এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ: ক্যাপাসিটি চার্জের ফাঁদে অর্থনীতির শ্বাসরুদ্ধ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ: ক্যাপাসিটি চার্জের ফাঁদে অর্থনীতির শ্বাসরুদ্ধ

আনিসুর রহমান  avatar   
আনিসুর রহমান
এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ: ক্যাপাসিটি চার্জের ফাঁদে অর্থনীতির শ্বাসরুদ্ধ
এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ: ক্যাপাসিটি চার্জের ফাঁদে অর্থনীতির শ্বাসরুদ্ধ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত জ্বালানির মধ্যে তরলীক...

সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত জ্বালানির মধ্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং কয়লার অবদান সম্মিলিতভাবে প্রায় ৪০% থাকলেও, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে পরিশোধিত ক্যাপাসিটি চার্জের পরিমাণ উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, গত এক দশকে এই ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ রাষ্ট্রের ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি, যার সিংহভাগই পরিশোধ করা হয়েছে অলস বসে থাকা বা আংশিকভাবে ব্যবহৃত এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ এমন এক সময়ে পরিশোধ করা হচ্ছে যখন বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট এবং অভ্যন্তরীণ ডলারের ঘাটতি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে, যা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতাকে গভীর সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

বিদ্যুৎ খাতের এই সংকট কেবল ক্যাপাসিটি চার্জের আর্থিক বোঝা নয়, এর গভীরে প্রোথিত রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা এবং অস্বচ্ছ চুক্তি। বাংলাদেশ সরকার, বিশেষত বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি), বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দ্রুততার সাথে বহুসংখ্যক এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার অনেকগুলোই প্রয়োজনের অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন। World Bank এবং ADB-এর একাধিক প্রতিবেদনে এই অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে যে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা এখন চাহিদার প্রায় ৫০% বেশি। এই অতিরিক্ত ক্ষমতার জন্য চুক্তি অনুযায়ী কেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন করুক বা না করুক, তাদের একটি নির্দিষ্ট ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হয়। বিশেষ করে, উচ্চমূল্যের আমদানি নির্ভর এলএনজি এবং কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো যখন আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কারণে নিরবচ্ছিন্নভাবে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে না, তখনও তাদের এই চার্জ পরিশোধ করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, এলএনজি টার্মিনালের সীমাবদ্ধতা এবং ডলার সংকটের কারণে পর্যাপ্ত এলএনজি আমদানি করতে না পারায় বহু এলএনজিভিত্তিক কেন্দ্র অলস বসে থাকে, কিন্তু তাদের ক্যাপাসিটি চার্জ ঠিকই পরিশোধ করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে এবং ভর্তুকির বোঝা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার বিদ্যুতের বিলের উপর চাপ সৃষ্টি করবে।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। পরিবেশগত উদ্বেগ সত্ত্বেও বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে বেশ কিছু কয়লাভিত্তিক মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটায় এই কেন্দ্রগুলোর পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং মাতারবাড়ী বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো বৃহৎ প্রকল্পগুলো তাদের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করতে না পারলেও, তাদের জন্য চুক্তিবদ্ধ ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)-এর বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, এই কেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বাবদ প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে, যা সরকারের উন্নয়ন বাজেট থেকে ভর্তুকি হিসেবে দেওয়া হচ্ছে। এই ভর্তুকির একটি বড় অংশ আসে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা, যেমন World Bank এবং ADB প্রদত্ত ঋণ থেকে, যা দেশের সামগ্রিক ঋণ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। বিদ্যুৎ খাতের এই অব্যবস্থাপনা দেশের শিল্প উৎপাদন এবং কৃষি খাতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির ফলে পণ্য উৎপাদন খরচও বাড়ছে, যা রপ্তানি প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে পিছিয়ে দিচ্ছে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিচ্ছে। দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের নামে নেওয়া এই প্রকল্পগুলো এখন অর্থনীতির জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অর্থবছর এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ (বিলিয়ন টাকা) মোট ক্যাপাসিটি চার্জ (বিলিয়ন টাকা) মোট ক্যাপাসিটি চার্জে এলএনজি ও কয়লার অংশ (%)
২০১৮-১৯ ৮২.৫ ১৪০.৩ ৫৮.৮
২০১৯-২০ ৯৮.৭ ১৭৫.৫ ৫৬.২
২০২০-২১ ১১০.২ ২০৫.১ ৫৩.৭
২০২১-২২ ১৪৫.৮ ২৪৫.০ ৫৯.৫
২০২২-২৩ ১৯০.৪ ৩১০.২ ৬১.৪

উৎস: বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) এর বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন, World Bank ও ADB এর বিদ্যুৎ খাত পর্যালোচনা।

সুপারিশ

  • বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) কর্তৃক অনতিবিলম্বে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা পরিকল্পনা (Power System Master Plan) পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত, যাতে দেশের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন সক্ষমতা নির্ধারণ করা যায় এবং অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতার জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধের বোঝা কমানো যায়।
  • বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিসমূহ (Power Purchase Agreements - PPAs) পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে নিরীক্ষা করে ক্যাপাসিটি চার্জের শর্তাবলী পুনর্বিবেচনা করা এবং প্রয়োজনে 'নো-পাওয়ার-নো-পেমেন্ট' নীতি বাস্তবায়নের দিকে ধাবিত হওয়া উচিত, যা বিদ্যুৎ উৎপাদন না হলে ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা হ্রাস করবে।
  • বাংলাদেশ সরকার এবং অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক একটি সুনির্দিষ্ট বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা নীতি প্রণয়ন করা উচিত, যা এলএনজি ও কয়লা আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ডলারের যোগান নিশ্চিত করবে এবং আমদানি নির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার কারণে সৃষ্ট ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা কমানোর পাশাপাশি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ হ্রাস করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: আনিসুর রহমান

আনিসুর রহমান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: এলএনজি ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

コメントがありません


News Card Generator