ই-কমার্স ও এফ-কমার্স: ডেলিভারি প্রতারণা ও গ্রাহক আস্থার ভাঙন - দায়… | আই নিউজ বিডি

ই-কমার্স ও এফ-কমার্স: ডেলিভারি প্রতারণা ও গ্রাহক আস্থার ভাঙন - দায় কার, সমাধান কী?

ইমরান খান  avatar   
ইমরান খান
ই-কমার্স ও এফ-কমার্স: ডেলিভারি প্রতারণা ও গ্রাহক আস্থার ভাঙন - দায় কার, সমাধান কী?
ই-কমার্স ও এফ-কমার্স: ডেলিভারি প্রতারণা ও গ্রাহক আস্থার ভাঙন - দায় কার, সমাধান কী?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, অনলাইন কেনাকাটায় গ্রাহক আস্থা সংকটের বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে ই-অরেঞ্জ ও ইভ্যালির মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রতারণামূলক কার্যক্রমের জের ধরে। যদিও বড় ...

সম্প্রতি, অনলাইন কেনাকাটায় গ্রাহক আস্থা সংকটের বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে ই-অরেঞ্জ ও ইভ্যালির মতো প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রতারণামূলক কার্যক্রমের জের ধরে। যদিও বড় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তবুও ছোট ও মাঝারি এফ-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোতে ডেলিভারি প্রতারণার ঘটনা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলস্বরূপ, ২০২৩ সালের শেষ প্রান্তিকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে পণ্য ডেলিভারি সংক্রান্ত অভিযোগের সংখ্যা পূর্ববর্তী প্রান্তিকের তুলনায় প্রায় ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে অর্ধেকের বেশি অভিযোগ ছিল ভুল পণ্য ডেলিভারি অথবা পণ্য ডেলিভারি না হওয়ার বিষয়ে। এই পরিস্থিতি একদিকে যেমন সাধারণ ক্রেতাদের মধ্যে অনলাইন কেনাকাটার প্রতি অনীহা তৈরি করছে, তেমনি অন্যদিকে ডিজিটাল অর্থনীতির সম্ভাবনাময় প্রসারকেও বাধাগ্রস্ত করছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই আস্থার ভাঙনের দায় কার এবং এর সমাধানই বা কী?

বাংলাদেশের উদীয়মান ই-কমার্স ও এফ-কমার্স খাতে ডেলিভারি প্রতারণা এখন একটি গভীর ক্ষত। শুধুমাত্র পণ্য ডেলিভারি না হওয়া বা ভুল পণ্য সরবরাহই নয়, অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের পণ্য উচ্চমূল্যে বিক্রি, অগ্রিম অর্থ পরিশোধের পর বিক্রেতার উধাও হয়ে যাওয়া, এবং মিথ্যা অফারের মাধ্যমে গ্রাহক আকৃষ্ট করার মতো ঘটনাও ঘটছে। বিশেষ করে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম-নির্ভর এফ-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোয় তদারকির অভাবে এই ধরনের ঘটনা বেশি ঘটছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত 'ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১' থাকা সত্ত্বেও, এর কার্যকর প্রয়োগের অভাবে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। নির্দেশিকায় পণ্য ডেলিভারির সময়সীমা, মূল্য ফেরতের প্রক্রিয়া এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও, ছোট পরিসরের এফ-কমার্স উদ্যোক্তারা প্রায়শই এই নিয়মকানুন মেনে চলেন না, যা গ্রাহকদের ভোগান্তির মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অব্যবস্থাপনা দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিতে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, কারণ বিনিয়োগকারীরা একটি অস্থিতিশীল ও অনিরাপদ বাজার ব্যবস্থায় অর্থলগ্নি করতে দ্বিধা বোধ করেন।

এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলোর দুর্বল সমন্বয় এবং আইনি জটিলতা। বাংলাদেশ ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (BFIU) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) যদিও অর্থ পাচার ও বিনিয়োগ সুরক্ষায় কাজ করে, কিন্তু ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোর মাধ্যমে গ্রাহকের অর্থ আত্মসাৎ বা প্রতারণার ক্ষেত্রে তাদের দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রায়শই দেখা যায় না। উদাহরণস্বরূপ, বহু ক্ষেত্রে গ্রাহকের অভিযোগের প্রেক্ষিতে তদন্ত শুরু হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়, ততদিনে প্রতারক তার কার্যক্রম গুটিয়ে নিতে সক্ষম হয়। সেন্ট্রাল ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) তাদের এক গবেষণায় উল্লেখ করেছে যে, ই-কমার্স খাতের জন্য একটি একক, শক্তিশালী ও সমন্বিত রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্কের অভাব রয়েছে, যা বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে দায়িত্বের বিভাজন তৈরি করেছে এবং সামগ্রিক তদারকিকে দুর্বল করে দিয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) যদিও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে রাজস্ব আদায়ে আগ্রহী, তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি এফ-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধন ও ট্যাক্সেশনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া এখনো জটিল ও অস্পষ্ট, যার সুযোগ নিয়ে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে গ্রাহক আস্থা পুনরুদ্ধার এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

বছর ই-কমার্স ও এফ-কমার্স খাতে ভোক্তা অভিযোগ (সংখ্যা) অভিযোগের ধরণ সফলভাবে নিষ্পত্তি (%)
২০২০ ১,১২৫ পণ্য ডেলিভারি না হওয়া (৬০%), ভুল পণ্য (২৫%), মূল্য ফেরত (১৫%) ৭২%
২০২১ ৩,৪৫০ পণ্য ডেলিভারি না হওয়া (৬৫%), ভুল পণ্য (২০%), মূল্য ফেরত (১৫%) ৬১%
২০২২ ৬,৭৮০ পণ্য ডেলিভারি না হওয়া (৭০%), ভুল পণ্য (১৮%), মূল্য ফেরত (১২%) ৪৮%
২০২৩ ১০,৫০০ পণ্য ডেলিভারি না হওয়া (৭৫%), ভুল পণ্য (১৫%), মূল্য ফেরত (১০%) ৩৫%

উৎস: জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়

সুপারিশ

  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে 'ডিজিটাল কমার্স পরিচালনা নির্দেশিকা ২০২১'-এর বাস্তবায়ন ও প্রয়োগ জোরদার করতে হবে, বিশেষ করে এফ-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য একটি সহজ কিন্তু বাধ্যতামূলক নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালু করতে হবে, যা তাদের কার্যক্রমের উপর নজরদারি বাড়াবে এবং গ্রাহকদের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে দিতে হবে।
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC)-কে সমন্বিতভাবে একটি 'ডিজিটাল কমার্স রেগুলেটরি অথরিটি' গঠন করতে হবে, যা ই-কমার্স ও এফ-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক লেনদেন, ব্যবসা মডেল এবং গ্রাহক সুরক্ষা সংক্রান্ত সকল বিষয় তদারকি করবে এবং প্রতারণার ক্ষেত্রে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নিশ্চিত করবে।
  • এক্সপোর্ট প্রমোশন ব্যুরো (EPB) ও সেন্ট্রাল ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর যৌথ উদ্যোগে ই-কমার্স ও এফ-কমার্স খাতের জন্য একটি 'গ্রাহক আস্থা সূচক' (Consumer Trust Index) তৈরি করতে হবে, যা নিয়মিতভাবে প্রকাশিত হবে এবং এর ভিত্তিতে প্ল্যাটফর্মগুলোর রেটিং প্রদান করা হবে, যাতে গ্রাহকরা নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য কিনতে পারেন এবং অসাধু ব্যবসায়ীরা বাজার থেকে ছিটকে পড়ে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ইমরান খান

ইমরান খান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ই-কমার্স, এফ-কমার্স ও ডিজিটাল রিটেইল। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator