সম্প্রতি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রয়্যালটি আদায় সংক্রান্ত মামলার সংখ্যা পূর্ববর্তী তিন বছরের তুলনায় প্রায় ৩০% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের সংগীত শিল্পের রয়্যালটি অধিকার নিয়ে চলমান জটিলতা ও অসঙ্গতির এক স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। এই পরিসংখ্যান কেবল আইনি লড়াইয়ের বৃদ্ধিকেই নির্দেশ করে না, বরং এটি সংগীত সৃষ্টিকর্তাদের প্রাপ্য অধিকার আদায়ে দীর্ঘদিনের সংগ্রাম এবং প্রচলিত ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও প্রকটভাবে সামনে নিয়ে আসে। বিশেষ করে যখন দেখা যায়, আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় স্থানীয় শিল্পীরা তাদের ডিজিটাল কন্টেন্ট থেকে নামমাত্র রয়্যালটি পাচ্ছেন, তখন এই সমস্যাটি একটি জাতীয় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের সংগীত শিল্পে রয়্যালটি আদায় এবং বিতরণের প্রক্রিয়াটি একটি জটিল ও অস্বচ্ছ ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে যায়, যেখানে সৃষ্টিকর্তা, প্রযোজক, পরিবেশক এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে আয়ের ন্যায্য বণ্টন প্রায়শই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। মাঠ পর্যায়ের গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে প্রযোজনা সংস্থাগুলো শিল্পীদের সাথে এমন চুক্তি করে যেখানে রয়্যালটি বিতরণের সুনির্দিষ্ট কোনো স্বচ্ছ নীতিমালা থাকে না, অথবা চুক্তির শর্তাবলী শিল্পীদের জন্য প্রতিকূল হয়। বিশেষ করে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে প্রাপ্ত আয় গণনার পদ্ধতি এবং সেই আয় বণ্টনের প্রক্রিয়া এতটাই অস্পষ্ট যে, শিল্পীরা প্রায়শই তাদের প্রাপ্য অংশ সম্পর্কে অবগত থাকেন না। এমনকি, বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে সংগৃহীত রয়্যালটির একটি বড় অংশ মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে চলে যায়, যার ফলে মূল সৃষ্টিকর্তারা তাদের শ্রম ও মেধার ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হন। এই অসামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যবস্থা শিল্পীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করছে এবং নতুন সৃষ্টিশীলতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের সাংস্কৃতিক অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
আইনগত কাঠামোর ক্ষেত্রে, বাংলাদেশ কপিরাইট আইন, ২০০০ (এবং এর সংশোধনীসমূহ) রয়্যালটি অধিকার সুরক্ষায় একটি মৌলিক ভিত্তি প্রদান করলেও, এর বাস্তবায়ন ও প্রয়োগে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। কপিরাইট অফিস যদিও রয়্যালটি সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে ভূমিকা রাখে, তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সীমিত সক্ষমতা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর বৈশ্বিক প্রকৃতির কারণে স্থানীয় আইন প্রায়শই কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়। উদাহরণস্বরূপ, আন্তর্জাতিক ডিজিটাল স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের নিজস্ব টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনস অনুসরণ করে, যা অনেক সময় বাংলাদেশের স্থানীয় আইনের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এছাড়াও, রয়্যালটি কালেকশন অর্গানাইজেশন (RCO) বা কালেক্টিভ ম্যানেজমেন্ট অর্গানাইজেশন (CMO) গুলোর কার্যক্রম এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত হয়নি, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ রয়্যালটি আদায় ও বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। এই দুর্বলতাগুলি রয়্যালটি আদায় প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তোলে এবং শিল্পীদের জন্য তাদের অধিকার আদায়কে আরও কঠিন করে তোলে, যেখানে World Bank এর গবেষণায় দেখা গেছে যে কার্যকর CMO ছাড়া, একটি দেশের সৃজনশীল শিল্প খাত তার পূর্ণ সম্ভাবনা অর্জন করতে পারে না।
ডিজিটাল বিপ্লবের ফলে সংগীতের সহজলভ্যতা বাড়লেও, সৃষ্টিকর্তাদের আয় কমেছে। ঐতিহ্যবাহী অডিও ক্যাসেট ও সিডির যুগ থেকে ডিজিটাল স্ট্রিমিং এবং ডাউনলোড-ভিত্তিক প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তরের ফলে, রয়্যালটি আদায়ের ধরন ও পরিমাণ উভয়ই পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমানে, ইউটিউব, স্পটিফাই, আইটিউনস এবং স্থানীয় প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে প্রাপ্ত রয়্যালটিই শিল্পীদের আয়ের প্রধান উৎস। কিন্তু এই প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে প্রাপ্ত আয়ের হার অত্যন্ত কম, এবং এর একটি ক্ষুদ্র অংশই চূড়ান্তভাবে শিল্পীর পকেটে পৌঁছায়। উদাহরণস্বরূপ, ADB-এর একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে এক মিলিয়ন স্ট্রিমের জন্য শিল্পীদের গড় আয় ১০০-৩০০ মার্কিন ডলারের মধ্যে থাকে, যা পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম। এই পরিস্থিতি দেশের উদীয়মান শিল্পীদের জন্য একটি টেকসই জীবিকা নির্বাহ করাকে কঠিন করে তুলেছে এবং অনেকেই বিকল্প পেশার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হচ্ছেন। এই অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টিশীলতার গুণগত মানকেও প্রভাবিত করছে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
| রয়্যালটি আদায় ও বন্টন সংক্রান্ত তথ্য (বাংলাদেশ) | ২০২০ | ২০২১ | ২০২২ | ২০২৩ (প্রাক্কলিত) |
|---|---|---|---|---|
| মোট রয়্যালটি আদায় (লক্ষ টাকা) | ৮৫ | ১২০ | ১৮০ | ২২০ |
| শিল্পীদের কাছে পৌঁছানো রয়্যালটির শতাংশ | ২০% | ২২% | ১৮% | ২৫% |
| ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে আয় বৃদ্ধি (%) | +১৫% | +২০% | +৩০% | +২৫% |
| কপিরাইট লঙ্ঘন মামলার সংখ্যা | ৪৫ | ৬২ | ৮৫ | ১১০ |
উৎস: বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় প্রযোজনা সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদন।
সুপারিশ
- বাংলাদেশ সরকার অবিলম্বে বাংলাদেশ কপিরাইট আইন, ২০০০ (সংশোধিত) এর আওতায় একটি শক্তিশালী এবং স্বচ্ছ রয়্যালটি কালেকশন অর্গানাইজেশন (RCO) বা কালেক্টিভ ম্যানেজমেন্ট অর্গানাইজেশন (CMO) প্রতিষ্ঠা ও কার্যকর করার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ভিত্তিক রোডম্যাপ প্রণয়ন করুক, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ড (যেমন World Intellectual Property Organization - WIPO এর গাইডলাইন) অনুসরণ করবে এবং সকল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সাথে সরাসরি চুক্তি করে রয়্যালটি আদায় ও বন্টন করবে।
- সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে রয়্যালটি বন্টন চুক্তিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একটি বাধ্যতামূলক স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (SOP) তৈরি করুক, যেখানে শিল্পী, গীতিকার ও সুরকারদের জন্য নূন্যতম রয়্যালটি হার (যেমন, প্রতি স্ট্রিমের জন্য একটি নির্দিষ্ট মাইক্রো-পেমেন্ট) নির্ধারণ করা হবে এবং এই চুক্তিগুলো বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের মাধ্যমে নিবন্ধিত ও নিরীক্ষিত হবে।
- বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস, World Bank ও ADB-এর সহায়তায়, কপিরাইট সুরক্ষা ও রয়্যালটি আদায় প্রক্রিয়ার উপর শিল্পী, প্রযোজক এবং স্টেকহোল্ডারদের জন্য নিয়মিত কর্মশালা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করুক, যাতে তারা তাদের অধিকার, চুক্তিপত্রের শর্তাবলী এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে রয়্যালটি আদায়ের পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতন হতে পারে এবং আইনি প্রতিকার চাইতে সক্ষম হয়।