদাহরণস্বরূপ, বৃহৎ আকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পগুলোর জন্য যে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়, তাতে অনেক সময় স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে না, ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারী এবং প্রযুক্তি সরবরাহকারীরাই লাভবান হয়। এর ফলে, একদিকে যেমন বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় বাড়ে, তেমনি অন্যদিকে প্রকল্পের আয় থেকে ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ আরও তীব্র হয়। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য বিশেষ উদ্বেগের, যেখানে বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ক্রমেই বাড়ছে এবং এর একটি বড় অংশই অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহৃত হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো, যাদের কার্বন নিঃসরণে অবদান নগণ্য, তাদের জন্য জলবায়ু অর্থায়ন একটি অপরিহার্য প্রয়োজন। কিন্তু এই অর্থায়নকে যদি উচ্চ সুদের ঋণ হিসেবে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে তা জলবায়ু সুবিচারের মূল ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। অনেক সময়, এই 'সবুজ' ঋণের সঙ্গে এমন সব শর্ত জুড়ে দেওয়া হয় যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর সার্বভৌম নীতি নির্ধারণের ক্ষমতাকে সীমিত করে। যেমন, পরিবেশগত সুরক্ষা বা সামাজিক প্রভাব মূল্যায়নের নামে এমন সব কঠোর আন্তর্জাতিক মান চাপানো হয় যা স্থানীয় প্রেক্ষাপটে বাস্তবায়ন করা কঠিন এবং ব্যয়বহুল। এর ফলে, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় বেড়ে যায়, খরচ বৃদ্ধি পায় এবং শেষ পর্যন্ত ঋণের বোঝা আরও বেড়ে যায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এই ধরনের শর্তগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণে জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে 'সবুজ' অর্থায়ন কোনোভাবেই দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি না হয়। BIMSTEC এর মতো আঞ্চলিক জোটগুলোর মাধ্যমে সদস্য দেশগুলো এই বিষয়ে একটি সম্মিলিত অবস্থান নিতে পারে, যা আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থাগুলোর উপর চাপ সৃষ্টি করতে সহায়ক হবে।

আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থা ২০২২-২৩ অর্থবছরে 'সবুজ' অর্থায়ন প্রতিশ্রুতি (বিলিয়ন USD) ঐ অর্থবছরে পরিশোধিত ঋণের পরিমাণ (বিলিয়ন USD) প্রধান শর্তাদি
বিশ্বব্যাংক (IBRD + IDA) ৯.৮ ৪.৫ পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন, সামাজিক সুরক্ষা নীতি, আন্তর্জাতিক দরপত্র
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) ৫.২ ২.১ কার্বন নিঃসরণ হ্রাস লক্ষ্যমাত্রা, প্রযুক্তিগত সহায়তা, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) ১.৫ (জলবায়ু সহনশীলতা ও টেকসই ট্রাস্ট) ০.৩ সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, রাজস্ব সংস্কার, জ্বালানি মূল্য নির্ধারণ

উৎস: বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল এর বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২৩-২৪ এর প্রাক্কলনসহ)

সুপারিশ

  • পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থাগুলোর সাথে 'সবুজ' অর্থায়নের শর্তাবলী নিয়ে আলোচনার সময় একটি সুনির্দিষ্ট 'জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা নির্দেশিকা' অনুসরণ করতে হবে, যাতে ঋণের বোঝা ও শর্তাবলী দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বে আঘাত না হানে এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়।
  • BIMSTEC এবং সার্ক-এর মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর প্ল্যাটফর্মে সদস্য দেশগুলোকে একত্রিত হয়ে আন্তর্জাতিক ঋণ সংস্থাগুলোর কাছে 'সবুজ' অর্থায়নের শর্তাবলী সহজীকরণ এবং অনুদান-ভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়নের পরিমাণ বৃদ্ধির জন্য একটি সম্মিলিত প্রস্তাব পেশ করতে হবে, বিশেষত UN Peacekeeping-এর মতো আন্তর্জাতিক ফোরামে জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ন্যায্য দাবি তুলে ধরার জন্য।
  • সরকারকে একটি 'জাতীয় সবুজ অর্থায়ন পর্যবেক্ষণ কমিটি' গঠন করতে হবে, যেখানে অর্থনীতিবিদ, পরিবেশবিদ, এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা থাকবেন। এই কমিটি আন্তর্জাতিক 'সবুজ' প্রকল্পগুলোর স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং স্থানীয় অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়মিত মূল্যায়ন করে একটি 'জনসাধারণের প্রতিবেদন' প্রকাশ করবে, যা জলবায়ু অর্থায়নের প্রকৃত সুফল ও ঝুঁকি সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মাহফুজার রহমান

মাহফুজার রহমান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: আন্তর্জাতিক সাহায্য ও ঋণ সংস্থা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No comments found


News Card Generator