ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য: মেধা স্বত্ব আইনে উপেক্ষিত বাংলাদেশের সুবর্ণ সম্ভাবনা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য: মেধা স্বত্ব আইনে উপেক্ষিত বাংলাদেশের সুবর্ণ সম্ভাবনা

ব্যারিস্টার নাদিয়া  avatar   
ব্যারিস্টার নাদিয়া
ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য: মেধা স্বত্ব আইনে উপেক্ষিত বাংলাদেশের সুবর্ণ সম্ভাবনা
ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য: মেধা স্বত্ব আইনে উপেক্ষিত বাংলাদেশের সুবর্ণ সম্ভাবনা
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই মসলিনের ভৌগোলিক নির্দেশক (GI) স্বীকৃতি অর্জন এবং এর আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় বিলম্বিত প্রক্রিয়া, মেধাস্বত্ব আই...

সম্প্রতি, বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ঢাকাই মসলিনের ভৌগোলিক নির্দেশক (GI) স্বীকৃতি অর্জন এবং এর আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব সুরক্ষায় বিলম্বিত প্রক্রিয়া, মেধাস্বত্ব আইনে জিআই পণ্যের পূর্ণাঙ্গ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বাংলাদেশের কাঠামোগত দুর্বলতাকেই স্পষ্ট করে তোলে। যদিও ২০১৬ সালে শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (DPDT) জিআই পণ্য নিবন্ধন প্রক্রিয়া শুরু করে, তবে World Intellectual Property Organization (WIPO) এর আন্তর্জাতিক কাঠামোতে বাংলাদেশের জিআই পণ্যগুলোর সুরক্ষা ও বাণিজ্যিকীকরণে এখনো পর্যাপ্ত আইনি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বৈশ্বিক বাজারে জিআই পণ্যগুলোর ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং এর অর্থনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে, এই ক্ষেত্রটি বাংলাদেশের জন্য এক সুবর্ণ সম্ভাবনা বয়ে আনলেও, বিদ্যমান মেধাস্বত্ব আইন ও তার প্রয়োগে কিছু মৌলিক দুর্বলতা এই সম্ভাবনাকে অনেকটাই সীমাবদ্ধ করে রেখেছে।

বাংলাদেশের বর্তমান পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস আইন, ২০০৩ (সংশোধিত ২০২২) এবং এর অধীনে প্রণীত জিআই বিধিমালা, ২০১৯, প্রাথমিকভাবে জিআই পণ্য নিবন্ধনের অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে। কিন্তু এই আইনটি World Trade Organization (WTO) এর TRIPS (Trade-Related Aspects of Intellectual Property Rights) চুক্তির আর্টিকেল ২২ থেকে ২৪-এর অধীনে আন্তর্জাতিক জিআই সুরক্ষার যে বিস্তৃত কাঠামো প্রদান করে, তার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। বিশেষ করে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের জিআই পণ্যের অবৈধ ব্যবহার বা অনুকরণের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি প্রতিকার এবং প্রয়োগের ক্ষেত্রে এই আইনটি তুলনামূলকভাবে দুর্বল। উদাহরণস্বরূপ, জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত জামদানি শাড়ি, ইলিশ মাছ বা ফজলি আমের মতো পণ্যগুলোর আন্তর্জাতিক বাজারে অননুমোদিত ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা বা ক্ষতিপূরণ আদায়ের প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ। আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে সুরক্ষা নিশ্চিত করতে যে ধরনের সুনির্দিষ্ট বিধান এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রয়োজন, তার অভাব বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। World Bank এর এক গবেষণা অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলো তাদের ঐতিহ্যবাহী পণ্যের জিআই স্বীকৃতি থেকে বছরে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারে, কিন্তু আইনি সুরক্ষার অভাবে বাংলাদেশ এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে পারছে না।

মেধাস্বত্ব আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাবও বাংলাদেশের জিআই পণ্যের সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করছে। শিল্প মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে জিআই পণ্য সনাক্তকরণ, নিবন্ধন, সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিকীকরণের ক্ষেত্রে একটি সুসংহত কৌশলগত প্ল্যাটফর্মের অভাব রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার জিআই পণ্য সুরক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলেও, একটি একক সমন্বয়কারী সংস্থা না থাকায় নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে ধীরগতি লক্ষ্য করা যায়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এর একটি সমীক্ষা ইঙ্গিত দেয় যে, কার্যকর আইনি সুরক্ষা এবং ব্র্যান্ডিং কৌশল না থাকলে, জিআই পণ্যের মূল্য সংযোজন এবং বাজার সম্প্রসারণ সীমিত থাকে। বাংলাদেশের অনেক ঐতিহ্যবাহী পণ্য রয়েছে যা এখনও জিআই স্বীকৃতি পায়নি, এবং যেগুলো পেয়েছে, সেগুলোর বাণিজ্যিকীকরণেও উপযুক্ত কৌশল ও আইনি সহায়তা অনুপস্থিত। ফলস্বরূপ, স্থানীয় উৎপাদকরা তাদের পণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব আইন, বিশেষ করে লিসবন চুক্তি (Lisbon Agreement for the Protection of Appellations of Origin and their International Registration) এবং জেনেভা অ্যাক্ট (Geneva Act of the Lisbon Agreement on Appellations of Origin and Geographical Indications) এর মতো চুক্তিগুলোতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ ও সক্রিয় ভূমিকা না থাকায়, আমাদের জিআই পণ্যগুলো আন্তর্জাতিক সুরক্ষা বলয়ের বাইরে থেকে যাচ্ছে।

জিআই পণ্যের নাম স্বীকৃতির সাল (বাংলাদেশ) আন্তর্জাতিক সুরক্ষা অবস্থা (WIPO) আনুমানিক বার্ষিক রপ্তানি (মিলিয়ন USD)
জামদানি শাড়ি ২০১৬ সীমিত ১০০-১৫০
ইলিশ মাছ ২০১৭ সীমিত ৫০-৮০
খিরসাপাত আম ২০১৯ নেই ৫-১০
ঢাকাই মসলিন ২০২১ সীমিত ৫-১৫
বাগদা চিংড়ি ২০২২ নেই ২০০-২৫০

উৎস: পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (DPDT), বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) এবং WIPO ডাটাবেস (২০২৩-২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী)

সুপারিশ

  • বাংলাদেশের বিদ্যমান পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস আইন, ২০০৩ (সংশোধিত ২০২২) কে WTO এর TRIPS চুক্তির আর্টিকেল ২২-২৪ এবং WIPO এর লিসবন চুক্তি ও জেনেভা অ্যাক্ট-এর সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে দ্রুত সংশোধনী আনা। এই সংশোধনীতে আন্তর্জাতিক আদালতে জিআই পণ্যের অবৈধ ব্যবহারের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট বিধান এবং আর্থিক সহায়তার দিকনির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক।
  • শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি শক্তিশালী 'জিআই পণ্য সুরক্ষা ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ' প্রতিষ্ঠা করা, যা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (বাণিজ্য, কৃষি, পররাষ্ট্র) এবং বাংলাদেশ সরকারের অন্যান্য সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে জিআই পণ্যের সনাক্তকরণ, নিবন্ধন, আন্তর্জাতিক সুরক্ষা, ব্র্যান্ডিং এবং বাণিজ্যিকীকরণের জন্য একটি একক, সুসংহত কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে।
  • WIPO এর লিসবন চুক্তি এবং জেনেভা অ্যাক্ট-এ বাংলাদেশের পূর্ণ সদস্যপদ নিশ্চিত করা, যাতে বাংলাদেশের জিআই পণ্যগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা লাভ করে। এর পাশাপাশি, বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আন্তর্জাতিক মেধাস্বত্ব আদালতে জিআই পণ্যের অধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কার্যকর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠন এবং বিশেষজ্ঞ প্যানেল নিয়োগ করা।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ব্যারিস্টার নাদিয়া

ব্যারিস্টার নাদিয়া 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: মেধা স্বত্ব, কপিরাইট ও পেটেন্ট আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

نظری یافت نشد


News Card Generator