ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি… | আই নিউজ বিডি

ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?

ইমরান খান  avatar   
ইমরান খান
ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
ছবি: সংগৃহীত
২০২১ সালের ইভ্যালিকাণ্ডের পর থেকে ই-কমার্স খাতে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা আজও পুরোপুরি কাটেনি। সম্প্রতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত ডিজিটাল কমার্স ...

২০২১ সালের ইভ্যালিকাণ্ডের পর থেকে ই-কমার্স খাতে যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা আজও পুরোপুরি কাটেনি। সম্প্রতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত ডিজিটাল কমার্স সেলের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত তিন বছরে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোতে ভোক্তা অভিযোগের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, যা ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা-২০২০ (সংশোধিত-২০২১) এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ এর কার্যকর প্রয়োগ নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে, অগ্রিম পরিশোধিত অর্থ ফেরত না পাওয়া, নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ না করা এবং পণ্যের গুণগত মান নিয়ে প্রতারণার ঘটনাগুলো এখনও নিয়মিত সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে, যা এই খাতের ভবিষ্যত সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

ই-কমার্স ও এফ-কমার্স খাতের এই অস্থিরতা কেবল ভোক্তা প্রতারণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশের অর্থনীতির জন্য এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, এই খাতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল তদারকি এবং আইন প্রয়োগের অভাবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা (SMEs) চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন। অনেক ক্ষেত্রে, বড় প্ল্যাটফর্মগুলো ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের অর্থ আটকে রাখছে বা তাদের পাওনা পরিশোধে দীর্ঘসূত্রিতা করছে, যা তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) ই-কমার্স থেকে রাজস্ব আদায় বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও, অনানুষ্ঠানিক এফ-কমার্স সেক্টর, যা ফেসবুক বা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে পরিচালিত হয়, সেখানে কর ফাঁকি এবং পণ্য আমদানি সংক্রান্ত জটিলতা এখনও প্রকট। বিশেষ করে, সীমান্ত পারাপার হওয়া পণ্যের শুল্কায়ন এবং ভ্যাট আদায়ে এনবিআর-এর বিদ্যমান কাঠামোতে যথেষ্ট দুর্বলতা রয়েছে, যা দেশীয় উৎপাদনকারীদের জন্য অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি করছে। ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (e-CAB) এর তথ্যমতে, প্রায় ১৫ লক্ষ এফ-কমার্স উদ্যোক্তা রয়েছেন, যাদের একটি বড় অংশই কোনো রকম ট্রেড লাইসেন্স বা ভ্যাট নিবন্ধনের আওতায় নেই, যা সরকারের রাজস্ব আয়কে বিপুল পরিমাণ ক্ষতি করছে এবং একটি অস্বচ্ছ বাজার তৈরি করছে।

ডিজিটাল রিটেইল খাতের এই অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি এবং কাঠামোগত দুর্বলতা পুঁজি বাজারের স্থিতিশীলতাতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে সংঘটিত অর্থপাচার এবং অবৈধ আর্থিক লেনদেন প্রতিরোধে এখনও কার্যকর কোনো পদ্ধতি তৈরি করতে পারেনি। অনেক ই-কমার্স কোম্পানি তাদের পুঁজি সংগ্রহের জন্য বিদেশি বিনিয়োগের দিকে ঝুঁকলেও, স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে, কারণ তাদের আর্থিক স্বচ্ছতা এবং কর্পোরেট সুশাসন নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে দেশের পণ্য বিদেশে রপ্তানি বৃদ্ধির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে, তা অর্জনেও এই আস্থার সংকট বাধা সৃষ্টি করছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা যখন দেশীয় ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোর দুর্বল নিয়ন্ত্রণ এবং ভোক্তা অসন্তোষের খবর পান, তখন তারা বাংলাদেশের ডিজিটাল বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। এর ফলে, দেশের রপ্তানি আয় বাড়ানোর একটি বিশাল সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ই-কমার্স বাজার ১০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে, কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এই প্রবৃদ্ধি অর্জনের সম্ভাবনা ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে আসছে।

বছর মোট ই-কমার্স লেনদেন (বিলিয়ন টাকা) ভোক্তা অভিযোগের সংখ্যা (বাণিজ্য মন্ত্রণালয়) এফ-কমার্স উদ্যোক্তা (অনুমানিত) ই-কমার্স থেকে NBR রাজস্ব আদায় (কোটি টাকা)
২০২০ ২০.০ ১২,৫০০ ৫,০০,০০০ ১৫০
২০২১ ৩২.৫ ৪০,০০০ ৭,৫০,০০০ ৩০০
২০২২ ৪৫.০ ৬২,২০০ ১০,০০,০০০ ৪৫০
২০২৩ ৬৮.০ ৮৮,৫০০ ১৫,০০,০০০ ৬৫০

উৎস: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, NBR, e-CAB, CPD

সুপারিশ

  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে ডিজিটাল কমার্স নীতিমালা-২০২০ (সংশোধিত-২০২১) এর অধীনে একটি 'ডিজিটাল এস্ক্রো সার্ভিস' বাধ্যতামূলক করতে হবে, যেখানে ভোক্তা কর্তৃক অগ্রিম পরিশোধিত অর্থ পণ্য সরবরাহ ও মান যাচাই নিশ্চিত হওয়ার পরই বিক্রেতাকে প্রদান করা হবে, যা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করবে।
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) কে এফ-কমার্স খাতের জন্য একটি সরলীকৃত ও ডিজিটাল নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালু করতে হবে এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত ভ্যাট ও কর ছাড়ের ব্যবস্থা করতে হবে, যা তাদের আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্ত হতে উৎসাহিত করবে এবং একইসাথে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পাবে।
  • বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এর উচিত ই-কমার্স এবং ডিজিটাল রিটেইল কোম্পানিগুলোর জন্য কর্পোরেট সুশাসন ও আর্থিক স্বচ্ছতা সংক্রান্ত কঠোর নির্দেশিকা প্রণয়ন করা, এবং নিয়মিত নিরীক্ষার মাধ্যমে তা তদারকি করা, যাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি পায় এবং পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ইমরান খান

ইমরান খান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nenhum comentário encontrado


News Card Generator