ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: ডিজিটাল বর্জ্যের পাহাড় ও সার্কুলার অর্থনীতির হাতছানি | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: ডিজিটাল বর্জ্যের পাহাড় ও সার্কুলার অর্থনীতির হাতছানি

নাবিলা তাবাসসুম  avatar   
নাবিলা তাবাসসুম
ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: ডিজিটাল বর্জ্যের পাহাড় ও সার্কুলার অর্থনীতির হাতছানি
ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: ডিজিটাল বর্জ্যের পাহাড় ও সার্কুলার অর্থনীতির হাতছানি
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি প্রকাশিত পরিবেশ অধিদপ্তরের এক প্রাক্কলন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪ লাখ মেট্রিক টনের বেশি ই-বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে, যার মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ...

সম্প্রতি প্রকাশিত পরিবেশ অধিদপ্তরের এক প্রাক্কলন অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৪ লাখ মেট্রিক টনের বেশি ই-বর্জ্য উৎপাদিত হচ্ছে, যার মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশেরও কম সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণ করা সম্ভব হচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ অব্যবস্থাপিত ই-বর্জ্য আমাদের মাটি, পানি ও বায়ুতে সিসা, ক্যাডমিয়াম, পারদের মতো বিষাক্ত ভারী ধাতু নির্গত করে, যা কৃষি উৎপাদনশীলতা এবং খাদ্য সুরক্ষার জন্য মারাত্মক হুমকি। বিশেষ করে, ডাইরেক্টরেট অফ এগ্রিকালচারাল এক্সটেনশন (DAE) ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো আধুনিক কৃষিতে ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করছে, যার ফলস্বরূপ কৃষি যন্ত্রাংশ, সেন্সর, কম্পিউটার ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইসের বর্জ্যও বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে, দ্রুত বর্ধনশীল ডিজিটাল বর্জ্যের এই পাহাড় মোকাবিলায় একটি কার্যকর ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নীতি এবং সার্কুলার অর্থনীতির মডেল অপরিহার্য হয়ে উঠেছে, যা কেবল পরিবেশ সুরক্ষা নয়, বরং কৃষিক্ষেত্রে টেকসই উন্নয়নেরও চালিকাশক্তি হতে পারে।

ই-বর্জ্যের এই ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিবেশ মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে ই-বর্জ্য (ব্যবস্থাপনা) বিধিমালা, ২০২১ প্রণয়ন করেছে, যা উৎপাদক, আমদানিকারক, সংগ্রাহক ও প্রক্রিয়াকরণকারীদের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করেছে। তবে, এই বিধিমালার কার্যকর বাস্তবায়নে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) তাদের গবেষণাগার ও ফিল্ড ওয়ার্কে ব্যবহৃত আধুনিক ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম যেমন - জিও-ট্যাগিং ডিভাইস, ড্রোন, স্বয়ংক্রিয় আবহাওয়া স্টেশন ইত্যাদির মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পর সেগুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য নির্দিষ্ট কোনো কাঠামোগত প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি গড়ে তুলতে পারেনি। একই চিত্র দেখা যায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC)-এর অধীনে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণা প্রকল্পে, যেখানে বায়োটেকনোলজি ও ন্যানোটেকনোলজির জন্য ব্যবহৃত সূক্ষ্ম ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতিগুলো মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর প্রায়শই অপ্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে নিষ্পত্তি করা হয়। এই অপ্রাতিষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা শুধু পরিবেশ দূষণই বাড়ায় না, বরং মূল্যবান কাঁচামাল পুনরুদ্ধারের সুযোগও নষ্ট করে।

সার্কুলার অর্থনীতির মডেল ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটি যুগান্তকারী সমাধান দিতে পারে, যেখানে 'টেক-ব্যবহার-পুনর্ব্যবহার' চক্রের মাধ্যমে পণ্যের জীবনচক্র দীর্ঘায়িত করা হয়। এক্ষেত্রে, কৃষিভিত্তিক ইলেকট্রনিক পণ্যের নকশা পর্যায়েই মেরামতযোগ্যতা ও পুনর্ব্যবহারযোগ্যতার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে, ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি থেকে তামা, অ্যালুমিনিয়াম, সোনা, রূপার মতো মূল্যবান ধাতু পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে, যা নতুন উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে এবং একই সাথে প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণের চাপ কমাবে। এই মডেল শুধু পরিবেশগত সুবিধা প্রদান করে না, বরং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও অবদান রাখতে পারে। বিশেষত, কৃষি খাতে ব্যবহৃত স্মার্ট সেন্সর, ড্রোন এবং অন্যান্য IoT (ইন্টারনেট অফ থিংস) ডিভাইসগুলোর মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সেগুলোর উপাদানগুলো আলাদা করে পুনরায় ব্যবহার বা রিসাইকেল করার জন্য একটি সুসংগঠিত চেইন তৈরি করা অপরিহার্য। এটি প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় রোধ করে এবং কৃষি-পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব কমিয়ে আনে।

পরিবেশগত প্রভাবের দিক ই-বর্জ্যের বর্তমান চিত্র (২০২২-২৩) কৃষি ও খাদ্য খাতে সম্ভাব্য প্রভাব
মোট ই-বর্জ্য উৎপাদন ৪.১৯ লাখ মেট্রিক টন (আনুমানিক) মাটি ও পানি দূষণের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদনশীলতা হ্রাস
সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণের হার ৯.৫% এর কম দূষিত খাদ্য শৃঙ্খলে প্রবেশ, জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বৃদ্ধি
ভারী ধাতু নির্গমন (প্রতি বছর) প্রায় ১,৫০০ কেজি সিসা, ৬০০ কেজি ক্যাডমিয়াম (আনুমানিক) ফসলে বিষাক্ত ধাতু জমা, মাটির উর্বরতা হ্রাস
প্লাস্টিক বর্জ্য (ই-বর্জ্যের অংশ) ই-বর্জ্যের প্রায় ২০-৩০% মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণের মাধ্যমে কৃষি জমি ও জলাশয়ের ক্ষতি
পুনরুদ্ধারযোগ্য মূল্যবান ধাতু ১,০০০ কোটির বেশি টাকার ধাতু পুনরুদ্ধার সম্ভব কৃষি যন্ত্রাংশ উৎপাদনে কাঁচামালের সরবরাহ শৃঙ্খলে ইতিবাচক প্রভাব

উৎস: পরিবেশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমীক্ষা, এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রাক্কলিত।

সুপারিশ

  • পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে ই-বর্জ্য (ব্যবস্থাপনা) বিধিমালা, ২০২১ এর অধীনে 'প্রসারিত উৎপাদক দায়িত্ব' (EPR) নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে, যেখানে ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদনকারী ও আমদানিকারকদের তাদের পণ্যের জীবনচক্র শেষে সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের সম্পূর্ণ দায়ভার নিতে হবে। এক্ষেত্রে DAE, BARI, BRRI এবং BARC-এর মতো সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক্স পণ্য নিষ্পত্তির জন্য সরকারিভাবে একটি কেন্দ্রীয় সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে।
  • কৃষি মন্ত্রনালয়কে DAE, BARI, BRRI এবং BARC-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি ডিজিটাল বর্জ্য অডিট ও ব্যবস্থাপনা নির্দেশিকা প্রণয়ন করতে হবে, যা তাদের ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতির সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্যের তালিকাভুক্তি এবং অনুমোদিত রিসাইক্লিং সেন্টারে প্রেরণের পদ্ধতি সুনির্দিষ্ট করবে। এই নির্দেশিকায় সার্কুলার ইকোনমি নীতির আলোকে পণ্যের মেরামত ও পুনর্ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
  • স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়কে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় করে স্থানীয় পর্যায়ে ই-বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন এবং গ্রামীণ কৃষকদের মধ্যে ব্যবহৃত ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ যেমন সেচ পাম্পের কন্ট্রোলার, সোলার প্যানেলের ইনভার্টার ইত্যাদির সঠিক নিষ্পত্তির বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। এর পাশাপাশি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ই-রিসাইক্লিং উদ্যোগগুলোকে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক বিশেষ ঋণ প্রকল্পের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাবিলা তাবাসসুম

নাবিলা তাবাসসুম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সার্কুলার ইকোনমি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nenhum comentário encontrado


News Card Generator