পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীনতায় ফাঁক: করপোরেট সুশাসন ও বেনামি ঋণের যোগসূত্র | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীনতায় ফাঁক: করপোরেট সুশাসন ও বেনামি ঋণের যোগসূত্র

অ্যাডভোকেট কায়সার  avatar   
অ্যাডভোকেট কায়সার
পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীনতায় ফাঁক: করপোরেট সুশাসন ও বেনামি ঋণের যোগসূত্র
পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীনতায় ফাঁক: করপোরেট সুশাসন ও বেনামি ঋণের যোগসূত্র
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৪৭টি কোম্পানির পরি...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৪৭টি কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে স্বাধীন পরিচালক নিয়োগে গুরুতর অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে, যেখানে অন্তত ২০ শতাংশ কোম্পানির ক্ষেত্রে স্বাধীন পরিচালকদের পদ শূন্য অথবা তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ। এই পরিস্থিতি শুধু করপোরেট সুশাসনের মৌলিক নীতিগুলোকেই চ্যালেঞ্জ করছে না, বরং বেনামি ঋণ এবং অন্যান্য আর্থিক অসঙ্গতির পথ প্রশস্ত করছে, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি অশনি সংকেত। বিশ্বব্যাংকের ২০১৯ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, দুর্বল করপোরেট সুশাসন প্রচলিত ঋণ বিতরণে স্বচ্ছতার অভাব এবং আর্থিক খাতে খেলাপি ঋণের পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করে, যেখানে স্বাধীন পরিচালকদের অনুপস্থিতি বা নিষ্ক্রিয়তা ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করে। এই ৪৭টি কোম্পানির মধ্যে প্রায় ১৫টির ক্ষেত্রে দেখা গেছে, স্বাধীন পরিচালকরা হয় পরিচালনা পর্ষদের সভায় নিয়মিত অনুপস্থিত থাকেন অথবা তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা পর্ষদের প্রভাবশালী সদস্যদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, যা করপোরেট ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতার মারাত্মক ঘাটতি নির্দেশ করে।

এই দুর্বল করপোরেট কাঠামো এবং স্বাধীন পরিচালকদের কার্যকারিতার অভাব সরাসরি বেনামি ঋণের প্রসারে ইন্ধন যোগাচ্ছে। যখন পর্ষদে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কণ্ঠস্বর অনুপস্থিত থাকে, তখন প্রভাবশালী শেয়ারহোল্ডার বা ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের স্বার্থসিদ্ধির জন্য ঋণ প্রস্তাবগুলো সহজেই অনুমোদিত হয়ে যায়, যার মধ্যে অনেক ক্ষেত্রেই বেনামি ঋণ অন্তর্ভুক্ত থাকে। এই বেনামি ঋণগুলো প্রায়শই এমন সত্তাকে দেওয়া হয় যাদের সাথে পর্ষদের প্রভাবশালী সদস্যদের ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক সম্পর্ক থাকে, কিন্তু ঋণ পরিশোধের ক্ষমতা যাচাই করা হয় না অথবা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) তাদের ২০২১ সালের 'এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক' প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে, বিশেষ করে যেখানে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তদারকি ক্ষমতা সীমিত, সেখানে করপোরেট সুশাসনের দুর্বলতা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে এবং বেনামি লেনদেনের সুযোগ তৈরি করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, এটি স্পষ্ট যে, স্বাধীন পরিচালকদের ভূমিকা কেবল নামমাত্র হওয়ায়, তারা ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তদারকি ও প্রশ্ন উত্থাপন করতে ব্যর্থ হচ্ছেন, যার ফলস্বরূপ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণ পোর্টফোলিওতে অস্বচ্ছতা বাড়ছে এবং খেলাপি ঋণের বোঝা ক্রমশ স্ফীত হচ্ছে। বিশেষ করে, ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদে স্বাধীন পরিচালকদের দুর্বল অবস্থান ঋণ বিতরণের ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং ঋণগ্রহীতাদের প্রকৃত পরিচয় এবং তাদের আর্থিক সক্ষমতা যাচাইয়ে বাধা সৃষ্টি করছে।

বেনামি ঋণের এই সংস্কৃতি কেবল আর্থিক খাতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি সামগ্রিক অর্থনীতিতে বিনিয়োগের পরিবেশকেও কলুষিত করছে। যখন বিনিয়োগকারীরা দেখেন যে, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নেই এবং পর্ষদের স্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে, তখন তারা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ থেকে বিরত থাকেন। এর ফলে নতুন ব্যবসা প্রতিষ্ঠা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক খাতের সংস্কার কর্মসূচিতে করপোরেট সুশাসনকে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, কোম্পানি আইন ১৯৯৪ (সংশোধিত) এবং বিএসইসি'র করপোরেট সুশাসন কোড ২০১৬-তে স্বাধীন পরিচালকদের ভূমিকা ও দায়িত্ব সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হলেও, তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব এবং তাদের কার্যকারিতা নিরীক্ষণে দুর্বলতা রয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, স্বাধীন পরিচালক হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা পর্ষদের চেয়ারম্যান বা প্রধান নির্বাহীর ঘনিষ্ঠ বৃত্তের সদস্য হওয়ায় তাদের পক্ষে স্বাধীনভাবে মতামত দেওয়া বা বিতর্কিত ঋণ প্রস্তাবের বিরোধিতা করা কঠিন হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতি বেনামি ঋণের বিস্তারকে আরও সহজ করে তোলে, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় কোষাগার এবং সাধারণ জনগণের সঞ্চয়ের উপর চাপ সৃষ্টি করে। একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল পুঁজিবাজার এবং আর্থিক খাত গড়ে তোলার জন্য পরিচালনা পর্ষদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং বেনামি ঋণের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য।

প্রতিষ্ঠান/প্রতিবেদন বছর বিষয়বস্তু পরিসংখ্যান/পর্যবেক্ষণ
বিশ্বব্যাংক গবেষণা ২০১৯ দুর্বল করপোরেট সুশাসন ও ঋণ দক্ষিণ এশিয়ায় দুর্বল করপোরেট সুশাসন ২৫% পর্যন্ত খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির কারণ।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) ২০২১ আর্থিক খাতের ঝুঁকি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে করপোরেট সুশাসনের দুর্বলতা আর্থিক খাতের ঝুঁকি ১০-১৫% বৃদ্ধি করেছে।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ২০২৩ স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত ৪৭টি কোম্পানির মধ্যে ২০% কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে স্বাধীন পরিচালক নিয়োগে অনিয়ম বা পদ শূন্যতা।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২২ ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতে মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৩৫% বেনামি বা সন্দেহজনক ঋণ হিসেবে চিহ্নিত।

উৎস: বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB), বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত প্রতিবেদন ও গবেষণা।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং বাংলাদেশ ব্যাংক-কে যৌথভাবে কোম্পানি আইন ১৯৯৪ এবং করপোরেট সুশাসন কোড ২০১৬-এর অধীনে স্বাধীন পরিচালক নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেস তৈরি করে সম্ভাব্য স্বাধীন পরিচালকদের প্যানেল গঠন করা যেতে পারে, যা পর্ষদের প্রভাবশালী সদস্যদের ব্যক্তিগত প্রভাব থেকে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে মুক্ত রাখবে এবং নিয়মিতভাবে তাদের কার্যকারিতা মূল্যায়নের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • বাংলাদেশ সরকার-এর অর্থ মন্ত্রণালয়কে আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন ১৯৯৩ এবং ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১ সংশোধন করে বেনামি ঋণের সংজ্ঞা সুস্পষ্ট করতে হবে এবং বেনামি ঋণ অনুমোদনকারী পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। এক্ষেত্রে, ঋণ অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় স্বাধীন পরিচালকদের ভেটো ক্ষমতা প্রদান এবং তাদের বিরুদ্ধে অনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তির বিধান যুক্ত করা প্রয়োজন।
  • বিশ্বব্যাংক এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর সহায়তায় বাংলাদেশ সরকার-কে একটি স্বাধীন 'করপোরেট সুশাসন নিরীক্ষা ইউনিট' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা নিয়মিতভাবে দেশের সকল তালিকাভুক্ত এবং বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা পর্ষদের কার্যক্রম, বিশেষ করে ঋণ অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং স্বাধীন পরিচালকদের ভূমিকা পর্যালোচনা করবে। এই ইউনিটের নিরীক্ষা প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক করতে হবে যাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: অ্যাডভোকেট কায়সার

অ্যাডভোকেট কায়সার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: করপোরেট গভর্ন্যান্স ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Hiçbir yorum bulunamadı


News Card Generator