তৈরি পোশাক (RMG) ও টেক্সটাইল খাত: মূল্য সংযোজনে পিছিয়ে পড়ার কারণ ও উত্তরণের পথ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

তৈরি পোশাক (RMG) ও টেক্সটাইল খাত: মূল্য সংযোজনে পিছিয়ে পড়ার কারণ ও উত্তরণের পথ

নাসির উদ্দিন  avatar   
নাসির উদ্দিন
তৈরি পোশাক (RMG) ও টেক্সটাইল খাত: মূল্য সংযোজনে পিছিয়ে পড়ার কারণ ও উত্তরণের পথ
তৈরি পোশাক (RMG) ও টেক্সটাইল খাত: মূল্য সংযোজনে পিছিয়ে পড়ার কারণ ও উত্তরণের পথ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) কর্তৃক প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) তৈরি পোশাক (RMG) খাতের রপ্তানি আয় ৪৩....

সম্প্রতি রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) কর্তৃক প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) তৈরি পোশাক (RMG) খাতের রপ্তানি আয় ৪৩.৮৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৪.৩৯% বেশি। এই প্রবৃদ্ধি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক হলেও, উচ্চমূল্যের পোশাক পণ্যের (High Value Added Items) দিকে বাংলাদেশের ধীর অগ্রগতি একটি গভীর উদ্বেগের কারণ। যেখানে ভিয়েতনাম এবং তুরস্কের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো কৃত্রিম তন্তু (Man-made Fiber - MMF) ভিত্তিক পোশাক এবং প্রযুক্তিগত বস্ত্র (Technical Textiles) উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ করে বৈশ্বিক বাজারে তাদের অংশীদারিত্ব বাড়াচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ এখনও মূলত তুলা-ভিত্তিক (Cotton-based) মৌলিক পোশাক উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। এই সীমাবদ্ধতা দেশের আরএমজি খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, বিশেষ করে যখন বিশ্ববাজারে MMF পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে এবং তুলা-ভিত্তিক পণ্যের মূল্য সংযোজনের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশের আরএমজি খাতের মূল্য সংযোজনে পিছিয়ে থাকার অন্যতম প্রধান কারণ হলো কাঁচামাল এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার অভাব। দেশের টেক্সটাইল শিল্প, বিশেষ করে স্পিনিং এবং উইভিং খাতে, উচ্চমূল্যের MMF সুতা এবং কাপড়ের উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক প্রযুক্তির বিনিয়োগে এখনও অনেক পিছিয়ে। বিজিএমইএ (BGMEA) এবং বিকেএমইএ (BKMEA) এর সদস্যরা প্রায়শই অভিযোগ করেন যে, স্থানীয়ভাবে MMF সুতা ও কাপড়ের সরবরাহ অপ্রতুল এবং গুণগত মান অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানের সমকক্ষ নয়, যার ফলে তাদের আমদানির উপর নির্ভর করতে হয়। এই আমদানিনির্ভরতা একদিকে যেমন উৎপাদন ব্যয় বাড়ায়, তেমনি সরবরাহ শৃঙ্খলে অনিশ্চয়তা তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, বিশেষায়িত সিন্থেটিক ফাইবার যেমন পলিয়েস্টার, নাইলন, রেয়ন ইত্যাদি ব্যবহার করে উৎপাদিত অ্যাক্টিভওয়্যার, আউটওয়্যার বা টেকনিক্যাল টেক্সটাইল পণ্যের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল প্রায় পুরোটাই আমদানি করতে হয়। ফলস্বরূপ, পোশাকের ডিজাইন, ফেব্রিক সোর্সিং এবং উৎপাদন প্রক্রিয়ায় নতুনত্ব আনার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়, যা উচ্চমূল্যের ফ্যাশন পণ্যের দিকে স্থানান্তরের জন্য অত্যাবশ্যক। এছাড়া, গবেষণা ও উন্নয়নে (R&D) বিনিয়োগের অভাবও এই খাতে নতুন পণ্য উদ্ভাবন এবং উন্নত উৎপাদন কৌশল গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে।

এছাড়াও, দক্ষ জনবলের অভাব এবং দুর্বল নীতি সহায়তা কাঠামো মূল্য সংযোজনে পিছিয়ে পড়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। আরএমজি খাতে এখনও ঐতিহ্যবাহী উৎপাদন পদ্ধতির উপর বেশি নির্ভর করা হয়, যেখানে স্বয়ংক্রিয়তা এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার তুলনামূলকভাবে কম। DIFE (কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর) যদিও কর্মপরিবেশ উন্নয়নে কাজ করছে, কিন্তু উচ্চ প্রযুক্তির মেশিন পরিচালনা এবং জটিল ডিজাইন বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রকৌশলী ও দক্ষ টেকনিশিয়ানের সংকট রয়েছে। কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী অত্যাধুনিক কারিকুলাম তৈরি করতে পারেনি, যা দক্ষ জনবল তৈরিতে পিছিয়ে রাখছে। অন্যদিকে, সরকারের পক্ষ থেকে উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতি প্রণয়নে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। যদিও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে, কিন্তু MMF ভিত্তিক শিল্প স্থাপন এবং আধুনিক প্রযুক্তি আমদানির জন্য দীর্ঘমেয়াদী ও সহজ শর্তের ঋণ সুবিধা, শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি সুবিধা, এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের জন্য কার্যকর নীতিমালার অভাব বিদ্যমান। এই বিষয়গুলো সামগ্রিকভাবে দেশের আরএমজি খাতকে নিম্ন-মূল্যের পণ্যের ফাঁদে আটকে রেখেছে, যেখানে প্রতিযোগিতার মূল ভিত্তি হলো শ্রমের কম মজুরি, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।

পণ্যের ধরন ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রপ্তানি (%) ২০২২-২৩ অর্থবছরে রপ্তানি (%) মূল্য সংযোজন সম্ভাবনা
কটন-ভিত্তিক পোশাক ৭৪.৮% ৭৩.২% মাঝারি থেকে নিম্ন
ম্যান-মেড ফাইবার (MMF) ভিত্তিক পোশাক ২৫.২% ২৬.৮% উচ্চ থেকে খুব উচ্চ
টেকনিক্যাল টেক্সটাইল ও অন্যান্য ০.০% ০.০% (উল্লেখযোগ্য নয়) অত্যন্ত উচ্চ

উৎস: রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এবং BGMEA ডেটা বিশ্লেষণ

সুপারিশ

  • সরকারকে রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এবং বাংলাদেশ ব্যাংক-এর মাধ্যমে MMF ভিত্তিক টেক্সটাইল শিল্প এবং উচ্চ প্রযুক্তির পোশাক উৎপাদনকারী ইউনিট স্থাপনের জন্য দীর্ঘমেয়াদী, স্বল্প সুদের ঋণ এবং বিশেষ কর প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে। একই সাথে, MMF কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও ভ্যাট সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে স্থানীয় উৎপাদনকারীদের জন্য একটি প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে বিজিএমইএ (BGMEA), বিকেএমইএ (BKMEA) এবং DIFE (কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর) এর সাথে সমন্বয় করে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কারিকুলাম আধুনিকায়ন করতে হবে। উচ্চমূল্যের পোশাক পণ্যের ডিজাইন, MMF ফেব্রিক প্রক্রিয়াকরণ, এবং স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ প্রকৌশলী ও টেকনিশিয়ান তৈরির লক্ষ্যে বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির প্রবর্তন এবং বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় জ্ঞান ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
  • শিল্প মন্ত্রণালয়কে MMF স্পিনিং, উইভিং এবং ফিনিশিং শিল্পে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (FDI) আকৃষ্ট করার জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে (SEZ) অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা প্রদান করতে হবে। এছাড়া, স্থানীয় টেক্সটাইল মিলগুলোকে আধুনিক যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য সহজ শর্তে ঋণ এবং শুল্কমুক্ত সুবিধার পাশাপাশি R&D খাতে বিনিয়োগের জন্য বিশেষ অনুদান প্রদান করতে হবে, যাতে তারা উচ্চমূল্যের MMF সুতা ও কাপড় উৎপাদনে সক্ষম হয় এবং আমদানি নির্ভরতা কমে আসে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাসির উদ্দিন

নাসির উদ্দিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: তৈরি পোশাক (RMG) ও টেক্সটাইল খাত। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Inga kommentarer hittades


News Card Generator