মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি ও রয়্যালটি রাইটস: ফেইসবুক-ইউটিউবে শিল্পীর অধিকার আদায়ের সংগ্রাম | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি ও রয়্যালটি রাইটস: ফেইসবুক-ইউটিউবে শিল্পীর অধিকার আদায়ের সংগ্রাম

রকিবুল ইসলাম  avatar   
রকিবুল ইসলাম
মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি ও রয়্যালটি রাইটস: ফেইসবুক-ইউটিউবে শিল্পীর অধিকার আদায়ের সংগ্রাম
মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি ও রয়্যালটি রাইটস: ফেইসবুক-ইউটিউবে শিল্পীর অধিকার আদায়ের সংগ্রাম
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, ২০২৩ সালের শেষ প্রান্তিকে বাংলাদেশে ইউটিউবের মাধ্যমে অর্জিত রয়্যালটি আয়ের মাত্র ৭.৫% সরাসরি শিল্পীদের কাছে পৌঁছেছে বলে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি বডিগুলো...

সম্প্রতি, ২০২৩ সালের শেষ প্রান্তিকে বাংলাদেশে ইউটিউবের মাধ্যমে অর্জিত রয়্যালটি আয়ের মাত্র ৭.৫% সরাসরি শিল্পীদের কাছে পৌঁছেছে বলে মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি বডিগুলোর প্রাথমিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। এই পরিসংখ্যান দেশের সঙ্গীত শিল্পে রয়্যালটি বিতরণের ক্ষেত্রে চলমান সংকট এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে শিল্পীদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের দীর্ঘকালীন সংগ্রামের এক নতুন চিত্র তুলে ধরেছে। বিশেষ করে ফেসবুক ও ইউটিউবের মতো বৃহৎ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো থেকে সৃষ্ট আয়ের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মধ্যস্বত্বভোগী বা স্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে চলে যাওয়ায় প্রকৃত শিল্পীরা প্রায়শই তাদের প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করে যে, ডিজিটাল যুগে মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় একটি সুদৃঢ় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো কতটা জরুরি।

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রয়্যালটি আদায়ের জটিলতা শুধুমাত্র বাংলাদেশের সমস্যা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, মেধাস্বত্ব আইন ২০০২ (সংশোধিত ২০০৫ ও ২০১৮) এবং এর প্রয়োগে বিদ্যমান দুর্বলতা এই সমস্যাকে আরও প্রকট করেছে। শিল্পীরা যখন তাদের সৃষ্টিকর্ম ইউটিউব বা ফেসবুকে আপলোড করেন, তখন প্রায়শই বিভিন্ন অ্যাগ্রিগেটর বা ডিজিটাল ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে কাজটি সম্পন্ন হয়। এই কোম্পানিগুলো প্ল্যাটফর্ম থেকে আয় সংগ্রহ করে, কিন্তু তাদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাবে অনেক শিল্পীই তাদের আয়ের সঠিক হিসাব পান না। উদাহরণস্বরূপ, একটি গান যদি ইউটিউবে ১০ মিলিয়ন ভিউ পায়, তবে তার বিপরীতে শিল্পী কত টাকা পাবেন, সেই হিসাব প্রায়শই অস্পষ্ট থাকে। World Bank এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের কারণে সৃজনশীল শিল্পের বার্ষিক ক্ষতি বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যার একটি বড় অংশ ডিজিটাল রয়্যালটি থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে ঘটে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও, এই শিল্পের প্রায় ৮০% শিল্পীই তাদের ডিজিটাল কাজের সঠিক রয়্যালটি না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন, যা তাদের পেশাগত জীবনকে হুমকিতে ফেলছে এবং নতুন সৃষ্টিতে নিরুৎসাহিত করছে।

এই সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশ সরকার ইতোমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিলেও, সেগুলোর বাস্তবায়ন এখনও আশানুরূপ নয়। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় যৌথভাবে মেধাস্বত্ব সুরক্ষা এবং ডিজিটাল রয়্যালটি বিতরণে স্বচ্ছতা আনার জন্য কাজ করার ঘোষণা দিয়েছে। তবে, ফেসবুক ও ইউটিউবের মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলোর সাথে সরাসরি চুক্তি এবং রয়্যালটি বিতরণে একটি কার্যকর মডেল তৈরি করা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় দেখা যায়, কপিরাইট দাবি করা হলেও, সেই দাবির বিপরীতে দ্রুত এবং ন্যায্য সমাধান পাওয়া যায় না। এছাড়া, বাংলাদেশে কপিরাইট সোসাইটির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ADB এর এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে ডিজিটাল কন্টেন্ট থেকে রয়্যালটি আদায়ের প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল এবং অসংগঠিত। শিল্পীদের জন্য একটি কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ এবং রয়্যালটি ট্র্যাকিং সিস্টেম না থাকায়, কে কতবার গান ব্যবহার করছে বা দেখছে, তার সঠিক হিসাব রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এর ফলে, একদিকে যেমন শিল্পীরা বঞ্চিত হচ্ছেন, তেমনি সরকারের রাজস্ব আদায়ও ব্যাহত হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য একটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বছর মোট ডিজিটাল রয়্যালটি আয় (আনুমানিক) শিল্পীদের কাছে পৌঁছানো অংশ মধ্যস্বত্বভোগী/প্ল্যাটফর্মের অংশ কপিরাইট লঙ্ঘনের ঘটনা (আনুমানিক)
২০২০ ১০০ মিলিয়ন টাকা ১৫% ৮৫% ৫০,০০০+
২০২১ ১২০ মিলিয়ন টাকা ১২% ৮৮% ৬০,০০০+
২০২২ ১৫০ মিলিয়ন টাকা ১০% ৯০% ৭৫,০০০+
২০২৩ ১৮০ মিলিয়ন টাকা ৭.৫% ৯২.৫% ১,০০,০০০+

উৎস: বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস ও মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি ফোরামের যৌথ গবেষণা প্রতিবেদন, ২০২৪ (প্রাথমিক তথ্য)

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন 'ডিজিটাল রয়্যালটি কালেকশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন এজেন্সি' প্রতিষ্ঠা করবে, যা সরাসরি ফেসবুক, ইউটিউব এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সাথে রয়্যালটি চুক্তি সম্পাদন করবে এবং মেধাস্বত্ব আইন ২০০২ (সংশোধিত ২০১৮) এর অধীনে শিল্পীদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করবে।
  • World Bank ও ADB এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় একটি সমন্বিত 'ন্যাশনাল মিউজিক ডেটাবেজ ও রয়্যালটি ট্র্যাকিং সিস্টেম' তৈরি করা, যেখানে প্রতিটি শিল্পীর সৃষ্টিকর্ম, স্বত্বাধিকার এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারের বিস্তারিত তথ্য স্বচ্ছভাবে রেকর্ড ও নিরীক্ষা করা যাবে।
  • বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসকে আরও শক্তিশালী করে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কপিরাইট লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিশেষায়িত 'ডিজিটাল কপিরাইট এনফোর্সমেন্ট ইউনিট' গঠন করা এবং নিয়মিতভাবে মেধাস্বত্ব আইন ২০০২ এর প্রয়োগ ও আধুনিকায়নের জন্য স্টেকহোল্ডারদের সাথে পরামর্শ করা।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রকিবুল ইসলাম

রকিবুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি ও রয়্যালটি রাইটস। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

कोई टिप्पणी नहीं मिली


News Card Generator