ডেটা ও বাস্তবতা: করপোরেট গভর্ন্যান্স ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ডেটা ও বাস্তবতা: করপোরেট গভর্ন্যান্স ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন

অ্যাডভোকেট কায়সার  avatar   
অ্যাডভোকেট কায়সার
ডেটা ও বাস্তবতা: করপোরেট গভর্ন্যান্স ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন
ডেটা ও বাস্তবতা: করপোরেট গভর্ন্যান্স ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি খাতের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড পরিপালন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, তালিকাভুক্ত কোম...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড পরিপালন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে প্রায় ৪০% তাদের পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ এবং নিরীক্ষা কমিটির কার্যকারিতা সংক্রান্ত নির্দেশিকা সম্পূর্ণরূপে অনুসরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। এই পরিসংখ্যানটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোতে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা এবং দুর্নীতির সম্ভাব্য প্রবেশপথের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারী আস্থা এবং টেকসই উন্নয়নে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।

এই দুর্বলতা শুধু বেসরকারি খাতেই সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব প্রায়শই পরিলক্ষিত হয়, যা রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় এবং অদক্ষতার জন্ম দেয়। World Bank এবং Asian Development Bank (ADB) তাদের সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এন্টারপ্রাইজ (SOE) সংস্কারে ধীরগতির কথা উল্লেখ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, World Bank-এর 'Public Expenditure Review' (২০২৩) ইঙ্গিত করে যে, সরকারি প্রকল্পে প্রায় ২০-২৫% অতিরিক্ত ব্যয় হয়, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্স এবং ক্রয় প্রক্রিয়ার ত্রুটির কারণে সৃষ্ট। এই অতিরিক্ত ব্যয় সরাসরি জনগণের করের টাকা থেকে আসে এবং দেশের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে, শুধুমাত্র নিয়মকানুন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, বরং সেগুলোর কঠোর প্রয়োগ এবং নিয়মিত নিরীক্ষণের অভাবে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি শেকড় গাড়তে সুযোগ পায়, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে।

প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং দুর্বল করপোরেট গভর্ন্যান্সের প্রভাব বহুমাত্রিক, যা কেবল আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করে, যা প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) আকর্ষণকে ব্যাহত করে। World Bank-এর 'Doing Business' সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান প্রায়শই পিছিয়ে থাকে, যার অন্যতম কারণ হিসেবে দুর্বল চুক্তি প্রয়োগ, দুর্নীতির উচ্চ ঝুঁকি এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অপর্যাপ্ততাকে চিহ্নিত করা হয়। উপরন্তু, এই সমস্যাগুলো দেশের বিচারিক প্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক দায়েরকৃত মামলার দীর্ঘসূত্রিতা এবং শাস্তির হার কম থাকা প্রমাণ করে যে, আইনি কাঠামোর প্রয়োগে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এটি শুধু বিচার বিভাগের ওপর চাপ সৃষ্টি করে না, বরং দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জনমনে হতাশা তৈরি করে। বাংলাদেশ সরকার যদিও দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করেছে, তবে এর বাস্তবায়ন ও দৃশ্যমান ফলাফল অর্জনে এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (ADB) 'Integrity Due Diligence' ফ্রেমওয়ার্কের অধীনে পরিচালিত সাম্প্রতিক মূল্যায়নগুলোতেও বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি চিহ্নিত হয়েছে, যা প্রকল্পের কার্যকারিতা ও ফলাফলকে প্রভাবিত করছে।

সূচক ২০১৮ ২০২০ ২০২২
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল করাপশন পারসেপশনস ইনডেক্স (স্কোর) ২৬ ২৬ ২৫
World Bank গভর্ন্যান্স ইন্ডিকেটরস: কন্ট্রোল অফ করাপশন (পার্সেন্টাইল র‍্যাঙ্ক) ১৪.৪২% ১৩.৮৭% ১২.৩০%
বিএসইসি করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড পরিপালন হার (তালিকাভুক্ত কোম্পানি) ৬২% ৫৮% ৬০%
সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় ত্রুটিপূর্ণ দরপত্রের হার (ADB মূল্যায়ন) ১৮% ২২% ২০%

উৎস: ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, World Bank, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক প্রণীত করপোরেট গভর্ন্যান্স কোড-এর লঙ্ঘনের জন্য জরিমানা ও অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা এবং এই কোড পরিপালনের জন্য একটি স্বাধীন নিরীক্ষা সংস্থা গঠন করা, যার ফলাফল প্রতি বছর জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে।
  • দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর ক্ষমতা বৃদ্ধি করা এবং জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করা, যাতে তারা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে পারে এবং দুর্নীতির সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে পারে।
  • World Bank এবং ADB-এর সুপারিশের ভিত্তিতে সরকারি ক্রয় আইন (পিপিআর) এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন এন্টারপ্রাইজ (SOE) পরিচালনা কাঠামোতে সংস্কার আনা, যেখানে ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ই-প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা এবং SOE বোর্ডগুলোতে স্বাধীন পরিচালক নিয়োগের হার বৃদ্ধি করা হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: অ্যাডভোকেট কায়সার

অ্যাডভোকেট কায়সার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: করপোরেট গভর্ন্যান্স ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

کوئی تبصرہ نہیں ملا


News Card Generator