তৈরি পোশাক: সবুজ কারখানার বিশ্বায়ন, নাকি স্থানীয় চ্যালেঞ্জের বলয়? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

তৈরি পোশাক: সবুজ কারখানার বিশ্বায়ন, নাকি স্থানীয় চ্যালেঞ্জের বলয়?

নাসির উদ্দিন  avatar   
নাসির উদ্দিন
তৈরি পোশাক: সবুজ কারখানার বিশ্বায়ন, নাকি স্থানীয় চ্যালেঞ্জের বলয়?
তৈরি পোশাক: সবুজ কারখানার বিশ্বায়ন, নাকি স্থানীয় চ্যালেঞ্জের বলয়?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (BGMEA) ঘোষণা করেছে যে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে লিড সার্টিফায়েড (LEED Certified) সবুজ কারখানার স...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (BGMEA) ঘোষণা করেছে যে, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে লিড সার্টিফায়েড (LEED Certified) সবুজ কারখানার সংখ্যা এখন ২২০ ছাড়িয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী এই খাতে সবুজ কারখানার সর্বোচ্চ সংখ্যা। এর মধ্যে ৭৬টি প্লাটিনাম রেটেড এবং ১২১টি গোল্ড রেটেড কারখানা রয়েছে। এই অর্জন বাংলাদেশের জন্য এক বিশাল মাইলফলক, যা বৈশ্বিক টেকসই উৎপাদন প্রক্রিয়ায় দেশের নেতৃত্বকে সুসংহত করছে। বিশেষত, যখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অন্যান্য প্রধান ক্রেতা দেশগুলো 'সবুজ' উৎপাদন এবং কার্বন ফুটপ্রিন্ট হ্রাসের ওপর জোর দিচ্ছে, তখন এই সংখ্যা বাংলাদেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

এই বৈশ্বিক স্বীকৃতি একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা অর্জন এবং উচ্চতর মূল্য প্রাপ্তির সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি অন্যদিকে স্থানীয় চ্যালেঞ্জগুলির একটি বলয়কে সামনে নিয়ে আসছে। সবুজ কারখানার জন্য অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নত প্রক্রিয়া প্রয়োজন, যা প্রায়শই স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যয়বহুল হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণস্বরূপ, একটি লিড সার্টিফিকেশন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রাথমিক বিনিয়োগ, উন্নত প্ল্যান্ট ও মেশিনারি স্থাপন এবং নিয়মিত নিরীক্ষণ বাবদ উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হয়, যা কেবল বড় আকারের শিল্পগোষ্ঠীগুলোর পক্ষেই সম্ভব। ফলস্বরূপ, ছোট এবং মাঝারি আকারের কারখানাগুলো, যারা দেশের মোট রপ্তানিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, তারা এই বৈশ্বিক সবুজায়নের ধারার সাথে তাল মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (BKMEA) এর তথ্য অনুযায়ী, তাদের অনেক সদস্য প্রতিষ্ঠানই সবুজ কারখানার ব্যয়ভার বহন করতে অক্ষম, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের বাজার হারানোর ঝুঁকিতে ফেলছে।

তৈরি পোশাক খাতের এই সবুজ বিপ্লব একদিকে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করলেও, স্থানীয় পর্যায়ে শ্রমিক অধিকার এবং কর্মপরিবেশের মৌলিক উন্নতিতেও এর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। ডিরেক্টরেট অফ ইন্সপেকশন ফর ফ্যাক্টরিজ অ্যান্ড এস্টাবলিশমেন্টস (DIFE) এর নিয়মিত পরিদর্শনে এখনও অনেক কারখানায় ফায়ার সেফটি, বিল্ডিং স্ট্রাকচারাল ইন্টিগ্রিটি এবং কর্মপরিবেশ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়। যদিও লিড সার্টিফিকেশন পরিবেশগত স্থায়িত্বের উপর জোর দেয়, এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে শ্রমিক অধিকার বা ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করে না। অনেক সময় সবুজ কারখানার উচ্চ বিনিয়োগের চাপ পরোক্ষভাবে শ্রমিকদের মজুরি বা অন্যান্য সুবিধা কর্তনের মাধ্যমে পুষিয়ে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, যা দেশের শ্রম আইন এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) নীতিমালার সাথে সাংঘর্ষিক। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এর তথ্যানুসারে, সবুজ কারখানার সংখ্যা বাড়লেও, সামগ্রিক রপ্তানি আয়ে টেকসই প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন অপরিহার্য।

সূচক ২০২০-২১ অর্থবছর ২০২১-২২ অর্থবছর ২০২২-২৩ অর্থবছর ২০২৩-২৪ অর্থবছর (জুলাই-মার্চ)
পোশাক রপ্তানি আয় (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ৩১.৪৫ ৪২.৬১ ৪৬.৯৯ ৩৯.৯৮
লিড সার্টিফায়েড সবুজ কারখানার সংখ্যা ১৪৪ ১৫৭ ১৮৭ ২২০+
মোট রপ্তানিতে পোশাক খাতের অবদান (%) ৮১.১৭ ৮১.৮১ ৮৪.৫৮ ৮৪.৫৭

উৎস: রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এবং BGMEA

সুপারিশ

  • সরকারকে একটি 'সবুজ রূপান্তর তহবিল' (Green Transformation Fund) গঠন করতে হবে, যা বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের যৌথ তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। এই তহবিল থেকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের তৈরি পোশাক কারখানাগুলোকে লিড সার্টিফিকেশন প্রাপ্তি এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণে সহজ শর্তে ঋণ ও ভর্তুকি প্রদান করা হবে, যাতে তারা বৈশ্বিক সবুজায়নের ধারার সাথে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে।
  • শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং ডিরেক্টরেট অফ ইন্সপেকশন ফর ফ্যাক্টরিজ অ্যান্ড এস্টাবলিশমেন্টস (DIFE) কে যৌথভাবে 'শ্রমিক কল্যাণ ও সবুজ কর্মপরিবেশ নীতিমালা' (Worker Welfare and Green Workplace Policy) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যেখানে সবুজ কারখানার সার্টিফিকেশনের পাশাপাশি শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, কর্মঘণ্টা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা এবং ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার নিশ্চিত করার মানদণ্ড অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে সংশ্লিষ্ট কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে 'বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬' অনুযায়ী কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
  • বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (BGMEA) এবং বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (BKMEA) কে সম্মিলিতভাবে একটি 'টেকসই সাপ্লাই চেইন উন্নয়ন কর্মসূচি' (Sustainable Supply Chain Development Program) চালু করতে হবে, যা ছোট ও মাঝারি আকারের সহযোগী কারখানাগুলোকে (sub-contractors) সবুজ উৎপাদন পদ্ধতি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত নিরীক্ষণের বিষয়ে কারিগরি সহায়তা ও প্রশিক্ষণ প্রদান করবে। এর মাধ্যমে পুরো সাপ্লাই চেইন জুড়ে টেকসই অনুশীলন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাসির উদ্দিন

নাসির উদ্দিন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: তৈরি পোশাক (RMG) ও টেক্সটাইল খাত। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator