বৈশ্বিক অভিবাসন ও শরণার্থী সংকট: শ্রমবাজারের নতুন চাহিদা ও বাংলাদেশের কৌশল | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বৈশ্বিক অভিবাসন ও শরণার্থী সংকট: শ্রমবাজারের নতুন চাহিদা ও বাংলাদেশের কৌশল

রাসেল মাহমুদ  avatar   
রাসেল মাহমুদ
বৈশ্বিক অভিবাসন ও শরণার্থী সংকট: শ্রমবাজারের নতুন চাহিদা ও বাংলাদেশের কৌশল
বৈশ্বিক অভিবাসন ও শরণার্থী সংকট: শ্রমবাজারের নতুন চাহিদা ও বাংলাদেশের কৌশল
ছবি: সংগৃহীত
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) ২০২৩ সালের মাঝামাঝি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিশ্বজুড়ে রেকর্ড সংখ্যক ১১৭ মিলিয়ন বাস্তুচ্যুত মানুষের তথ্য প্রকাশ করেছে, যা ব...

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (UNHCR) ২০২৩ সালের মাঝামাঝি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিশ্বজুড়ে রেকর্ড সংখ্যক ১১৭ মিলিয়ন বাস্তুচ্যুত মানুষের তথ্য প্রকাশ করেছে, যা বৈশ্বিক অভিবাসন ও শরণার্থী সংকটকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। এই সংখ্যা কেবল মানবিক বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দেয় না, বরং বিশ্বজুড়ে শ্রমবাজারের গতিপ্রকৃতি এবং বিভিন্ন দেশের কৌশলগত অবস্থানের ওপরও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলছে। বিশেষত, ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এবং আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা লাখ লাখ মানুষকে তাদের ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য করেছে, যা একদিকে যেমন ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার শ্রমবাজারে নতুন চাপ সৃষ্টি করছে, তেমনি এশিয়া ও আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ উভয়ই নিয়ে আসছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ, দীর্ঘকাল ধরে রোহিঙ্গা সংকটের মতো বৃহৎ শরণার্থী বোঝ বহনকারী একটি দেশ হিসেবে, এই পরিবর্তিত বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তার নিজস্ব কৌশল নির্ধারণে এক জটিল সমীকরণের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।

এই বৈশ্বিক বাস্তুচ্যুতির ঢেউ উন্নত দেশগুলোতে শ্রমিকের ঘাটতি পূরণে এক নতুন চাহিদা তৈরি করেছে, বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, নির্মাণ, কৃষি এবং প্রযুক্তি খাতে। জার্মানি, কানাডা এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো তাদের অভিবাসন নীতিমালায় নমনীয়তা এনে দক্ষ ও আধা-দক্ষ কর্মীদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে। উদাহরণস্বরূপ, জার্মানি তার নতুন অভিবাসন আইনে পয়েন্ট-ভিত্তিক সিস্টেম চালু করেছে, যা নির্দিষ্ট দক্ষতার অধিকারী অভিবাসীদের জন্য পথ সুগম করছে। অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের তেল-সমৃদ্ধ দেশগুলো, যেমন সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত, তাদের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প এবং পরিষেবা খাতের জন্য বিপুল সংখ্যক বিদেশি শ্রমিকের উপর নির্ভরশীল। তবে, এই চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে শুধু জনশক্তি রপ্তানিই একমাত্র সমাধান নয়, বরং এক্ষেত্রে অভিবাসীদের অধিকার সুরক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সমন্বয় অপরিহার্য। বাংলাদেশ, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জনশক্তি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে, তার প্রবাসীদের রেমিটেন্সের মাধ্যমে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কিন্তু, এই বৈশ্বিক সংকটে শুধু প্রচলিত শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণ করলেই হবে না, বরং নতুন শ্রমবাজারের সুযোগগুলো চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী কর্মীদের প্রস্তুত করতে হবে। বিশেষত, সবুজ অর্থনীতি (Green Economy) এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে (Digital Economy) যে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের কর্মীদের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ।

বাংলাদেশের জন্য এই পরিস্থিতি একই সাথে চ্যালেঞ্জ ও সুযোগের দ্বার খুলে দিয়েছে। একদিকে, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দীর্ঘমেয়াদী বোঝা দেশের অর্থনীতি ও পরিবেশের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। প্রায় ১.৩ মিলিয়ন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী কক্সবাজারের শিবিরে আশ্রয় নিয়ে আছে, যাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া মন্থর। এই মানবিক সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উপর নির্ভরশীল, এবং এক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আরও সক্রিয় কূটনীতি পরিচালনা করতে হচ্ছে। অন্যদিকে, UN Peacekeeping মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের সফল অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক মহলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে এবং ভবিষ্যতে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির ক্ষেত্রে এটি একটি শক্তিশালী ভিত্তি হতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের সেনারা যে অবদান রাখছে, তা তাদের শৃঙ্খলা, পেশাদারিত্ব এবং মানবিকতার স্বাক্ষর বহন করে। এই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ নতুন শ্রমবাজার, বিশেষ করে নিরাপত্তা ও লজিস্টিকস খাতে, প্রবেশ করতে পারে। এছাড়া, BIMSTEC এবং সার্ক-এর মতো আঞ্চলিক ফোরামে অভিবাসন ও শরণার্থী সংক্রান্ত বিষয়ে সমন্বিত নীতি গ্রহণের জন্য বাংলাদেশের জোরালো ভূমিকা রাখা উচিত, যাতে এই অঞ্চলের দেশগুলো সম্মিলিতভাবে বৈশ্বিক শ্রমবাজারের সুবিধা নিতে পারে এবং অনিয়মিত অভিবাসন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে। শ্রমবাজারের বহুমুখীকরণ এবং কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে বাংলাদেশ কেবল রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়াতে পারবে না, বরং আন্তর্জাতিক অভিবাসন ব্যবস্থায় একটি সম্মানজনক ও প্রভাবশালী অবস্থানে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

বছর বৈশ্বিক বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা (মিলিয়নে) বাংলাদেশের রেমিটেন্স আয় (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) UN Peacekeeping এ বাংলাদেশের অবদান (সেনা ও পুলিশ সদস্যের সংখ্যা)
২০১৮ ৭০.৮ ১৫.৫ ৬,৭৯৩
২০১৯ ৭৯.৫ ১৮.৩ ৬,৭৩৪
২০২০ ৮২.৪ ২১.৭ ৬,৭৩১
২০২১ ৮৯.৩ ২২.০৭ ৬,৮০৮
২০২২ ১০৮.৪ ২১.৬১ ৭,২৬৪
২০২৩ (মধ্যবর্তী) ১১৭.০ ২১.৯২* ৭,৪০০*

উৎস: UNHCR Global Trends Report, বাংলাদেশ ব্যাংক, UN Peacekeeping Operations Statistics (*২০২৩ সালের তথ্য আনুমানিক বা প্রাক্কলিত)

সুপারিশ

  • পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে নেতৃত্ব দিয়ে একটি 'ন্যাশনাল টাস্কফোর্স অন মাইগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি স্টাডিজ' গঠন করা উচিত, যেখানে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এই টাস্কফোর্সকে বৈশ্বিক শ্রমবাজারের নতুন চাহিদাগুলো (যেমন- সবুজ প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বাস্থ্যসেবা) চিহ্নিত করতে এবং সে অনুযায়ী কর্মীদের দক্ষতা প্রশিক্ষণের জন্য একটি জাতীয় কৌশলপত্র (National Skill Development Strategy for Global Market) প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া উচিত।
  • BIMSTEC এবং সার্ক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বাংলাদেশ আঞ্চলিক অভিবাসন নীতি এবং শরণার্থী প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরির প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারে। এর অংশ হিসেবে, 'BIMSTEC/SAARC মাইগ্রেশন অ্যান্ড রিফিউজি প্রোটোকল' নামে একটি নতুন চুক্তি বা প্রোটোকল প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে, যা এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে শ্রম অভিবাসন সুগম করবে এবং শরণার্থী সংকটের মানবিক দিকগুলো মোকাবিলায় যৌথ পদক্ষেপ নিশ্চিত করবে।
  • জাতিসংঘের অধীনে পরিচালিত UN Peacekeeping মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জাতিসংঘে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা উচিত যেন শান্তিরক্ষা মিশনের অবসরের পর বাংলাদেশি সেনাদের জন্য বিভিন্ন দেশে নিরাপত্তা, লজিস্টিকস এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা খাতে কর্মসংস্থানের একটি বিশেষ কোটা বা অগ্রাধিকারমূলক ব্যবস্থা তৈরি করা হয়। এর ফলে, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তির জন্য একটি নতুন ও স্থিতিশীল বৈশ্বিক শ্রমবাজার তৈরি হবে এবং তাদের অর্জিত দক্ষতা বিশ্বব্যাপী কাজে লাগানো যাবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রাসেল মাহমুদ

রাসেল মাহমুদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বৈশ্বিক অভিবাসন ও শরণার্থী সংকট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Keine Kommentare gefunden


News Card Generator