বর্জ্য থেকে সম্পদ: পোশাক শিল্পের সার্কুলার মডেল কি বাংলাদেশের ভাগ্য ফেরাবে? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বর্জ্য থেকে সম্পদ: পোশাক শিল্পের সার্কুলার মডেল কি বাংলাদেশের ভাগ্য ফেরাবে?

নাবিলা তাবাসসুম  avatar   
নাবিলা তাবাসসুম
বর্জ্য থেকে সম্পদ: পোশাক শিল্পের সার্কুলার মডেল কি বাংলাদেশের ভাগ্য ফেরাবে?
বর্জ্য থেকে সম্পদ: পোশাক শিল্পের সার্কুলার মডেল কি বাংলাদেশের ভাগ্য ফেরাবে?
ছবি: সংগৃহীত
গত বছর কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিবেশ অধিদফতর (Department of Environment - DoE) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১০ মিলিয়...

গত বছর কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিবেশ অধিদফতর (Department of Environment - DoE) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ১০ মিলিয়ন টন কৃষি বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অব্যবহৃত থেকে যায়। এই বিশাল পরিমাণ জৈব বর্জ্যকে সঠিকভাবে প্রক্রিয়াজাত করতে পারলে তা দেশের কৃষি ও পরিবেশগত টেকসই উন্নয়নে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। বিশেষত, বায়োমাস বর্জ্যকে জৈব সারে রূপান্তরিত করার মাধ্যমে শুধু মাটির উর্বরতা বৃদ্ধিই নয়, রাসায়নিক সারের উপর নির্ভরশীলতা কমানো এবং পরিবেশ দূষণ রোধেও এটি একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে, 'বর্জ্য থেকে সম্পদ: পোশাক শিল্পের সার্কুলার মডেল কি বাংলাদেশের ভাগ্য ফেরাবে?' শিরোনামটি কৃষি বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বৃহত্তর সার্কুলার ইকোনমি ধারণার একটি উপমা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে পোশাক শিল্পের বদলে কৃষি খাতের বর্জ্যকে সম্পদ হিসেবে রূপান্তরের সম্ভাবনাকেই মূলত বিশ্লেষণ করা হবে।

বাংলাদেশের কৃষি খাত, যা জিডিপিতে প্রায় ১৩% অবদান রাখে, প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ফসলের অবশিষ্টাংশ, পশুর বর্জ্য এবং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ বর্জ্য উৎপন্ন করে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এর গবেষণা অনুযায়ী, ধানের খড়, গমের ভুসি, ভুট্টার ডাঁটা এবং আখের ছোবড়া সহ বিভিন্ন কৃষি বর্জ্য জৈব সার উৎপাদনের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় কাঁচামাল। ঐতিহ্যগতভাবে এই বর্জ্যগুলির একটি অংশ জ্বালানি বা পশুখাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হলেও, একটি বড় অংশ পোড়ানো হয় অথবা ফেলে দেওয়া হয়, যা একদিকে যেমন বায়ু দূষণ ঘটায়, অন্যদিকে মাটির পুষ্টিগুণ পুনরুদ্ধারের সুযোগ নষ্ট করে। সার্কুলার মডেলের মূলনীতি হলো, এই বর্জ্যগুলিকে প্রক্রিয়াজাত করে উচ্চমূল্যের জৈব সারে রূপান্তরিত করা, যা কৃষকদের রাসায়নিক সারের উপর ব্যয় কমাতে সাহায্য করবে এবং মাটি ও পরিবেশের স্বাস্থ্য রক্ষা করবে। উদাহরণস্বরূপ, পশুর বর্জ্য থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদন এবং তার অবশিষ্টাংশকে জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা একটি দ্বিস্তরীয় সার্কুলার প্রক্রিয়া, যা একদিকে নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদন করে এবং অন্যদিকে মাটিকে সমৃদ্ধ করে।

এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় কারিগরি সহায়তা ও গবেষণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষি বর্জ্যকে জৈব সারে রূপান্তরের প্রযুক্তিগত দিকগুলো নিয়ে কাজ করছে। বর্তমানে, কম্পোস্টিং, ভার্মিকম্পোস্টিং এবং বায়োচার উৎপাদন প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষি বর্জ্যকে কার্যকরভাবে সারে পরিণত করা সম্ভব। তবে, এই প্রযুক্তিগুলির বৃহত্তর পরিসরে প্রয়োগ এবং কৃষকদের মধ্যে এর গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সহজলভ্য প্রযুক্তি এবং আর্থিক প্রণোদনা এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্ধারিত নীতিমালা ও মানদণ্ড অনুসরণ করে জৈব সার উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করা গেলে, এর গুণগত মান বজায় থাকবে এবং কৃষকরা এর ব্যবহারে উৎসাহিত হবেন। এতে একদিকে যেমন কৃষকরা লাভবান হবেন, তেমনি রাসায়নিক সারের যথেচ্ছ ব্যবহারজনিত ভূমি ও জল দূষণও হ্রাস পাবে, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য।

কৃষি বর্জ্যের প্রকার বার্ষিক উৎপাদন (মিলিয়ন টন) ব্যবহারের ক্ষেত্র (সার্কুলার মডেল) সম্ভাব্য প্রভাব
ধানের খড় ও ভুসি ৩৮.৫ জৈব সার, বায়োচার, পশুখাদ্য মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি, কার্বন সঞ্চয়
আখের ছোবড়া ৩.২ জৈব সার, বায়োগ্যাস, জ্বালানি রাসায়নিক সারের বিকল্প, নবায়নযোগ্য শক্তি
পোল্ট্রি ও পশুর বর্জ্য ৫.৫ জৈব সার, বায়োগ্যাস পুষ্টি উপাদান পুনঃব্যবহার, মিথেন গ্যাস হ্রাস
সবজি ও ফল বর্জ্য ১.৭ কম্পোস্ট সার, ভার্মিকম্পোস্ট মাটির গঠন উন্নতকরণ, বর্জ্য হ্রাস

উৎস: DoE, BARI, BRRI এবং BARC-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অবলম্বনে সংকলিত।

সুপারিশ

  • পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে 'কৃষি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জৈব সার উৎপাদন নীতি ২০২৫' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে কৃষকদের জৈব সার উৎপাদনে উৎসাহিত করার জন্য ভর্তুকি ও সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা থাকবে এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র স্থাপনের নির্দেশনা থাকবে।
  • বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)-কে স্বল্প খরচে উন্নত মানের জৈব সার উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও প্রসারে গবেষণা তহবিল বৃদ্ধি করতে হবে, বিশেষত বায়োচার এবং ভার্মিকম্পোস্টিং প্রযুক্তির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
  • বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC)-কে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (DAE) সাথে সমন্বয় করে দেশব্যাপী কৃষকদের জন্য 'বর্জ্য থেকে সম্পদ' বিষয়ক নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজন করতে হবে, যেখানে ব্যবহারিক প্রদর্শনী এবং সফল কৃষকদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সুযোগ থাকবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাবিলা তাবাসসুম

নাবিলা তাবাসসুম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nessun commento trovato


News Card Generator