প্রত্যন্ত অঞ্চলে টেলিমেডিসিন: ইন্টারনেট অবকাঠামোর চ্যালেঞ্জ ও সমাধান | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

প্রত্যন্ত অঞ্চলে টেলিমেডিসিন: ইন্টারনেট অবকাঠামোর চ্যালেঞ্জ ও সমাধান

ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা  avatar   
ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা
প্রত্যন্ত অঞ্চলে টেলিমেডিসিন: ইন্টারনেট অবকাঠামোর চ্যালেঞ্জ ও সমাধান
প্রত্যন্ত অঞ্চলে টেলিমেডিসিন: ইন্টারনেট অবকাঠামোর চ্যালেঞ্জ ও সমাধান
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত 'ডিজিটাল বাংলাদেশ এনাবলমেন্ট প্রজেক্ট'-এর সর্বশেষ অগ্রগতি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের...

সম্প্রতি, বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত 'ডিজিটাল বাংলাদেশ এনাবলমেন্ট প্রজেক্ট'-এর সর্বশেষ অগ্রগতি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রায় ৪০% স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র এখনো নিরবচ্ছিন্ন উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগের অভাবে টেলিমেডিসিন পরিষেবা প্রদানে হিমশিম খাচ্ছে, যা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিশেষত, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট ও বান্দরবানের মতো জেলাগুলোর দুর্গম পাহাড়ি ও চরাঞ্চলে অবস্থিত কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো প্রায়শই ধীরগতির ইন্টারনেট বা সম্পূর্ণ সংযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সঙ্গে রোগীদের সরাসরি ভার্চুয়াল যোগাযোগ স্থাপন করতে পারছে না। এই প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, গত তিন বছরে টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্মগুলোর ব্যবহার শহরকেন্দ্রিক বৃদ্ধি পেলেও, গ্রামীণ এলাকায় এর প্রসার কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি, যা স্বাস্থ্যখাতে ডিজিটাল বিভাজন আরও প্রকট করে তুলছে।

এই ডিজিটাল বিভাজনের মূলে রয়েছে দুর্বল ইন্টারনেট অবকাঠামো। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের অপ্রতুলতা এবং মোবাইল নেটওয়ার্কের দুর্বল কভারেজ টেলিমেডিসিনের প্রসারে প্রধান অন্তরায়। বাংলাদেশ সরকার 'ইনফো-সরকার ৩য় পর্যায়' প্রকল্পের আওতায় দেশের ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত ফাইবার অপটিক কেবল সংযোগ পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিলেও, অনেক ক্ষেত্রেই শেষ মাইলে (last mile) সংযোগ স্থাপন এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে, প্রত্যন্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে স্থাপন করা টেলিমেডিসিন কিট ও কম্পিউটারগুলো প্রায়শই অব্যবহৃত থেকে যায়। শুধু সংযোগের অভাবই নয়, বিদ্যমান সংযোগগুলোর মানও প্রশ্নবিদ্ধ। কম ব্যান্ডউইথ এবং উচ্চ লেটেন্সি (latency) ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণের ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক যখন দূরবর্তী কোনো রোগীর রোগ নির্ণয়ের জন্য উচ্চ-রেজোলিউশনের ছবি বা ভিডিও বিশ্লেষণ করতে চান, তখন দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগের কারণে তা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, যা ভুল রোগ নির্ণয় বা বিলম্বিত চিকিৎসার ঝুঁকি বাড়ায়। এই সমস্যা সমাধানে স্থানীয় পর্যায়ে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের (ISP) সাথে সমন্বয় এবং তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির উপর জোর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ অর্থায়নে পরিচালিত 'হেলথ সেক্টর সাপোর্ট প্রোগ্রাম' (HSSP)-এর আওতায় বেশ কিছু টেলিমেডিসিন পাইলট প্রকল্প গ্রহণ করা হলেও, টেকসই ইন্টারনেট অবকাঠামোর অভাবে সেগুলোর কার্যকারিতা সীমিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, রংপুর ও সিলেট বিভাগের কিছু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে টেলিমেডিসিন ইউনিট স্থাপন করা হলেও, বিদ্যুতের ঘন ঘন বিভ্রাট এবং ইন্টারনেট সংযোগের অস্থিতিশীলতার কারণে বেশিরভাগ সময়ই সেগুলো চালু রাখা সম্ভব হয় না। উপরন্তু, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপনের ব্যয়ভার এবং এর রক্ষণাবেক্ষণের উচ্চ খরচ বেসরকারি টেলিযোগাযোগ সংস্থাগুলোর জন্য বাণিজ্যিক দিক থেকে লাভজনক না হওয়ায় তারা সেখানে বিনিয়োগে অনীহা প্রকাশ করে। এর ফলস্বরূপ, সরকারি উদ্যোগই একমাত্র ভরসা হলেও, এক্ষেত্রে সমন্বিত ও সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অভাব পরিলক্ষিত হয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে শক্তিশালী সমন্বয় ব্যতীত এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন। এই চ্যালেঞ্জ উত্তরণে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট বা লো-আর্থ অরবিট (LEO) স্যাটেলাইট প্রযুক্তির মতো বিকল্প সমাধানগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে, যা প্রথাগত ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে সহায়ক হতে পারে। তবে, এক্ষেত্রে প্রাথমিক বিনিয়োগের উচ্চতা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।

প্রকল্প/সূচক ২০২০ ২০২১ ২০২২ ২০২৩
গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ (শতাংশ) ১২% ১৫% ১৮% ২২%
টেলিমেডিসিন ব্যবহারকারী বৃদ্ধি (গ্রামীণ এলাকা, মিলিয়ন) ০.২ ০.৩৫ ০.৬ ০.৯
টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্মে ডাক্তারের নিবন্ধীকরণ (সংখ্যা) ১,২০০ ১,৮৫০ ২,৭০০ ৩,৮০০
ওয়ার্ল্ড ব্যাংক 'ডিজিটাল বাংলাদেশ এনাবলমেন্ট' প্রকল্পের আওতাভুক্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্র (সংখ্যা) ১০০ ১৫০ ২০০ ২২০

উৎস: বিশ্বব্যাংক, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (BTRC)

সুপারিশ

  • ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে যৌথভাবে একটি 'জাতীয় টেলিমেডিসিন ইন্টারনেট ইনফ্রাস্ট্রাকচার মাস্টারপ্ল্যান' প্রণয়ন করতে হবে। এই মহাপরিকল্পনায় দেশের প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং কমিউনিটি ক্লিনিককে আগামী তিন বছরের মধ্যে উচ্চগতির ফাইবার অপটিক বা বিকল্প স্যাটেলাইট ইন্টারনেট (যেমন Starlink বা অনুরূপ LEO সেবা) সংযোগের আওতায় আনার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (BTRC) এই সংযোগের মান ও গতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবে এবং বেসরকারি অপারেটরদের জন্য প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিনিয়োগে প্রণোদনা প্যাকেজ (যেমন কর ছাড় বা ভর্তুকি) ঘোষণা করবে।
  • বাংলাদেশ সরকার, বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর যৌথ অর্থায়নে 'প্রত্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা ডিজিটালকরণ তহবিল' (Remote Healthcare Digitization Fund) গঠন করতে হবে। এই তহবিলের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ (সোলার প্যানেল ও ব্যাটারি ব্যাকআপ সিস্টেম), উচ্চমানের টেলিমেডিসিন সরঞ্জাম ক্রয় এবং স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীদের ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হবে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এই তহবিলের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বচ্ছ নিরীক্ষা প্রক্রিয়া চালু করবে।
  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে 'ইনফেকশাস ডিজিজ হসপিটালস অ্যান্ড হেলথ সার্ভিসেস ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট' প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং জেলা সদর হাসপাতালে একটি করে 'টেলিমেডিসিন রেফারেল হাব' (Telemedicine Referral Hub) স্থাপন করতে হবে। এই হাবগুলো প্রত্যন্ত অঞ্চলের কমিউনিটি ক্লিনিক ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর সাথে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ স্থাপন করবে এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পরামর্শ ও নির্দেশনা প্রদানে সক্ষম হবে। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC) এই হাবগুলোর মাধ্যমে প্রদত্ত সেবার মান নিয়ন্ত্রণ ও চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট গাইডলাইন তৈরি করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা

ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: হেলথ-টেক ও টেলিমেডিসিন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

कोई टिप्पणी नहीं मिली


News Card Generator