বিশ্ব ফুটবল ও স্পোর্টস ফ্র্যাঞ্চাইজি: ক্লাব মালিকানার বৈশ্বিক দৌড়, নাকি ফুটবলের আত্মার পতন? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বিশ্ব ফুটবল ও স্পোর্টস ফ্র্যাঞ্চাইজি: ক্লাব মালিকানার বৈশ্বিক দৌড়, নাকি ফুটবলের আত্মার পতন?

সাব্বির হোসেন  avatar   
সাব্বির হোসেন
বিশ্ব ফুটবল ও স্পোর্টস ফ্র্যাঞ্চাইজি: ক্লাব মালিকানার বৈশ্বিক দৌড়, নাকি ফুটবলের আত্মার পতন?
বিশ্ব ফুটবল ও স্পোর্টস ফ্র্যাঞ্চাইজি: ক্লাব মালিকানার বৈশ্বিক দৌড়, নাকি ফুটবলের আত্মার পতন?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (PIF) কর্তৃক ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব নিউক্যাসল ইউনাইটেড অধিগ্রহণের ঘটনা বিশ্ব ফুটবলের মালিকানা কাঠামোর দ্র...

সম্প্রতি সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (PIF) কর্তৃক ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের ক্লাব নিউক্যাসল ইউনাইটেড অধিগ্রহণের ঘটনা বিশ্ব ফুটবলের মালিকানা কাঠামোর দ্রুত পরিবর্তনশীল ল্যান্ডস্কেপের এক জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। এই ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের চুক্তি শুধু একটি ক্লাবের ভাগ্য পরিবর্তন করেনি, বরং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং ক্রীড়া ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিকীকরণের এক নতুন অধ্যায় উন্মোচন করেছে। ঐতিহ্যবাহী ক্লাবগুলোর স্থানীয় মালিকানা থেকে সরে এসে এখন বৈশ্বিক পুঁজি, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও আমেরিকার বিনিয়োগকারীদের দৌরাত্ম্য চোখে পড়ার মতো, যা ফুটবলের আর্থিক মডেলকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে।

ফুটবলের এই বৈশ্বিক মালিকানার দৌড় কেবল আর্থিক লাভের আশায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর সাথে জড়িয়ে আছে ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং 'সফট পাওয়ার' প্রদর্শনের এক সূক্ষ্ম কৌশল। কাতার স্পোর্টস ইনভেস্টমেন্টস (QSI) প্যারিস সেন্ট-জার্মেই (PSG) কিনে নেওয়ার পর থেকে যেভাবে ইউরোপীয় ফুটবলে তাদের প্রভাব বেড়েছে, তা PIF-এর নিউক্যাসল অধিগ্রহণের পেছনের উদ্দেশ্যকেও স্পষ্ট করে তোলে। এই বিনিয়োগকারীরা শুধুমাত্র খেলোয়াড় কেনাবেচা বা স্টেডিয়াম উন্নয়নে আগ্রহী নন, বরং তাদের লক্ষ্য হলো বিশ্বজুড়ে নিজেদের ব্র্যান্ড ও জাতীয় পরিচয়কে শক্তিশালী করা। বহু-ক্লাব মালিকানা মডেলও এই প্রবণতার একটি অংশ, যেখানে সিটি ফুটবল গ্রুপ (ম্যানচেস্টার সিটি, নিউ ইয়র্ক সিটি এফসি, মেলবোর্ন সিটি এফসি সহ ১৩টির বেশি ক্লাব) বা রেড বুল স্পোর্টস (আরবি লাইপজিগ, রেড বুল সালজবুর্গ, নিউ ইয়র্ক রেড বুলস) এর মতো সত্তাগুলো একটি বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক তৈরি করে প্রতিভা অন্বেষণ, বিপণন এবং আর্থিক কার্যকারিতার ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যোগ করছে। এটি একদিকে যেমন বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি ছড়িয়ে দেয়, তেমনই অন্যদিকে ছোট লিগগুলোর ক্লাবগুলোকে আন্তর্জাতিক স্তরের কাঠামো ও সুযোগ-সুবিধা পেতে সহায়তা করে।

তবে, এই বাণিজ্যিকীকরণ এবং বৈশ্বিক পুঁজির আধিপত্য ফুটবলের 'আত্মা' বা ঐতিহ্যগত মূল্যবোধের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে কিনা, তা নিয়ে বিতর্ক ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। স্থানীয় ভক্তদের সাথে ক্লাবের ঐতিহাসিক সংযোগ, দলীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ এবং খেলার প্রতি নিছক ভালোবাসার পরিবর্তে আর্থিক পারফরম্যান্সের উপর অতিরিক্ত জোর দেওয়া হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপীয় সুপার লিগের প্রস্তাবনা, যা ফুটবলের অভিজাত ক্লাবগুলোর জন্য একটি বদ্ধ বাণিজ্যিক লিগ তৈরির চেষ্টা করেছিল, তা বিশ্বজুড়ে ভক্তদের তীব্র প্রতিরোধের মুখে পড়েছিল। এটি প্রমাণ করে যে, ভক্তরা কেবল পণ্য হিসেবে খেলাটিকে দেখতে রাজি নন, বরং এর ঐতিহাসিক এবং সামাজিক মূল্যবোধকে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন। খেলোয়াড়দের আকাশচুম্বী বেতন, ট্রান্সফার ফির অবিশ্বাস্য বৃদ্ধি এবং এজেন্টদের প্রভাবও এই বাণিজ্যিকীকরণেরই ফল, যা অনেক সময় খেলার মৌলিক নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ফিফা (FIFA) এবং উয়েফা (UEFA) এর মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো আর্থিক ফেয়ার প্লে (FFP) বিধিমালা প্রয়োগ করার চেষ্টা করলেও, বৃহৎ বিনিয়োগকারীদের সামনে তা অনেক সময়ই যথেষ্ট বলে প্রমাণিত হয় না।

এই প্রবণতা শুধু বড় ক্লাব বা লিগেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং বৈশ্বিক ক্রীড়া অর্থনীতির অংশ হিসেবে ছোট লিগ এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোও এর প্রভাব অনুভব করছে। বাংলাদেশ সরকারের যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ও ক্রীড়া অবকাঠামো এবং খেলাধুলায় বিনিয়োগ আকর্ষণের চেষ্টা করছে, তবে বৈশ্বিক ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে স্থানীয় ফুটবলের স্বকীয়তা বজায় রাখা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। World Bank এবং ADB-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ক্রীড়া-সম্পর্কিত অবকাঠামো উন্নয়ন বা যুব ক্রীড়া কার্যক্রমে আর্থিক সহায়তা দিলেও, সরাসরি ক্লাব মালিকানার মডেল বা বাণিজ্যিকীকরণের ক্ষেত্রে তাদের প্রভাব এখনো সীমিত।

বিশ্বের শীর্ষ ফুটবল ক্লাবগুলোর গড় মূল্যায়নে পরিবর্তন (২০১৩-২০২৩)
বছর শীর্ষ ২০ ক্লাবের গড় মূল্যায়ন (বিলিয়ন USD) শীর্ষ ২০ ক্লাবের মোট রাজস্ব (বিলিয়ন USD) মালিকানার ধরন (প্রধানত)
২০১৩ ১.০ ০.৪ ব্যক্তিগত/পরিবার
২০১৮ ২.২ ০.৬ ব্যক্তিগত/কর্পোরেট
২০২৩ ৩.৫ ০.৯ কর্পোরেট/রাষ্ট্রীয়/প্রাইভেট ইক্যুইটি

উৎস: ফোর্বস, ডেলয়েট ফুটবল মানি লিগ রিপোর্ট

সুপারিশ

  • ফিফা (FIFA) এবং উয়েফা (UEFA) কর্তৃক আর্থিক ফেয়ার প্লে (FFP) বিধিমালাকে আরও কঠোর ও স্বচ্ছ করা, যাতে রাষ্ট্রীয় মালিকানা বা প্রাইভেট ইক্যুইটির মাধ্যমে অনিয়ন্ত্রিত আর্থিক ডোপিং প্রতিরোধ করা যায় এবং ছোট ও মাঝারি ক্লাবের প্রতিযোগিতার সুযোগ সুরক্ষিত থাকে।
  • জাতীয় ফুটবল ফেডারেশনগুলোকে (যেমন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন) স্থানীয় ক্লাবগুলোর জন্য '৫+১' (৫১% ফ্যান/লোকাল শেয়ারহোল্ডিং) জার্মান মডেলের মতো মালিকানা বিধি প্রবর্তনে উৎসাহিত করা, যা ক্লাবের স্থানীয় পরিচয় ও ভক্তদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে এবং বহিরাগত বিনিয়োগকারীদের দ্বারা সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রোধ করবে।
  • World Bank এবং ADB-এর মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে ক্রীড়া খাতের উন্নয়নে শুধুমাত্র অবকাঠামো প্রকল্পেই নয়, বরং স্থানীয় তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভা বিকাশে এবং ফুটবল একাডেমী প্রতিষ্ঠায় সরাসরি আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদানের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট তহবিল (যেমন "Global Football Development Fund") গঠন করা।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সাব্বির হোসেন

সাব্বির হোসেন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বিশ্ব ফুটবল ও স্পোর্টস ফ্র্যাঞ্চাইজি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator