কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কর্পোরেট উদ্যোগ: দায়বদ্ধতা না ব্যবসায়িক কৌশল? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কর্পোরেট উদ্যোগ: দায়বদ্ধতা না ব্যবসায়িক কৌশল?

শারমিন সুলতানা  avatar   
শারমিন সুলতানা
কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কর্পোরেট উদ্যোগ: দায়বদ্ধতা না ব্যবসায়িক কৌশল?
কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কর্পোরেট উদ্যোগ: দায়বদ্ধতা না ব্যবসায়িক কৌশল?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) তাদের এক প্রতিবেদনে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বছরে প্রায়...

সম্প্রতি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) তাদের এক প্রতিবেদনে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বছরে প্রায় ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার উৎপাদনশীলতা হ্রাস ঘটাচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশেও কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় উদ্যোগী হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, এই উদ্যোগগুলো কি কেবল কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ, নাকি এটি একটি সুদূরপ্রসারী ব্যবসায়িক কৌশল? ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত শীর্ষস্থানীয় একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান, যারা কর্মীদের জন্য নিয়মিত কাউন্সেলিং সেশন, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট ওয়ার্কশপ এবং মানসিক স্বাস্থ্য বীমার মতো সুবিধা চালু করেছে, তাদের সাম্প্রতিক বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, এই উদ্যোগগুলোর ফলে কর্মীদের কর্মতৃপ্তি প্রায় ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে এবং টার্নওভার রেট ৬% কমেছে। এটি স্পষ্টতই ইঙ্গিত দেয় যে, মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা কেবল মানবিক দায়িত্ব নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের লাভজনকতা ও স্থিতিশীলতার জন্যও অপরিহার্য।

ঐতিহ্যগতভাবে, বাংলাদেশের কর্পোরেট জগৎ কর্মীদের শারীরিক স্বাস্থ্যের প্রতি যতটা মনোযোগী ছিল, মানসিক স্বাস্থ্যকে ততটা গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রায়শই ব্যক্তিগত সমস্যা হিসেবে দেখা হতো, যা কর্মক্ষেত্রের আলোচনার বাইরে ছিল। তবে, কোভিড-১৯ মহামারী পরিস্থিতি এই ধারণায় পরিবর্তন এনেছে। লকডাউন, কাজের চাপ বৃদ্ধি, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা এবং ব্যক্তিগত জীবনে সৃষ্ট চ্যালেঞ্জগুলো কর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং বার্নআউটের প্রকোপ বাড়িয়ে দিয়েছে। একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, মহামারীর সময় বাংলাদেশের কর্মজীবীদের মধ্যে প্রায় ৪০% কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগেছেন, যা পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। এই পরিস্থিতি কর্পোরেট নেতৃত্বকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান বুঝতে পারছে যে, একজন মানসিকভাবে সুস্থ কর্মী কেবল বেশি উৎপাদনশীলই নন, বরং তিনি প্রতিষ্ঠানের প্রতি অধিক অনুগত এবং উদ্ভাবনীও বটে। কর্মপরিবেশে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়ক সংস্কৃতি গড়ে তোলা এখন আর ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকার জন্য একটি অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এই পরিবর্তনশীল বাস্তবতায়, সরকারি প্রতিষ্ঠান ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যদিও বাংলাদেশে এখনো কর্মক্ষেত্রের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো আইন বা নীতি নেই, তবে বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়ন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরোক্ষভাবে এই বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। উদাহরণস্বরূপ, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) তাদের বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে soft skill ও জীবনমুখী শিক্ষার উপর জোর দিচ্ছে, যেখানে মানসিক চাপ মোকাবেলা এবং কর্মক্ষেত্রে সুস্থ সম্পর্ক বজায় রাখার মতো বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত। যদিও NSDA সরাসরি কর্পোরেট মানসিক স্বাস্থ্য হস্তক্ষেপ করে না, তাদের প্রশিক্ষিত কর্মীরা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করে একটি ইতিবাচক পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। একইভাবে, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং SEIP (Skills for Employment Investment Program) তাদের প্রশিক্ষণে এমন উপাদান অন্তর্ভুক্ত করছে যা কর্মীদের কেবল প্রযুক্তিগত দক্ষতা নয়, বরং মানসিক স্থিতিশীলতা ও কর্মক্ষেত্রে অভিযোজন ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। এটি দীর্ঘমেয়াদে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মানসিকভাবে স্থিতিশীল কর্মী তৈরিতে সহায়ক হবে। এই উদ্যোগগুলো কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি আরও যত্নশীল হতে উৎসাহিত করছে, যা শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের আর্থিক পারফরম্যান্সেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বছর মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রদানকারী কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা (শতাংশ) কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য জনিত অনুপস্থিতি (গড় দিন) কর্মীদের টার্নওভার হার (শতাংশ)
২০১৮ ১২% ৮.৫ ১৮.৩%
২০১৯ ১৫% ৭.৮ ১৬.৯%
২০২০ ২২% ৯.২ ২০.১%
২০২১ ৩৫% ৬.৫ ১৪.৫%
২০২২ ৫২% ৪.৯ ১১.২%

উৎস: বাংলাদেশ এমপ্লয়ি ওয়েলবিং সার্ভে, ২০২২ (বেসরকারি গবেষণা সংস্থা কর্তৃক পরিচালিত)

সুপারিশ

  • সরকারের উচিত কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সুনির্দিষ্ট আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করা, যা আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-এর কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কিত নির্দেশিকা অনুসরণ করবে। এই আইনে প্রতিটি কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানে একজন লাইসেন্সপ্রাপ্ত মানসিক স্বাস্থ্য পেশাজীবী নিয়োগ অথবা নিয়মিত কাউন্সেলিং সেবার ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে।
  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-এর উচিত তাদের কারিকুলামে 'কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতা' একটি বাধ্যতামূলক মডিউল হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা। এই মডিউলে স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট, কর্ম-জীবনের ভারসাম্য এবং সহকর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা চিহ্নিতকরণের মতো বিষয়গুলো শেখানো যেতে পারে, যা UGC-এর তত্ত্বাবধানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পাঠ্যক্রমেও সংযুক্ত করা সম্ভব।
  • BANBEIS-এর মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা ও প্রাথমিক সহায়তা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত, যাতে তারা শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার প্রাথমিক লক্ষণগুলো সনাক্ত করতে পারেন এবং প্রয়োজনে সঠিক রেফারেল দিতে পারেন। দীর্ঘমেয়াদে এটি কর্মক্ষেত্রে প্রবেশকারী কর্মীদের মানসিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি তৈরি করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শারমিন সুলতানা

শারমিন সুলতানা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: কর্পোরেট লিডারশিপ ও এইচআর। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Комментариев нет


News Card Generator