কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ: উৎপাদনশীলতা বনাম কর্মীদের সুস্থতা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ: উৎপাদনশীলতা বনাম কর্মীদের সুস্থতা

নাসরিন আক্তার  avatar   
নাসরিন আক্তার
কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ: উৎপাদনশীলতা বনাম কর্মীদের সুস্থতা
কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ: উৎপাদনশীলতা বনাম কর্মীদের সুস্থতা
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) ও হাসপাতাল কর্তৃক প্রকাশিত এক উদ্বেগজনক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপজনিত অসু...

সম্প্রতি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) ও হাসপাতাল কর্তৃক প্রকাশিত এক উদ্বেগজনক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপজনিত অসুস্থতার কারণে চিকিৎসা গ্রহণকারী রোগীর সংখ্যা প্রায় ৩০% বৃদ্ধি পেয়েছে। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং কর্মজীবীদের সুস্থতা এবং সামগ্রিকভাবে দেশের উৎপাদনশীলতার উপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাবের এক সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। বিশেষ করে, কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে অনলাইন ও হাইব্রিড কাজের সংস্কৃতি চালু হওয়ার পর থেকে কাজের চাপ, কর্ম-জীবনের ভারসাম্যহীনতা এবং কর্মক্ষেত্রে সহকর্মীদের সঙ্গে সংযোগের অভাব অনেক কর্মীর মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং বার্নআউটের মতো সমস্যা বৃদ্ধি করেছে। দেশের স্বাস্থ্যখাতের অন্যতম নিয়ন্ত্রক সংস্থা, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর প্রাথমিক পর্যবেক্ষণও এই প্রবণতাকে সমর্থন করে, যেখানে কর্মজীবী মানুষের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই ক্রমবর্ধমান চাপ শুধু ব্যক্তির স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে না, বরং প্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদনশীলতা, কর্মীদের ধরে রাখা এবং সামগ্রিক কর্মপরিবেশকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যা একটি গভীরতর সামাজিক ও অর্থনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ বৃদ্ধির পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা যায়। প্রথমত, আধুনিক কর্মপরিবেশে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির কারণে কাজের গতি এবং প্রত্যাশা উভয়ই বেড়েছে। কর্মীদের প্রায়শই ২৪/৭ সংযুক্ত থাকতে হয়, যা তাদের ব্যক্তিগত জীবন এবং বিশ্রামের সময়কে সংকুচিত করে তোলে। উদাহরণস্বরূপ, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কর্মরতদের মধ্যে 'সর্বদা উপলব্ধ' থাকার সংস্কৃতি মানসিক ক্লান্তির একটি বড় কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং চাকরির নিরাপত্তার অভাবও কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। কর্মচ্যুতি বা পদোন্নতির প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার চাপ অনেক সময় কর্মীদের অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে বাধ্য করে, যা শেষ পর্যন্ত তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। তৃতীয়ত, কর্মক্ষেত্রে পর্যাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ব্যবস্থার অভাব একটি বড় সমস্যা। অনেক প্রতিষ্ঠানেই কর্মীদের মানসিক সুস্থতার জন্য কোনো সুনির্দিষ্ট নীতি বা কর্মসূচি নেই। এমনকি, যে প্রতিষ্ঠানগুলোতে এমন উদ্যোগ দেখা যায়, সেখানেও কর্মীরা কলঙ্ক বা কর্মচ্যুতির ভয়ে তাদের সমস্যা প্রকাশ করতে দ্বিধা করেন। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এই সমস্যাটির গুরুত্ব অনুধাবন করে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নীতিগত দিকনির্দেশনা তৈরির উপর জোর দিচ্ছে, তবে এর বাস্তবায়ন এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।

মানসিক চাপ শুধু কর্মীদের ব্যক্তিগত দুর্ভোগের কারণ নয়, এটি দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা এবং অর্থনৈতিক অগ্রগতিতেও বাধা সৃষ্টি করে। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিজ রিসার্চ, বাংলাদেশ (IEDCR) এর এক গবেষণা অনুযায়ী, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাজনিত কারণে কর্মীরা প্রায়শই কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকেন অথবা উপস্থিত থাকলেও তাদের কাজের মান হ্রাস পায়, যা 'প্রেজেন্টিজম' নামে পরিচিত। এই প্রেজেন্টিজম কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতির চেয়েও বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি করে। দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চাপ কর্মীদের সৃজনশীলতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা হ্রাস করে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবনী ক্ষমতা কমে যায় এবং সামগ্রিকভাবে ব্যবসায়িক লক্ষ্য অর্জন ব্যাহত হয়। উপরন্তু, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত কর্মীদের চিকিৎসা ও সহায়তা প্রদানে প্রতিষ্ঠানের খরচ বাড়ে, যা পরোক্ষভাবে লাভজনকতাকে প্রভাবিত করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এর মতে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাজনিত কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রতি বছর প্রায় ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ক্ষতি হয় উৎপাদনশীলতা হারানোর কারণে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এই ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হতে পারে, যদিও সুনির্দিষ্ট জাতীয় পরিসংখ্যান এখনও অপ্রতুল। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এর তথ্যমতে, গত এক দশকে মানসিক স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত ঔষধের বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ বৃদ্ধির একটি পরোক্ষ প্রমাণ।

বছর কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপজনিত রোগীর সংখ্যা (NIMH-এ নিবন্ধিত) মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ঔষধের বিক্রি বৃদ্ধি (%) (DGDA ডেটা) কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতির হার বৃদ্ধি (%) (আনুমানিক)
২০১৮ ১০,৫০০ ৩.৫% ১.২%
২০১৯ ১১,২০০ ৪.২% ১.৫%
২০২০ ১৪,০০০ ৬.৮% ২.৫% (কোভিড-১৯ প্রভাব)
২০২১ ১৫,৫০০ ৭.৫% ২.০%
২০২২ ১৬,৮০০ ৮.২% ১.৮%
২০২৩ ১৭,৫০০ ৯.০% ১.৭%

উৎস: জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH), ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এবং IEDCR-এর প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ ভিত্তিক আনুমানিক ডেটা।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এর সমন্বয়ে সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে 'কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য নীতিমালা' প্রণয়ন ও বাধ্যতামূলক বাস্তবায়নের জন্য একটি সুস্পষ্ট আইন তৈরি করতে হবে, যেখানে কর্মীদের জন্য নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং, গোপনীয় কাউন্সেলিং সেবা এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
  • জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর তত্ত্বাবধানে একটি জাতীয় টোল-ফ্রি হেল্পলাইন এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম চালু করতে হবে, যা কর্মজীবীদের জন্য ২৪/৭ মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রদান করবে এবং এর প্রচারণার দায়িত্ব IEDCR গ্রহণ করবে যাতে সকল স্তরের কর্মজীবী মানুষ এই সেবা সম্পর্কে অবগত হন ও সহজে প্রবেশাধিকার পান।
  • ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এর সহযোগিতায় মানসিক স্বাস্থ্য ঔষধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি, মানসিক স্বাস্থ্য সেবার মান নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর তদারকি ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং একই সাথে চিকিৎসকদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক আধুনিক প্রশিক্ষণ ও গাইডলাইন নিয়মিত হালনাগাদ করার ব্যবস্থা করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাসরিন আক্তার

নাসরিন আক্তার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মানসিক স্বাস্থ্য ও ওয়েলনেস। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Комментариев нет


News Card Generator