মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন আইন: দুর্বল বিচারিক কাঠামো ও ন্যায়বিচারের দীর্ঘসূত্রতা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন আইন: দুর্বল বিচারিক কাঠামো ও ন্যায়বিচারের দীর্ঘসূত্রতা

রেজাউল করিম শিকদার  avatar   
রেজাউল করিম শিকদার
মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন আইন: দুর্বল বিচারিক কাঠামো ও ন্যায়বিচারের দীর্ঘসূত্রতা
মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন আইন: দুর্বল বিচারিক কাঠামো ও ন্যায়বিচারের দীর্ঘসূত্রতা
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২ এর অধীনে দায়েরকৃত একটি চাঞ্চল্যকর মামলায় ঢাকার মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক দীর্ঘ সাত বছর পর মাত্র দ...

সম্প্রতি, মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২ এর অধীনে দায়েরকৃত একটি চাঞ্চল্যকর মামলায় ঢাকার মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক দীর্ঘ সাত বছর পর মাত্র দুই জন আসামিকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং বাকি আটজনকে খালাস প্রদানের ঘটনা দেশের বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা ও দুর্বলতা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এই মামলার বিচার প্রক্রিয়ার ধীর গতি এবং অধিকাংশ অভিযুক্তের অব্যাহতি প্রাপ্তি একদিকে যেমন ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তেমনই মানব পাচার রোধে বাংলাদেশের অঙ্গীকারের কার্যকারিতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। এই রায় প্রমাণ করে যে, আইন থাকলেও তার সঠিক ও দ্রুত প্রয়োগের অভাবে অপরাধীরা প্রায়শই পার পেয়ে যায়, যা পাচারকারীদের জন্য একটি নির্লজ্জ বার্তা বহন করে।

মানব পাচার একটি বৈশ্বিক সমস্যা হলেও বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এর শিকারের সংখ্যা উদ্বেগজনক। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এবং জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা (UNHCR) এর মতে, প্রতি বছর হাজার হাজার বাংলাদেশি উন্নত জীবনের আশায় পাচারকারীদের ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারায়, যাদের অনেকেই বিদেশে গিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করে অথবা মৃত্যুর মুখে পতিত হয়। বাংলাদেশ সরকার মানব পাচার প্রতিরোধে বিভিন্ন আইন ও নীতি প্রণয়ন করলেও, এর বাস্তবায়ন ও বিচারিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতির। মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২ এবং এর অধীনে প্রণীত বিধিমালা ২০১৮ থাকা সত্ত্বেও, মানব পাচার মামলার তদন্ত, অভিযোগপত্র দাখিল এবং বিচার নিষ্পত্তিতে চরম দীর্ঘসূত্রতা পরিলক্ষিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (CID) এর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দায়েরকৃত মানব পাচার সংক্রান্ত মামলার মধ্যে মাত্র ১৫-২০ শতাংশের বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, যার একটি বড় অংশ এখনো বিচারাধীন। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (World Bank) এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানব পাচার রোধে বাংলাদেশের আইনি কাঠামো যথেষ্ট শক্তিশালী হলেও, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতার অভাব, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত জনবলের অভাব এবং বিচারিক প্রক্রিয়াতে সমন্বয়হীনতা এই আইনের সুফল প্রাপ্তিতে প্রধান বাধা। বিশেষ করে, তদন্ত পর্যায়ে সাক্ষ্যপ্রমাণের দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের সাথে স্থানীয় দালালদের যোগসাজশ উদ্ঘাটনে ব্যর্থতা অনেক মামলাকে দুর্বল করে দেয়।

বিচারিক কাঠামোর দুর্বলতা এবং ন্যায়বিচারের দীর্ঘসূত্রতা মানব পাচার প্রতিরোধের ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশের বিচারিক ব্যবস্থায় মানব পাচার সংক্রান্ত মামলার জন্য বিশেষায়িত ট্রাইব্যুনাল স্থাপন করা হলেও, সেগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আইন ও বিচার বিভাগ থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, দেশের মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে মামলার জট বেড়েই চলেছে। পর্যাপ্ত বিচারক ও বিচারিক সহায়তাকারী কর্মচারীর অভাব, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহে জটিলতা এবং প্রায়শই সাক্ষীদের নিরাপত্তাহীনতা ও অনুপস্থিতি মামলার নিষ্পত্তিতে বিলম্ব ঘটায়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এর একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, মানব পাচার সংক্রান্ত মামলাগুলোতে ভুক্তভোগীদের আইনি সহায়তা এবং পুনর্বাসনের ক্ষেত্রেও ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। পাচারের শিকার ব্যক্তিরা প্রায়শই সমাজের মূল স্রোতে ফিরে আসার জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়, যা তাদের বিচার প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে নিরুৎসাহিত করে। উপরন্তু, ক্রস-বর্ডার পাচার মামলাগুলোতে আন্তর্জাতিক আইন ও প্রটোকলের সাথে দেশীয় আইনের সমন্বয় সাধন এবং অন্যান্য দেশের সাথে তথ্য আদান-প্রদানে জটিলতা দেখা যায়, যা অপরাধীদের বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্মিলিতভাবে মানব পাচার প্রতিরোধে কাজ করলেও, মাঠ পর্যায়ে তাদের কার্যক্রমের সমন্বয় প্রায়শই দুর্বল থাকে, যার ফলে পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়ে।

পাচারের শিকার হওয়া ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা এবং বিচারিক দুর্বলতা অপরাধীদের উৎসাহিত করে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, পাচারকারীরা জামিনে মুক্তি পেয়ে আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে মানব পাচার প্রতিরোধের জন্য জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (National Action Plan for Combating Human Trafficking) প্রণয়ন করা হয়েছে, কিন্তু এর বাস্তবায়ন গতি অত্যন্ত ধীর। এই কর্মপরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য ছিল মানব পাচার মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, যা বাস্তবে এখনো অধরাই রয়ে গেছে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে আন্তঃসংস্থা সমন্বয়হীনতা এবং তথ্য আদান-প্রদানের অভাব পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিশেষ করে, ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে মানব পাচার বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, যার মোকাবিলায় সাইবার ক্রাইম ইউনিটগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি।

সাল মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ এর অধীনে দায়েরকৃত মামলা অভিযোগপত্র দাখিলকৃত মামলা নিষ্পত্তি হওয়া মামলা দণ্ডপ্রাপ্তির হার (%)
২০১৯ ৩,৫০০ ১,২০০ ৩৫০ ১০.০
২০২০ ৩,২০০ ১,১০০ ৩০০ ৯.৪
২০২১ ৩,৭০০ ১,৩০০ ৪০০ ১০.৮
২০২২ ৪,১০০ ১,৫০০ ৫৫০ ১৩.৪

উৎস: বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (CID) এবং আইন ও বিচার বিভাগ, ২০২২ সালের সর্বশেষ তথ্য।

সুপারিশ

  • মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২ এর অধীনে গঠিত ট্রাইব্যুনালগুলোতে দ্রুত বিচারক নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রতি বছর ন্যূনতম ১০০টি মামলা নিষ্পত্তির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে আইন ও বিচার বিভাগকে তদারকি বৃদ্ধি করতে হবে।
  • প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে একটি 'মানব পাচার তথ্য ও তদন্ত ইউনিট' গঠন করতে হবে, যা আন্তর্জাতিক পাচার চক্রের তথ্য সংগ্রহ ও আদান-প্রদানে ইন্টারপোল এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে সরাসরি যোগাযোগ রক্ষা করবে।
  • বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (National Action Plan for Combating Human Trafficking) এর অধীনে ভুক্তভোগীদের জন্য সুরক্ষা, আইনি সহায়তা এবং পুনর্বাসনের জন্য বরাদ্দকৃত বাজেট বৃদ্ধি করে প্রত্যেক জেলায় কমপক্ষে একটি 'ভুক্তভোগী সহায়তা কেন্দ্র' স্থাপন করতে হবে, যা নারী ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রেজাউল করিম শিকদার

রেজাউল করিম শিকদার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মানব পাচার ও নিরাপদ অভিবাসন আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

कोई टिप्पणी नहीं मिली


News Card Generator