গ্রামীণ ব্রডব্যান্ড: ডিজিটাল বিভাজন ঘুচাতে সংযোগের শেষ মাইল | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

গ্রামীণ ব্রডব্যান্ড: ডিজিটাল বিভাজন ঘুচাতে সংযোগের শেষ মাইল

কামরুল হাসান  avatar   
কামরুল হাসান
গ্রামীণ ব্রডব্যান্ড: ডিজিটাল বিভাজন ঘুচাতে সংযোগের শেষ মাইল
গ্রামীণ ব্রডব্যান্ড: ডিজিটাল বিভাজন ঘুচাতে সংযোগের শেষ মাইল
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটির কাছা...

সম্প্রতি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটির কাছাকাছি পৌঁছালেও, এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো শহরাঞ্চল-কেন্দ্রিক। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইন্টারনেট সংযোগের হার তুলনামূলকভাবে কম, যা দেশের সার্বিক ডিজিটাল রূপান্তরের পথে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষত, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের 'শেষ মাইল' পর্যন্ত সংযোগ পৌঁছে দেওয়া এখনো একটি জটিল প্রক্রিয়া, যার সমাধান না হলে ডিজিটাল বিভাজন আরও প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। এই প্রেক্ষিতে, গ্রামীণ ব্রডব্যান্ডের সম্প্রসারণ এবং এর টেকসই মডেল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা অপরিহার্য।

গ্রামীণ ব্রডব্যান্ডের এই চ্যালেঞ্জ মূলত অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, উচ্চ স্থাপনা ব্যয় এবং কম বাণিজ্যিক সম্ভাবনার কারণে তৈরি হয়েছে। 'ইনফো-সরকার তৃতীয় পর্যায়' প্রকল্পের আওতায় দেশের ইউনিয়ন পর্যায়ে ফাইবার অপটিক ক্যাবল স্থাপন করা হলেও, সেই সংযোগ প্রতিটি গ্রাম বা ব্যবহারকারীর দোরগোড়ায় পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এখনো বিশাল ফারাক বিদ্যমান। অনেক ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পর্যায়ে সংযোগ থাকলেও, গ্রাম বা পাড়া পর্যায়ে ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারীদের জন্য ফাইবার টেনে নিয়ে যাওয়া বা ওয়্যারলেস সলিউশন স্থাপন করা ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়ায়। এর ফলে, গ্রামীণ অঞ্চলে ইন্টারনেট সেবার মান যেমন দুর্বল থাকে, তেমনি এর মূল্যও শহরাঞ্চলের তুলনায় বেশি হয়। ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্ন পূরণে এই ফারাক দূর করা অপরিহার্য, কারণ তথ্যপ্রযুক্তির সুবিধা থেকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে বঞ্চিত রেখে সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এই সমস্যা নিরসনে BTRC এবং ICT Division-এর যৌথ উদ্যোগে বিভিন্ন প্রকল্প চলমান থাকলেও, মাঠ পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন ও তদারকিতে আরও গতি আনা প্রয়োজন।

ডিজিটাল বিভাজনের এই সমস্যা গ্রামীণ অর্থনীতি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাতে সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কোভিড-১৯ মহামারীর সময় যখন অনলাইন শিক্ষা ও দূরশিক্ষণ অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল, তখন গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা পর্যাপ্ত ইন্টারনেট সুবিধার অভাবে পিছিয়ে পড়েছে। একইভাবে, টেলিমেডিসিন বা ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মগুলো গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে পারছে না, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে দুর্বল করছে এবং শহরাঞ্চলের সাথে বৈষম্য বাড়াচ্ছে। BASIS এবং BHTPA এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ডিজিটাল সেবার প্রসারে কাজ করলেও, শেষ মাইল সংযোগের অভাবে তাদের উদ্যোগের পূর্ণ সুফল গ্রামীণ জনগণ পাচ্ছে না। অথচ, গ্রামীণ ব্রডব্যান্ডের সম্প্রসারণ একদিকে যেমন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, তেমনি কৃষিক্ষেত্রে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে সহায়তা করে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, আবহাওয়ার তথ্য, বাজার দর, এবং কৃষি বিষয়ক পরামর্শ অনলাইনে সহজেই পাওয়া গেলে কৃষকরা লাভবান হবেন, যা গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী করবে।

এই সমস্যা সমাধানে ICT Division এবং a2i এর তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন উদ্ভাবনী মডেল নিয়ে কাজ চলছে, যার মধ্যে রয়েছে 'ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার' (UDC) এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবা প্রদান। ফিক্সড ব্রডব্যান্ডের পাশাপাশি মোবাইল ব্রডব্যান্ড (3G, 4G, এবং ভবিষ্যতে 5G) গ্রামীণ এলাকায় শেষ মাইল সংযোগের একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে। তবে, মোবাইল অপারেটরদের জন্য গ্রামীণ অঞ্চলে টাওয়ার স্থাপন এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়বহুল হওয়ায় তারা সব এলাকায় সমানভাবে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হয় না। এক্ষেত্রে, সরকারি ভর্তুকি বা ইনসেনটিভ প্রদানের মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করা যেতে পারে। এছাড়া, কমিউনিটি নেটওয়ার্কিং মডেল, যেখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠী নিজেদের উদ্যোগে ইন্টারনেট অবকাঠামো তৈরি ও পরিচালনা করে, সেটিও গ্রামীণ ব্রডব্যান্ড সম্প্রসারণে একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে। এর পাশাপাশি, BTRC-কে গ্রামীণ এলাকায় সেবার মান এবং মূল্যের উপর কঠোর নজরদারি বজায় রাখতে হবে, যাতে গ্রাহকরা ন্যায্য মূল্যে মানসম্মত সেবা পান।

সূচক ২০১৮ ২০২০ ২০২২ ২০২৩ (সেপ্টেম্বর)
মোট ইন্টারনেট ব্যবহারকারী (কোটি) ৯.১৮ ১১.১২ ১২.৩৪ ১৩.০২
মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী (কোটি) ৮.৫০ ১০.৩৮ ১১.৩১ ১১.৮৭
ফিক্সড ব্রডব্যান্ড ব্যবহারকারী (কোটি) ০.৬৮ ০.৭৪ ১.০৩ ১.১৫
গ্রামীণ ব্রডব্যান্ড কভারেজ (%) (আনুমানিক) ২৫% ৪০% ৫৫% ৬০%

উৎস: বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) এবং ICT Division-এর বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে সংগৃহীত।

সুপারিশ

  • BTRC-কে গ্রামীণ এলাকায় ইন্টারনেট সেবার গুণগত মান নিশ্চিত করতে এবং সেবার মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে একটি সুনির্দিষ্ট রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক প্রণয়ন ও কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, যাতে অপারেটররা ন্যূনতম মানদণ্ড বজায় রাখতে বাধ্য হয়।
  • ICT Division এবং a2i-কে যৌথভাবে 'গ্রাম-ভিত্তিক ব্রডব্যান্ড নেটওয়ার্ক' মডেল প্রবর্তন করতে হবে, যেখানে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে প্রতিটি গ্রামে ফাইবার অপটিক বা উচ্চগতির ওয়্যারলেস সংযোগ পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিশেষ তহবিল (যেমন: ইউনিভার্সাল সার্ভিস অবলিগেশন ফান্ড - USOF) থেকে অনুদান ও প্রশিক্ষণ প্রদান করা হবে।
  • BASIS এবং BHTPA-কে গ্রামীণ ব্রডব্যান্ড অবকাঠামো ব্যবহার করে নতুন ডিজিটাল সেবা ও অ্যাপ্লিকেশন তৈরির জন্য গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) কার্যক্রমে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, এবং গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ইনকিউবেশন প্রোগ্রাম চালু করতে হবে যা স্থানীয় চাহিদার উপর ভিত্তি করে ডিজিটাল সমাধান তৈরি করতে উৎসাহিত করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: কামরুল হাসান

কামরুল হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: টেলিকম, ৫জি ও ইন্টারনেট অবকাঠামো। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

コメントがありません


News Card Generator