৫জি rollout: স্পেকট্রাম মূল্য ও অপারেটরদের বিনিয়োগ সক্ষমতার দোটানা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

৫জি rollout: স্পেকট্রাম মূল্য ও অপারেটরদের বিনিয়োগ সক্ষমতার দোটানা

কামরুল হাসান  avatar   
কামরুল হাসান
৫জি rollout: স্পেকট্রাম মূল্য ও অপারেটরদের বিনিয়োগ সক্ষমতার দোটানা
৫জি rollout: স্পেকট্রাম মূল্য ও অপারেটরদের বিনিয়োগ সক্ষমতার দোটানা
ছবি: সংগৃহীত
২০২২ সালের নিলামে প্রতি মেগাহার্টজ ৫জি স্পেকট্রামের জন্য বেজ প্রাইস ১২৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার নির্ধারণ করেছিল বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)...

২০২২ সালের নিলামে প্রতি মেগাহার্টজ ৫জি স্পেকট্রামের জন্য বেজ প্রাইস ১২৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার নির্ধারণ করেছিল বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এই উচ্চ মূল্য দেশের টেলিকম অপারেটরদের জন্য ৫জি রোলআউটকে একটি ব্যয়বহুল প্রস্তাবনায় পরিণত করেছে, যা তাদের বিনিয়োগ সক্ষমতার ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করছে। গ্রামীণফোন, রবি এবং বাংলালিংকের মতো প্রধান অপারেটররা, যারা ইতিমধ্যেই ৪জি নেটওয়ার্কে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করেছে, তারা ৫জি স্পেকট্রামের এই উচ্চ ব্যয়ের কারণে নতুন করে বৃহৎ বিনিয়োগের আগে দ্বিধাগ্রস্ত। এই দ্বিধা কেবল তাদের আর্থিক সক্ষমতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর সাথে যুক্ত হয়েছে ৫জি-এর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং নতুন ব্যবহারিক ক্ষেত্র (use cases) তৈরির বিশাল ব্যয়। উদাহরণস্বরূপ, বিটিআরসি-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের নিলামে মাত্র ১০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম বিক্রি হয়েছিল, যা উচ্চ মূল্যের কারণে অপারেটরদের অনাগ্রহের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত।

৫জি প্রযুক্তির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে শুধুমাত্র স্পেকট্রাম কেনাই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের সম্প্রসারণ, ফিক্সড ওয়্যারলেস অ্যাক্সেস (FWA) সলিউশন স্থাপন এবং এআই-ভিত্তিক স্মার্ট অ্যাপ্লিকেশন তৈরিতে বিপুল বিনিয়োগ। বর্তমান প্রেক্ষাপটে, যেখানে অপারেটরদের কাছ থেকে স্পেকট্রামের জন্য মোটা অঙ্কের অর্থ আদায় করা হচ্ছে, সেখানে তাদের পক্ষে এই অতিরিক্ত অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করা কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষত, বিটিআরসি এবং আইসিটি ডিভিশনের লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের ৭০% এলাকায় ৫জি কভারেজ নিশ্চিত করতে হলে শুধুমাত্র অপারেটরদের ওপর নির্ভর করে থাকা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সরকার এবং অন্যান্য সহযোগী সংস্থার যৌথ প্রচেষ্টা। এটুআই (a2i) এবং বিএইচটিপিএ (BHTPA)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ৫জি-ভিত্তিক উদ্ভাবনী সমাধান এবং স্মার্ট সিটি প্রকল্পের জন্য কাজ করলেও, তাদের কার্যক্রম অপারেটরদের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের ওপর নির্ভরশীল। উচ্চ স্পেকট্রাম মূল্য সরাসরি অপারেটরদের ক্যাপিটাল এক্সপেনডিচার (CAPEX) কমিয়ে দিচ্ছে, যার ফলস্বরূপ ৫জি-এর প্রকৃত সুবিধা, যেমন লো-ল্যাটেন্সি অ্যাপ্লিকেশন, শিল্প-কারখানায় অটোমেশন এবং ইন্টারনেট অফ থিংস (IoT) ডিভাইসের বিস্তার ব্যাহত হচ্ছে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের স্পেকট্রামের মূল্য অনেক বেশি, যা অপারেটরদের আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহে বাধা দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ভারত বা ইউরোপের দেশগুলোতে ৫জি স্পেকট্রামের মূল্য তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় অপারেটররা দ্রুত নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ করতে পেরেছে। এটি শুধু অপারেটরদের জন্য নয়, দেশের সামগ্রিক ডিজিটাল অর্থনীতি এবং বিএএসআইএস (BASIS)-এর মতো প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের জন্যও একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। ৫জি নেটওয়ার্কের ধীর বিস্তার মানে নতুন উদ্ভাবনী সেবা চালু হতে দেরি হওয়া, যা দেশের প্রযুক্তি খাতকে বিশ্ব প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে। ৫জি-এর পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে স্পেকট্রাম মূল্য যৌক্তিকীকরণ এবং অপারেটরদের জন্য বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা অপরিহার্য। পাশাপাশি, ৫জি-এর জন্য প্রয়োজনীয় ফাইবার অপটিক ব্যাকহোল এবং এজ কম্পিউটিং অবকাঠামো তৈরিতে সরকারি বিনিয়োগ ও নীতিগত সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা অপারেটরদের ওপর থেকে একাংশের চাপ কমিয়ে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে গতি আনবে।

সূচক বাংলাদেশ (২০২২) ভারত (২০২২) যুক্তরাজ্য (২০২১)
৫জি স্পেকট্রাম বেজ প্রাইস (প্রতি MHz) $126 মিলিয়ন $4.7 মিলিয়ন £1 মিলিয়ন ($1.3 মিলিয়ন)
৫জি স্পেকট্রাম নিলামে বিক্রি হওয়া পরিমাণ ১০ MHz ১৫০০+ MHz ২০০ MHz
৫জি কভারেজ লক্ষ্য (২০৩০) ৭০% ১০০% ৯৯%

উৎস: BTRC, TRAI, Ofcom এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক টেলিকম প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • বিটিআরসি-কে অবিলম্বে একটি নতুন স্পেকট্রাম মূল্য নির্ধারণ নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ এবং অপারেটরদের বিনিয়োগ সক্ষমতাকে অগ্রাধিকার দেবে। এই নীতিতে, স্পেকট্রামের মূল্য হ্রাসের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদী কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ অন্তর্ভুক্ত করা উচিত, যাতে অপারেটররা ৫জি অবকাঠামোতে অধিক বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত হয়।
  • আইসিটি ডিভিশন এবং এটুআই (a2i)-কে যৌথভাবে একটি '৫জি ইনোভেশন ফান্ড' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা স্থানীয় উদ্যোক্তা এবং বিএএসআইএস (BASIS)-এর সদস্যদের ৫জি-ভিত্তিক অ্যাপ্লিকেশন ও সার্ভিস ডেভেলপমেন্টে সহায়তা করবে। এই ফান্ডের মাধ্যমে অপারেটরদের ওপর থেকে নতুন ব্যবহারিক ক্ষেত্র তৈরির চাপ কমিয়ে, একটি সামগ্রিক ইকোসিস্টেম বিকাশে উৎসাহিত করা যাবে, যা ৫জি-এর বাণিজ্যিকীকরণকে ত্বরান্বিত করবে।
  • বিএইচটিপিএ (BHTPA)-কে তাদের হাই-টেক পার্কগুলোতে ৫জি-এর জন্য প্রয়োজনীয় ফাইবার অপটিক ব্যাকহোল এবং এজ কম্পিউটিং অবকাঠামো তৈরিতে সরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যা অপারেটরদের জন্য একটি শেয়ার্ড অবকাঠামো মডেল তৈরি করবে। এটি অপারেটরদের এককভাবে বিপুল বিনিয়োগের বোঝা কমিয়ে, ৫জি নেটওয়ার্ক দ্রুত সম্প্রসারণে সহায়তা করবে এবং জাতীয় ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ নীতিমালার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: কামরুল হাসান

কামরুল হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: টেলিকম, ৫জি ও ইন্টারনেট অবকাঠামো। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Aucun commentaire trouvé


News Card Generator