ডিজিটাল ঋণদান: ফিনটেকের নতুন দিগন্ত নাকি ঝুঁকি বৃদ্ধির হাতছানি? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ডিজিটাল ঋণদান: ফিনটেকের নতুন দিগন্ত নাকি ঝুঁকি বৃদ্ধির হাতছানি?

সামিয়া জামান  avatar   
সামিয়া জামান
ডিজিটাল ঋণদান: ফিনটেকের নতুন দিগন্ত নাকি ঝুঁকি বৃদ্ধির হাতছানি?
ডিজিটাল ঋণদান: ফিনটেকের নতুন দিগন্ত নাকি ঝুঁকি বৃদ্ধির হাতছানি?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিনটেক নির্দেশিকা প্রণয়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে আসার খবরটি ডিজিটাল ঋণদান খাতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষত, যখন দেখা যাচ্ছে...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিনটেক নির্দেশিকা প্রণয়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে আসার খবরটি ডিজিটাল ঋণদান খাতে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষত, যখন দেখা যাচ্ছে যে বিভিন্ন ফিনটেক প্রতিষ্ঠান এবং মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (MFS) প্রদানকারীরা ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি-নির্ভর সমাধান নিয়ে দ্রুত এগিয়ে আসছে, তখন এই নির্দেশিকা যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে। তবে, এই দ্রুত প্রসারের সাথে সাথে অনিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল ঋণ অ্যাপগুলোর মাধ্যমে গ্রাহক হয়রানি, উচ্চ সুদের হার এবং ডেটা সুরক্ষার মতো গুরুতর ঝুঁকিগুলোও সামনে চলে আসছে। গত অর্থ বছরে, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) অবৈধ ঋণদানকারী অ্যাপের বিরুদ্ধে শতাধিক অভিযোগ পেয়েছে, যা এই খাতের নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট করে তোলে। এই পরিস্থিতি একদিকে যেমন ফিনটেকের অপার সম্ভাবনাকে তুলে ধরে, অন্যদিকে তেমনি এর অন্তর্নিহিত ঝুঁকিগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার এক কঠিন চ্যালেঞ্জও তৈরি করে।

ডিজিটাল ঋণদান ব্যবস্থা, বিশেষ করে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) এবং মেশিন লার্নিং (ML) ব্যবহার করে গ্রাহকের লেনদেন ডেটা, মোবাইল ব্যবহারের ধরণ এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণ করে ঋণযোগ্যতা মূল্যায়নের মাধ্যমে, ঐতিহ্যবাহী ব্যাংক ব্যবস্থার বাইরে থাকা বিশাল এক জনগোষ্ঠীকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় নিয়ে আসার সুযোগ তৈরি করেছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশের আইসিটি ডিভিশনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত 'a2i' (এটুআই) বিভিন্ন ফিনটেক উদ্যোগের সাথে কাজ করছে, যেখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে সহজে ডিজিটাল ঋণ পৌঁছানোর মডেল তৈরি করা হচ্ছে। এর ফলে, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং কৃষকরা দ্রুত ও সহজ শর্তে ঋণ পেয়ে তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারছেন, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। তবে, এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা এবং গ্রাহকের সম্মতিবিহীন ডেটা ব্যবহারের প্রবণতা একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ডেটা গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো ফিনটেক খাতের ওপর গ্রাহকদের আস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে এই খাতের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।

ফাঁকা এআই স্প্যাম বাক্য ব্যবহার থেকে বিরত থেকে, বলা যায় যে, ফিনটেক খাতে বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলো, যেমন বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক অথরিটি (BHTPA) এর অধীনে স্থাপিত বিভিন্ন হাইটেক পার্কে গড়ে ওঠা স্টার্টআপগুলো, ডিজিটাল ঋণ বিতরণের জন্য নতুন নতুন অ্যালগরিদম এবং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে। তারা ব্লকচেইন প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়েও গবেষণা চালাচ্ছে, যা ঋণের স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা বাড়াতে পারে। কিন্তু এর পাশাপাশি, কিছু অনিয়ন্ত্রিত প্ল্যাটফর্ম গ্রাহকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহ করে তা অপব্যবহার করছে এবং ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হলে বিভিন্ন চাপ সৃষ্টি করছে, যা আইনগত ও নৈতিক উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) এর সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো এই বিষয়ে একটি নৈতিক কাঠামো তৈরির জন্য সরকারের সাথে আলোচনা করছে, যাতে উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি গ্রাহকদের স্বার্থও সুরক্ষিত থাকে। এই ভারসাম্য রক্ষা করা ডিজিটাল ঋণদান খাতের স্থিতিশীল বিকাশের জন্য অপরিহার্য। নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতা বা আইনগত কাঠামোর অনুপস্থিতি এই খাতকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ফিনটেক সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে।

বছর ডিজিটাল ঋণ বিতরণের পরিমাণ (বিলিয়ন টাকা) গ্রাহক সংখ্যা (মিলিয়ন) অভিযোগের সংখ্যা (BTRC-তে) অবৈধ অ্যাপ বন্ধের সংখ্যা (BTRC)
২০২০ ১০.৫ ১.২ ৩০ ৫
২০২১ ২২.৩ ৩.৫ ৮৫ ১৪
২০২২ ৪৫.৮ ৮.১ ১২০ ২৯
২০২৩ ৮০.২ ১৫.৪ ১৮৫ ৪৫

উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক, BTRC, ICT Division (বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত আনুমানিক তথ্য)

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ ব্যাংককে দ্রুত ফিনটেক নির্দেশিকা চূড়ান্ত করে ডিজিটাল ঋণদানকারী সকল প্রতিষ্ঠানকে বাধ্যতামূলকভাবে লাইসেন্সিং ও নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনতে হবে, যেখানে উচ্চ সুদের হার এবং গোপন চার্জের ওপর সুস্পষ্ট সীমা আরোপ করা হবে।
  • ICT Division এবং BTRC-কে যৌথভাবে একটি শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো এবং ডেটা সুরক্ষা আইন (যেমন - প্রস্তাবিত ডেটা সুরক্ষা আইন, DPA) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যা ডিজিটাল ঋণ অ্যাপগুলোর ডেটা সংগ্রহ, ব্যবহার ও সংরক্ষণের পদ্ধতিকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে এবং গ্রাহকের গোপনীয়তা নিশ্চিত করবে।
  • BASIS এবং a2i-কে ফিনটেক স্টার্টআপগুলোর জন্য একটি নৈতিক আচরণবিধি ও সেরা অনুশীলন নির্দেশিকা (Best Practice Guidelines) তৈরি করতে উৎসাহিত করতে হবে, যা BHTPA এর অধীনে পরিচালিত হাইটেক পার্কগুলোতে কর্মরত প্রতিষ্ঠানগুলো অনুসরণ করবে, যাতে উদ্ভাবন এবং গ্রাহক সুরক্ষার মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সামিয়া জামান

সামিয়া জামান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ফিনটেক ও ডিজিটাল পেমেন্ট ইকোসিস্টেম। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

コメントがありません


News Card Generator