মধ্যপ্রাচ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভবিষ্যৎ: তেল-গ্যাসের রাজত্ব কি শেষ? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মধ্যপ্রাচ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভবিষ্যৎ: তেল-গ্যাসের রাজত্ব কি শেষ?

জুবায়ের আহমেদ  avatar   
জুবায়ের আহমেদ
মধ্যপ্রাচ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভবিষ্যৎ: তেল-গ্যাসের রাজত্ব কি শেষ?
মধ্যপ্রাচ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভবিষ্যৎ: তেল-গ্যাসের রাজত্ব কি শেষ?
ছবি: সংগৃহীত
২০২৩ সালের নভেম্বরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত কপ২৮ (COP28) জলবায়ু সম্মেলনে জীবাশ্ম জ্বালানি পর্যায়ক্রমে কমানোর বিষয়ে ঐতিহাসিক ঐকমত্য মধ্যপ্রাচ্যে...

২০২৩ সালের নভেম্বরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত কপ২৮ (COP28) জলবায়ু সম্মেলনে জীবাশ্ম জ্বালানি পর্যায়ক্রমে কমানোর বিষয়ে ঐতিহাসিক ঐকমত্য মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি ভূ-রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তেলের উৎপাদন ও রপ্তানিতে বিশ্বের অন্যতম প্রধান এই অঞ্চলের দেশগুলো, যারা দশকের পর দশক ধরে বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত, তারা এখন নিজেদের অর্থনৈতিক মডেল পুনর্গঠনে এক অভূতপূর্ব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এই সম্মেলন কেবল বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমানোর অঙ্গীকারই নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর জন্য এক সুস্পষ্ট বার্তা—জ্বালানি ভবিষ্যৎ জীবাশ্ম জ্বালানি নির্ভরতা থেকে সরে এসে নবায়নযোগ্য উৎসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। সৌদি আরবের পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড (PIF) ২০৩০ সালের মধ্যে ৭০ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনের যে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে, তা এই পরিবর্তনের এক শক্তিশালী ইঙ্গিত। এই পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত বাধ্যবাধকতা নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণের এক অপরিহার্য কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং ওমান, তাদের বিশাল তেল ও গ্যাসের রিজার্ভের ওপর ভিত্তি করে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলেছে, তা বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তরের ফলে ঝুঁকির মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থা (IRENA) এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার (MENA) অঞ্চলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ গত পাঁচ বছরে দ্বিগুণ হয়েছে, যা এই অঞ্চলের দেশগুলোর কৌশলগত পরিবর্তনের সুস্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। উদাহরণস্বরূপ, সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের এনার্জি স্ট্র্যাটেজি ২০৫০ তেল-নির্ভর অর্থনীতি থেকে সরে এসে সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং হাইড্রোজেন উৎপাদনে বিশাল বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। সৌদি আরবের নিওম (NEOM) প্রকল্পে গ্রিন হাইড্রোজেন উৎপাদন প্ল্যান্ট স্থাপন এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিশ্বের বৃহত্তম একক-সাইট সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প, আল ধাফরা সোলার পিভি (Al Dhafra Solar PV) নির্মাণ, প্রমাণ করে যে এই দেশগুলো কেবল কথার কথা নয়, বরং বাস্তবে বড় ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। এই পদক্ষেপগুলো কেবল অভ্যন্তরীণ জ্বালানি চাহিদা মেটাতেই নয়, বরং বিশ্বব্যাপী ক্লিন এনার্জি রপ্তানিকারক হিসেবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করতেও সহায়ক হবে। এই পরিবর্তন ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নতুন মিত্রতা এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের জন্ম দিচ্ছে, যা ঐতিহ্যবাহী তেল-কূটনীতির বাইরে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছে।

তবে, নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এই রূপান্তর মসৃণ হবে না। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশের অর্থনীতি এখনও তেল ও গ্যাস রপ্তানির ওপর অত্যধিক নির্ভরশীল। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, কিছু মধ্যপ্রাচ্যের দেশের জিডিপির ৩০-৫০% এবং সরকারি আয়ের ৭০-৯০% এখনও তেল ও গ্যাস খাত থেকে আসে। এই নির্ভরতা রাতারাতি কমানো সম্ভব নয়। বিশেষ করে, প্রাকৃতিক গ্যাসের একটি অন্তর্বর্তীকালীন জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার কাতার ও অন্যান্য গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলোর জন্য একটি কৌশলগত সুবিধা তৈরি করেছে। কাতার সম্প্রতি ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী গ্যাস সরবরাহ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যা নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যাপক প্রসারের আগ পর্যন্ত তাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবে। অন্যদিকে, ইসরায়েল, মিশর এবং জর্ডান নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের পাশাপাশি আঞ্চলিক গ্যাস পাইপলাইন নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণেও আগ্রহী। এই মিশ্র কৌশল মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে একদিকে যেমন বৈশ্বিক জলবায়ু লক্ষ্য পূরণে সাহায্য করবে, তেমনি অন্যদিকে তাদের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করবে। এই প্রেক্ষাপটে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আঞ্চলিক সংস্থা যেমন BIMSTEC ও সার্ক-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং প্রযুক্তি বিনিময়ের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে, যাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি ও অর্থায়নে প্রবেশাধিকার সহজ হয়। UN Peacekeeping মিশনগুলোও তাদের নিজস্ব জ্বালানি চাহিদা মেটাতে নবায়নযোগ্য উৎসের দিকে ঝুঁকছে, যা এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতায় পরোক্ষভাবে অবদান রাখতে পারে।

দেশ লক্ষ্যমাত্রা (সাল) নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশীদারি (%) মোট বিনিয়োগ (বিলিয়ন USD) উল্লেখযোগ্য প্রকল্প
সৌদি আরব ২০৩০ ৫০% (বিদ্যুৎ উৎপাদনে) ১০০+ নিওম (NEOM) গ্রিন হাইড্রোজেন, সাকাকা সোলার পিভি
সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০৫০ ৪৪% (বিদ্যুৎ উৎপাদনে) ১৬০+ আল ধাফরা সোলার পিভি, মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুম সোলার পার্ক
কাতার ২০৩০ ২০% (বিদ্যুৎ উৎপাদনে) ২০+ আল খোর সোলার পিভি
ওমান ২০৪০ ৩০% (বিদ্যুৎ উৎপাদনে) ৩০+ ইব্রি সোলার পিভি, গ্রিন হাইড্রোজেন হাব

উৎস: IRENA, World Bank, Saudi PIF, UAE Ministry of Energy and Infrastructure, Qatar Energy

সুপারিশ

  • মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সৌর জোট (International Solar Alliance - ISA) এবং আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থা (IRENA)-এর সাথে দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক চুক্তি জোরদার করতে হবে, যাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি ও অর্থায়নে সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হয় এবং উন্নত দেশগুলোর সাথে জ্ঞান বিনিময় বৃদ্ধি পায়।
  • আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট যেমন BIMSTEC এবং সার্ক-এর মতো সংস্থাগুলোর উচিত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংক্রান্ত একটি সুনির্দিষ্ট কারিগরি ও বিনিয়োগ ফোরাম প্রতিষ্ঠা করা, যা সবুজ হাইড্রোজেন, সৌর ও বায়ুশক্তির মতো প্রযুক্তিতে যৌথ গবেষণা, উন্নয়ন এবং দক্ষ জনবল তৈরিতে সহায়তা করবে।
  • মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর উচিত তাদের জাতীয় জ্বালানি নীতিমালায় সুস্পষ্টভাবে জীবাশ্ম জ্বালানি ভর্তুকি কমানোর এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে সরাসরি কর প্রণোদনা ও বিনিয়োগ তহবিল গঠনের জন্য আইন প্রণয়ন করা, যা তেল-গ্যাস নির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জুবায়ের আহমেদ

জুবায়ের আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মধ্যপ্রাচ্যের সংকট ও জ্বালানি রাজনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

کوئی تبصرہ نہیں ملا


News Card Generator