নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি এইচআরের চাকরি খাবে নাকি সুযোগ বাড়াবে? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি এইচআরের চাকরি খাবে নাকি সুযোগ বাড়াবে?

শারমিন সুলতানা  avatar   
শারমিন সুলতানা
নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি এইচআরের চাকরি খাবে নাকি সুযোগ বাড়াবে?
নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি এইচআরের চাকরি খাবে নাকি সুযোগ বাড়াবে?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (WEF) 'ফিউচার অফ জবস রিপোর্ট ২০২৩' প্রকাশিত হওয়ার পর কর্পোরেট বিশ্বে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, আগ...

সম্প্রতি, বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (WEF) 'ফিউচার অফ জবস রিপোর্ট ২০২৩' প্রকাশিত হওয়ার পর কর্পোরেট বিশ্বে এক নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই রিপোর্টে বলা হয়েছে, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১৪ মিলিয়ন চাকরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং অটোমেশনের প্রভাবে বিলুপ্ত হতে পারে, তবে একই সাথে নতুন কিছু কর্মক্ষেত্রও তৈরি হবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার (এইচআর) ক্ষেত্রে এই চ্যালেঞ্জ এবং সুযোগ উভয়ই বিদ্যমান। যদিও এইচআর ফাংশনে এআই-এর প্রবেশ প্রাথমিক পর্যায়ে, কিন্তু নিয়োগ, কর্মী মূল্যায়ন, প্রশিক্ষণ এবং পারফরম্যান্স ম্যানেজমেন্টের মতো ক্ষেত্রগুলোতে এর প্রভাব ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান। এই পরিস্থিতি দেশের এইচআর পেশাজীবী এবং নীতি নির্ধারকদের জন্য এক জটিল অথচ সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এইচআর বিভাগের গতানুগতিক কাজগুলোকে স্বয়ংক্রিয় করে তুলছে, যা একদিকে কর্মদক্ষতা বাড়াচ্ছে এবং অন্যদিকে মানবসম্পদ কর্মকর্তাদের জন্য কৌশলগত ভূমিকা পালনের সুযোগ তৈরি করছে। উদাহরণস্বরূপ, এআই-চালিত অ্যালগরিদমগুলো লাখ লাখ জীবনবৃত্তান্ত (CV) থেকে দ্রুততম সময়ে যোগ্য প্রার্থী বাছাই করতে সক্ষম, যা নিয়োগ প্রক্রিয়াকে উল্লেখযোগ্যভাবে গতিশীল করেছে। একই সাথে, কর্মীর কর্মক্ষমতা বিশ্লেষণ, প্রশিক্ষণের চাহিদা নিরূপণ এবং এমনকি কর্মীদের সম্ভাব্য কর্মত্যাগ (attrition) পূর্বাভাসেও এআই কার্যকরী ভূমিকা রাখছে। এর ফলে, এইচআর পেশাজীবীদের প্রশাসনিক কাজ কমে আসছে এবং তারা প্রতিষ্ঠানের কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে আরও বেশি সময় ও শক্তি বিনিয়োগ করতে পারছেন। তবে, এই প্রযুক্তিগত রূপান্তর এইচআর পেশাজীবীদের জন্য নতুন দক্ষতা অর্জনের তাগিদও সৃষ্টি করেছে। ডেটা অ্যানালিটিক্স, এআই টুলস পরিচালনা এবং অ্যালগরিদমিক পক্ষপাত (algorithmic bias) বোঝার মতো বিষয়গুলো এখন এইচআর কর্মকর্তাদের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তনকে সফলভাবে মোকাবেলা করতে না পারলে, এইচআর পেশার একটি বড় অংশ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কাছে তাদের কার্যকারিতা হারাবে।

বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে এই পরিবর্তনগুলোর প্রভাব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো, বিশেষ করে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানগুলো, এইচআর এবং ব্যবসায় প্রশাসন সংশ্লিষ্ট প্রোগ্রামগুলোতে এআই ও ডেটা সায়েন্সের উপাদান অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে ভবিষ্যতের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখতে পারে। ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (Directorate of Technical Education) এর মতো সংস্থাগুলো তাদের প্রশিক্ষণ মডিউলগুলোতে এআই-চালিত এইচআর টুলস এবং ডেটা অ্যানালিটিক্সের ব্যবহারিক জ্ঞান অন্তর্ভুক্ত করে কর্মীবাহিনীকে প্রস্তুত করতে পারে। SEIP (Skills for Employment Investment Program) এর মতো প্রকল্পগুলো যদি বিদ্যমান দক্ষতা উন্নয়নের পাশাপাশি এআই-ভিত্তিক এইচআর প্রযুক্তির উপর বিশেষায়িত কোর্স চালু করে, তবে তা নতুন প্রজন্মের এইচআর পেশাজীবীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে সহায়ক হবে। BANBEIS (Bangladesh Bureau of Educational Information and Statistics) এর তথ্য অনুযায়ী, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় স্নাতকদের কর্মসংস্থানের হার তুলনামূলকভাবে ভালো হলেও, এআই-যুগের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় তাদের সিলেবাসে আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন জরুরি। এই সমন্বিত উদ্যোগগুলো এইচআর পেশায় এআই-এর প্রভাবকে একটি সংকট না দেখে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে সাহায্য করবে।

প্রতিষ্ঠানের নাম ভূমিকা এআই ও এইচআর-এর সমন্বয়ে সম্ভাব্য কার্যক্রম বর্তমান অবস্থা (২০২৩-২৪)
UGC (বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন) উচ্চশিক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এইচআর ও এআই-এর সমন্বিত কোর্স প্রবর্তন, কারিকুলাম আধুনিকীকরণ। বেশ কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এআই/ডেটা সায়েন্স কোর্স চালু করলেও, এইচআর-এর সাথে সমন্বিত কোর্স সীমিত।
NSDA (জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এইচআর পেশাজীবীদের জন্য এআই-ভিত্তিক টুলস ও ডেটা অ্যানালিটিক্স প্রশিক্ষণের মান নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন। বিভিন্ন সেক্টরে দক্ষতা উন্নয়নে জোর দিচ্ছে, কিন্তু এইচআর-এআই নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণের জন্য কাঠামো এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে।
BANBEIS (বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো) শিক্ষাসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের প্রবণতা বিশ্লেষণে এআই ব্যবহার, এইচআর বাজারের চাহিদা অনুযায়ী তথ্য সরবরাহ। শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে ডেটা সংগ্রহে সক্রিয়, তবে এইচআর-এআই বাজারের জন্য গভীর বিশ্লেষণ এখনো সীমিত।
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা পরিচালনা প্রযুক্তিগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য এআই-চালিত এইচআর ব্যবস্থার উপর হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা। বিভিন্ন পলিটেকনিক ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবে এইচআর-এআই নির্দিষ্ট মডিউল বিরল।
SEIP (Skills for Employment Investment Program) কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প এইচআর পেশায় এআই-এর ব্যবহার সংক্রান্ত বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরি ও বাস্তবায়ন। বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থানমুখী প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, এইচআর-এআই এর উপর নির্দিষ্ট ফোকাস এখনো অনুপস্থিত।

উৎস: UGC বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২২-২৩), NSDA বার্ষিক পরিকল্পনা (২০২৩-২৪), BANBEIS শিক্ষাতথ্য (২০২৩), কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ওয়েবসাইট, SEIP প্রকল্প পর্যালোচনা।

সুপারিশ

  • দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে UGC-এর তত্ত্বাবধানে 'মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা' বিষয়ক একটি সমন্বিত স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা বা সার্টিফিকেট কোর্স চালু করা যেতে পারে। এই কোর্সে ডেটা সায়েন্স, মেশিন লার্নিং, এআই-চালিত নিয়োগ প্ল্যাটফর্ম এবং এইচআর অ্যানালিটিক্সের ব্যবহারিক প্রয়োগ অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যা ভবিষ্যতের এইচআর পেশাজীবীদের বাজারের চাহিদা পূরণে সক্ষম করবে।
  • NSDA এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর যৌথভাবে এইচআর পেশাজীবী ও কারিগরি শিক্ষার্থীদের জন্য এআই-ভিত্তিক এইচআর টুলস (যেমন - এআই-চালিত চ্যাটবট, পারফরম্যান্স ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার) পরিচালনার উপর বিশেষায়িত স্বল্পমেয়াদী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে। এই কর্মসূচির লক্ষ্য হবে ২০২৫ সালের মধ্যে বিদ্যমান এইচআর কর্মীদের অন্তত ৩০% কে এআই-এর মৌলিক ব্যবহারে দক্ষ করে তোলা।
  • SEIP প্রকল্পের অধীনে একটি নতুন তহবিল বরাদ্দ করে 'এআই-চালিত এইচআর দক্ষতা উন্নয়ন ফান্ড' গঠন করা যেতে পারে, যা এইচআর পেশাজীবীদের জন্য এআই-ভিত্তিক নতুন দক্ষতা অর্জনে আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে। এই ফান্ডের মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন কারিকুলাম ও প্রশিক্ষক তৈরিতে BANBEIS-এর ডেটা ব্যবহার করে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী কার্যক্রম চালাতে পারবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শারমিন সুলতানা

শারমিন সুলতানা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: কর্পোরেট লিডারশিপ ও এইচআর। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator