চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান: এআই'র উত্থানে পোশাক শিল্পের… | আই নিউজ বিডি

চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান: এআই'র উত্থানে পোশাক শিল্পের শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ

আরিফুর রহমান  avatar   
আরিফুর রহমান
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান: এআই'র উত্থানে পোশাক শিল্পের শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ
চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান: এআই'র উত্থানে পোশাক শিল্পের শ্রমবাজারের ভবিষ্যৎ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত পাঁচ বছরে পোশাক শিল্পে স্বয়ংক্রিয়তার হার...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত পাঁচ বছরে পোশাক শিল্পে স্বয়ংক্রিয়তার হার ১০% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং রোবোটিক্সের ক্রমবর্ধমান ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়। এই প্রবণতা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রভাবে বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি খাত, পোশাক শিল্পে কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষত, এআই-চালিত রোবট ও স্বয়ংক্রিয় মেশিনগুলো উৎপাদন প্রক্রিয়ায় দক্ষতা বৃদ্ধি করলেও, প্রচলিত শ্রমনির্ভর কর্মসংস্থানগুলোতে এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে, যা লাখ লাখ শ্রমিকের জীবন-জীবিকাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।

এআই এবং স্বয়ংক্রিয়তার এই উত্থান পোশাক শিল্পের উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, কিন্তু একই সাথে শ্রমিকদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের প্রায় ৬০% কর্মী, বিশেষ করে সেলাই, কাটিং ও ফিনিশিংয়ের মতো পুনরাবৃত্তিমূলক কাজে নিয়োজিতরা, আগামী এক দশকে স্বয়ংক্রিয়তার কারণে তাদের চাকরি হারাতে পারেন। এই পরিস্থিতিতে, শ্রমশক্তির দক্ষতা পুনর্গঠন এবং নতুন প্রযুক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। বাংলাদেশ জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি-২০২২' প্রণয়ন করেছে, যেখানে এআই ও রোবোটিক্স সম্পর্কিত নতুন দক্ষতা প্রশিক্ষণের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে, এই নীতিমালার বাস্তবায়ন এবং তৃণমূল পর্যায়ে এর প্রভাব পৌঁছানো এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশ্বব্যাংকের একটি সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রভাবে পোশাক শিল্পে নতুন ধরনের কাজের সুযোগও সৃষ্টি হচ্ছে, যেমন রোবট রক্ষণাবেক্ষণ, ডেটা অ্যানালাইসিস এবং সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্টে এআই ইন্টিগ্রেশন। এই নতুন কাজের জন্য উচ্চতর প্রযুক্তিগত দক্ষতা প্রয়োজন, যা বর্তমান শ্রমশক্তির একটি বড় অংশের মধ্যে অনুপস্থিত। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) দেশের প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের উপযোগী নতুন কারিকুলাম প্রণয়নে নির্দেশনা দিয়েছে, যেখানে এআই, মেশিন লার্নিং এবং রোবোটিক্সকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে, এই কারিকুলামের সুফল পেতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং পর্যাপ্ত বিনিয়োগ প্রয়োজন। পাশাপাশি, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এর অধীনে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোতেও এআই-ভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নের কোর্স চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা মধ্যম সারির প্রযুক্তিবিদ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।

প্রতিষ্ঠানের নাম ভূমিকা উদ্যোগ/প্রকল্প প্রভাবিত সম্ভাব্য শ্রমিক (পোশাক শিল্প) লক্ষ্যমাত্রা/অর্জন
NSDA জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি ও কৌশল প্রণয়ন জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি-২০২২ পুনঃপ্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থান ২০৩০ সালের মধ্যে ৫ মিলিয়ন কর্মীকে দক্ষ করা
UGC উচ্চশিক্ষা কারিকুলাম আধুনিকীকরণ এআই, রোবোটিক্স বিষয়ে নতুন কোর্স চালু নতুন প্রযুক্তিনির্ভর উচ্চপদস্থ চাকরি ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে এআই ল্যাব স্থাপন
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্প্রসারণ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে এআই/রোবোটিক্স মডিউল মধ্যম সারির প্রযুক্তিবিদ ও সুপারভাইজার ২০২৫ সালের মধ্যে ১ লক্ষ কারিগরি শিক্ষার্থীকে এআই দক্ষতা প্রদান
BANBEIS শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান শিক্ষা তথ্য ব্যবস্থাপনা সিস্টেম (EMIS) দক্ষতা ব্যবধান চিহ্নিতকরণ ও নীতি প্রণয়ন ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে কারিগরি শিক্ষায় ২০% শিক্ষার্থী বৃদ্ধি
SEIP (Skills for Employment Investment Program) শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়ন পোশাক শিল্পের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ মডিউল স্বয়ংক্রিয়তা দ্বারা প্রভাবিত শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি ২০২৪ সালের মধ্যে ১.৫ মিলিয়ন কর্মীর দক্ষতা উন্নয়ন

উৎস: NSDA বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২২-২৩), UGC বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২২), কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ডেটা (২০২৩), BANBEIS শিক্ষা পরিসংখ্যান (২০২৩), SEIP প্রকল্প মূল্যায়ন প্রতিবেদন (২০২৩)।

সুপারিশ

  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) কর্তৃক প্রণীত 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি-২০২২' এর অধীনে পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের জন্য এআই এবং রোবোটিক্স সম্পর্কিত বিশেষায়িত 'দক্ষতা পুনঃপ্রশিক্ষণ মডিউল' চালু করা হোক, যেখানে বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ-কে সরাসরি অংশীদার করে প্রশিক্ষণের মান ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে।
  • বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এর যৌথ উদ্যোগে পোশাক শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী একটি 'জাতীয় এআই ও রোবোটিক্স কারিকুলাম ফ্রেমওয়ার্ক' তৈরি করা হোক, যা দেশের সকল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট এবং নির্বাচিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং এর জন্য SEIP (Skills for Employment Investment Program) এর মাধ্যমে পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত করা হোক।
  • BANBEIS (বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো)-কে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রভাবে শ্রমবাজারের পরিবর্তন সম্পর্কিত নিয়মিত 'শ্রমশক্তি চাহিদা ও সরবরাহ বিশ্লেষণ প্রতিবেদন' প্রকাশের জন্য নির্দেশ দেওয়া হোক, যা সরকার এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান নীতি ও প্রশিক্ষণের কৌশল নির্ধারণে সহায়তা করবে এবং প্রতি ছয় মাস অন্তর এই প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করা হোক।

✍️ নিবন্ধ লেখক: আরিফুর রহমান

আরিফুর রহমান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No comments found


News Card Generator