মানব পাচার প্রতিরোধে আইনের ফাঁকফোকর: রিক্রুটিং এজেন্সির দায়বদ্ধতা ও ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মানব পাচার প্রতিরোধে আইনের ফাঁকফোকর: রিক্রুটিং এজেন্সির দায়বদ্ধতা ও ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার

রেজাউল করিম শিকদার  avatar   
রেজাউল করিম শিকদার
মানব পাচার প্রতিরোধে আইনের ফাঁকফোকর: রিক্রুটিং এজেন্সির দায়বদ্ধতা ও ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার
মানব পাচার প্রতিরোধে আইনের ফাঁকফোকর: রিক্রুটিং এজেন্সির দায়বদ্ধতা ও ভুক্তভোগীর ন্যায়বিচার
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, লিবিয়ায় মানব পাচারের শিকার হয়ে ২৬ জন বাংলাদেশি হত্যার ঘটনা এবং পরবর্তীতে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার সীমান্তে গণকবর আবিষ্কারের মতো মর্মান্তিক ঘটনা...

সম্প্রতি, লিবিয়ায় মানব পাচারের শিকার হয়ে ২৬ জন বাংলাদেশি হত্যার ঘটনা এবং পরবর্তীতে থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার সীমান্তে গণকবর আবিষ্কারের মতো মর্মান্তিক ঘটনাগুলো বাংলাদেশের মানব পাচার প্রতিরোধের আইনি কাঠামোর গভীর ত্রুটিগুলো আবারো স্পষ্ট করে তুলেছে। এসব ঘটনা কেবল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ণ করেনি, বরং দেশের অভ্যন্তরে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর অনিয়ন্ত্রিত কার্যক্রম এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতাকেও প্রকটভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশ সরকারের মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ (সংশোধিত ২০২৩) থাকা সত্ত্বেও, পাচারকারীরা এবং তাদের সহযোগী রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে নির্বিঘ্নে তাদের অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে অসংখ্য ভুক্তভোগী ন্যায্য বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

মানব পাচারের এই ভয়াবহ চক্রের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে প্রায়শই দেখা যায় কিছু অসাধু রিক্রুটিং এজেন্সিকে, যারা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাদের উন্নত জীবনের স্বপ্নকে পুঁজি করে। আইন অনুযায়ী, রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে কর্মী পাঠানোর কথা থাকলেও, বাস্তবে বহু এজেন্সি জালিয়াতি, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি এবং উচ্চ ফি আদায়ের মাধ্যমে মানুষকে অবৈধ পথে পাচার করে। বাংলাদেশ সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে ব্যুরো অফ ম্যানপাওয়ার, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিং (বিএমইটি) লাইসেন্স প্রদান ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্বে থাকলেও, লাইসেন্সপ্রাপ্ত এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগের সংখ্যা এবং সেগুলোর নিষ্পত্তির হার হতাশাজনক। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অভিযুক্ত এজেন্সির বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ নেওয়ার বদলে কেবল সাময়িক স্থগিতাদেশ অথবা নামমাত্র জরিমানা করেই ছেড়ে দেওয়া হয়, যা তাদের অপরাধমূলক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করে। এই দুর্বল নিয়ন্ত্রণের কারণেই মানব পাচারকারীরা বিভিন্ন উপায়ে রিক্রুটিং এজেন্সির আড়ালে তাদের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে, এবং অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয়, যা প্রায়শই তাদের পরিবারকে ঋণের জালে জড়িয়ে ফেলে।

আইনের ফাঁকফোকর এবং প্রয়োগের দুর্বলতা ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে অন্যতম প্রধান অন্তরায়। মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২-এর অধীনে মামলা দায়ের, তদন্ত এবং বিচার প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতি সম্পন্ন। অনেক সময় পাচারের শিকার ব্যক্তিরা দেশে ফিরে আসার পর সামাজিক লাঞ্ছনা, অর্থনৈতিক চাপ এবং আইনি প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতার কারণে মামলা করতে আগ্রহ হারান। এছাড়া, আন্তর্জাতিক মানব পাচার চক্রের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ সংগ্রহ করা একটি জটিল প্রক্রিয়া। পুলিশ, র্যাব এবং বিচার বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও এক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা। ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসন এবং ক্ষতিপূরণের বিধান আইনে থাকলেও, বাস্তবে এর বাস্তবায়ন খুবই নগণ্য। World Bank এর এক গবেষণা অনুযায়ী, মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র ২-৩% ক্ষতিপূরণ পেয়ে থাকেন। আইনি সহায়তা এবং মনোসামাজিক সমর্থনের অভাবে অনেক ভুক্তভোগী পুনরায় পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ার ঝুঁকিতে থাকেন, যা পুরো বিচার ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। এই পরিস্থিতি মানব পাচারকারীদের মধ্যে একটি বার্তা পাঠায় যে, তাদের অপরাধের জন্য খুব কমই জবাবদিহি করতে হয়, যা তাদের আরও বেপরোয়া করে তোলে।

এই জটিলতাগুলো আরও বাড়িয়ে তোলে তথ্যের অভাব এবং সচেতনতার অভাব। অনেক অভিবাসনপ্রত্যাশী বৈধ ও অবৈধ পথের পার্থক্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নন। দালালদের লোভনীয় প্রস্তাব এবং দ্রুত বিদেশ যাওয়ার প্রলোভনে পড়ে তারা সহজেই পাচারকারীদের ফাঁদে পা দেন। স্থানীয় পর্যায়ে মানব পাচার প্রতিরোধ কমিটিগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তারা প্রায়শই প্রয়োজনীয় সম্পদ, প্রশিক্ষণ এবং ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত থাকে, যা তাদের কার্যকরভাবে কাজ করতে বাধা দেয়। ফলস্বরূপ, পাচারের প্রাথমিক ধাপেই অপরাধীদের চিহ্নিত করা এবং ভুক্তভোগীদের রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া, আন্তঃদেশীয় পাচার চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও কিছু চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান, যা অপরাধীদের সীমান্ত পেরিয়ে কার্যক্রম চালাতে সহায়তা করে।

সূচক ২০১৯ ২০২০ ২০২১ ২০২২
মানব পাচার সংক্রান্ত মামলা ৩৩০ ২৮৫ ৩৫০ ৩২০
পাচারকৃত ভুক্তভোগী উদ্ধার ৮৫০ ৭২০ ৯০০ ৮৮০
আসামি গ্রেপ্তার ৪২০ ৩৬০ ৪৩০ ৪০০
মোট সাজা প্রাপ্তির হার ২.৫% ৩.০% ৩.৫% ৪.০%
রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে অভিযোগ ১৮০ ১৬০ ২০০ ২২০

উৎস: বাংলাদেশ পুলিশের মানব পাচার প্রতিরোধ ইউনিট, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়; বিএমইটি (২০২৩ সালের মে পর্যন্ত সংকলিত)

সুপারিশ

  • মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ (সংশোধিত ২০২৩)-এর অধীনে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর দায়বদ্ধতা সুনির্দিষ্ট করে একটি পৃথক বিধিমালা প্রণয়ন করা। এই বিধিমালায় প্রতিটি এজেন্সির লাইসেন্স নবায়নের সময় তাদের পূর্ববর্তী রেকর্ড, অভিযোগের সংখ্যা এবং নিষ্পত্তির হার কঠোরভাবে যাচাই করার বিধান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং বিএমইটি-কে এই বিধিমালা প্রণয়ন ও কার্যকর করার ক্ষমতা দেওয়া উচিত।
  • মানব পাচার সংক্রান্ত মামলার তদন্ত, প্রসিকিউশন এবং বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা। এই ট্রাইব্যুনালকে পর্যাপ্ত জনবল, ফরেনসিক সাপোর্ট এবং আন্তর্জাতিক তদন্তে অংশগ্রহণের ক্ষমতা প্রদান করা উচিত, যাতে ৬ মাসের মধ্যে মামলার রায় প্রদান বাধ্যতামূলক করা যায়।
  • World Bank এবং ADB-এর সহায়তায় ভুক্তভোগীদের জন্য একটি কেন্দ্রীয় পুনর্বাসন তহবিল গঠন করা এবং বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক 'মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন বিধিমালা, ২০১৭'-এর অধীনে ক্ষতিপূরণের বিধান কার্যকর করা। এই তহবিলের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা, মনোসামাজিক কাউন্সেলিং, আর্থিক সহায়তা এবং দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ প্রদান নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা সমাজে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রেজাউল করিম শিকদার

রেজাউল করিম শিকদার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator